ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলা এবার শুধু রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামো নয়, দেশটির বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তিকেও বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজ–এর গুদামগুলোতে একের পর এক হামলার ফলে হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিক্রেতা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এতে দেশের খুচরা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকও।
তিন সপ্তাহেই বড় ক্ষতি
গত ১৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়াইল্ডবেরিজের প্রায় ২০টি গুদাম লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এসব হামলায় কয়েকটি গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, বিপুল পরিমাণ পণ্য ধ্বংস হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃত সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১ লাখ ৮০ হাজার বর্গমিটার গুদাম এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এটি কোম্পানিটির মোট সংরক্ষণ সক্ষমতার পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও বেশি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা কঠিন
মস্কোর এক ফ্র্যাঞ্চাইজি সংগ্রহকেন্দ্রের মালিক ভাসিলি ক্লিমভ জানান, আগে প্রতিদিন প্রায় ৪০০টি পার্সেল আসত। এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ১৫০-এ। কোনো কোনো দিন একটি পার্সেলও পৌঁছায় না।
তার ভাষায়, গত এক মাসে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং ব্যবসা পুরোপুরি লোকসানে চলে গেছে। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তিনি এখন ব্যবসাটি বিক্রি করতে চাইছেন। কিন্তু ক্রেতাও মিলছে না।
রাশিয়ার অনলাইন বাজারে বর্তমানে তিন হাজারের বেশি ওয়াইল্ডবেরিজ ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্থনীতিতেও বাড়ছে চাপ
ওয়াইল্ডবেরিজ এবং অন্যান্য বড় অনলাইন বাজার মিলিয়ে রাশিয়ার অর্থনীতির প্রায় সাড়ে আট শতাংশ সমমূল্যের পণ্য ও সেবা লেনদেন হয়। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে পারে। এতে সুদের হার কমানোর পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও সরবরাহে সামান্য ধাক্কাও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে এবং অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ঋণঝুঁকি ও দেউলিয়ার আশঙ্কা
রাশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংক সবারব্যাংক জানিয়েছে, হামলার কারণে বহু অনলাইন বিক্রেতার আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান ঋণের শর্ত পুনর্গঠনের আবেদন করেছে।
ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, যুদ্ধের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা না পেলে অনেক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে।
এ অবস্থায় ওয়াইল্ডবেরিজ এবং তাদের বিক্রেতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ, কর ছাড় বা ভর্তুকির মতো সহায়তা নিয়ে রুশ সরকার আলোচনা করছে।
ইউক্রেনের ব্যাখ্যা, রাশিয়ার দাবি
ইউক্রেন বলছে, তাদের লক্ষ্য সাধারণ মানুষ নয়; বরং যুদ্ধের ব্যয় রাশিয়ার ভেতরেই অনুভব করানো। কিয়েভের দাবি, ওয়াইল্ডবেরিজের মাধ্যমে সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য কিছু পণ্যও বিক্রি হয়, যা রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সহায়তা করে।
অন্যদিকে ওয়াইল্ডবেরিজ ও ক্রেমলিন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি রুশ সেনাবাহিনীকে কোনো ধরনের সরাসরি সরবরাহ করে না।
ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা
ওয়াইল্ডবেরিজ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বিক্রেতাদের জন্য ছাড়, অর্থ পরিশোধে সময় বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৭ হাজারের বেশি বিক্রেতা কিছু সহায়তা পেয়েছেন বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
তবে অনেক উদ্যোক্তা এখনও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, রাশিয়ার সাধারণ ব্যবসায়ী ও খুচরা বাজারেও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















