চীনের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন প্রতিরোধে নিজেদের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে ১০ দিনের বৃহৎ সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা মহড়া শুরু করেছে তাইওয়ান। রাজধানী তাইপেসহ দ্বীপজুড়ে শুরু হওয়া এই বার্ষিক মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো বেইজিংকে এই বার্তা দেওয়া যে, তাইওয়ানের ওপর হামলা চালালে তার মূল্য অনেক বেশি হবে এবং দ্রুত বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে না।
এ বছরের ‘হান কুয়াং’ মহড়ায় নতুন কৌশল ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পাশাপাশি সাম্প্রতিক ইরান সংঘাত থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা ভবিষ্যতের সংঘাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বৃহৎ রিজার্ভ বাহিনী মোতায়েন
মহড়ার অংশ হিসেবে প্রায় ২০ হাজার রিজার্ভ সেনাকে সক্রিয় করা হয়েছে। রাজধানী তাইপেতে রিজার্ভ সদস্যরা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যুদ্ধ প্রশিক্ষণে অংশ নেন এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুশীলন করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর যৌথ মহড়াও চলছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু বলেন, এই মহড়ার উদ্দেশ্য দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন ব্যর্থ করে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া।
চীনের চাপ বাড়ছে
মহড়া শুরু হওয়ার সময়ই তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক তৎপরতা আরও বাড়িয়েছে চীন। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মহড়ার আগের দিন চীন ২১টি যুদ্ধবিমান ও ৯টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে যৌথ যুদ্ধ প্রস্তুতি টহল পরিচালনা করে। চলতি বছরে এটি ছিল এ ধরনের ২০তম অভিযান।
বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকিও দিয়ে আসছে। সামরিক চাপের পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং নিয়মিত সামরিক মহড়ার মাধ্যমে তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
অবরোধ মোকাবিলার অনুশীলন
এবারের মহড়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হলো সম্ভাব্য নৌ অবরোধ ভেঙে জাহাজ চলাচল সচল রাখার প্রস্তুতি। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, চীন যদি সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করে, তাহলে জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশলও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সাইবার হামলা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, উভচর অবতরণ প্রতিরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার মহড়াও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ড্রোন কৌশলে নতুন গুরুত্ব
এ বছরের মহড়ায় ড্রোন ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাইওয়ানের সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল নির্ভুল অস্ত্রকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব। এতে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষায় ফাঁক তৈরি হলে তাইওয়ানের ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধজাহাজসহ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে।
মিত্রদের সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা
তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণ পেয়ে আসলেও যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে অংশ নেবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই অনিশ্চয়তার কারণে তাইওয়ান এখন নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ানের কৌশলের মূল ভিত্তি হলো সম্ভাব্য হামলার মুখে যত দীর্ঘ সময় সম্ভব প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় অথবা আক্রমণকারী পক্ষ শেষ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ হারায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















