দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে মিয়ানমারকে আবারও আসিয়ানের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছে থাইল্যান্ড। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া এমন উদ্যোগ আসিয়ানের ঐক্য ও প্রভাব—দুটোকেই দুর্বল করতে পারে। তাই তারা সতর্ক করে বলছেন, শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত করেই পুনঃসম্পৃক্ততার পথ তৈরি করা উচিত।
এই প্রেক্ষাপটে ৬ থেকে ৭ আগস্ট থাইল্যান্ড সফর করছেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং। গত এপ্রিলে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তার দ্বিতীয় আসিয়ান সফর। এর আগে জুলাই মাসে তিনি লাওস সফর করেছিলেন। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনও সফর করেন তিনি।
নমনীয় কূটনীতির পক্ষে থাইল্যান্ড
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল সম্প্রতি জাকার্তায় আসিয়ান সচিবালয় সফর করে বলেন, আসিয়ানের ঐকমত্য ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আঞ্চলিক ঐক্য বজায় রাখতে বাস্তবসম্মত ও নমনীয় প্রয়োগও প্রয়োজন।
তার ভাষায়, মিয়ানমার নিয়ে আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনাই এখনো মূল কাঠামো। তবে সংলাপের পথ খোলা রাখতে ধাপে ধাপে পুনঃসম্পৃক্ততার নীতি অনুসরণ করছে থাইল্যান্ড। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল মিয়ানমার শুধু থাইল্যান্ডের নয়, পুরো আসিয়ানের স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
কেন থাইল্যান্ড এত সক্রিয়
বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নেওয়ায় থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সরাসরি এ দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত।
সীমান্ত এলাকায় প্রতারণা চক্র, মাদক পাচার, অবৈধ বাণিজ্য, অভিবাসন প্রবাহ এবং পরিবেশ দূষণ থাইল্যান্ডের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। যদিও মিয়ানমারের সামরিক সরকার পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণে নেই, তবুও সীমান্তসংক্রান্ত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় নেপিদোকেই সবচেয়ে কার্যকর অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে ব্যাংকক।
এছাড়া উত্তর থাইল্যান্ডের কয়েকটি অভিন্ন নদীতে মিয়ানমারের খনিশিল্পের দূষণের প্রভাব নিয়ে থাই নাগরিকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। ফলে এসব সমস্যা সমাধানে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী থাইল্যান্ড।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা
মিন অং হ্লাইংয়ের সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত সহযোগিতা এবং নদীদূষণ মোকাবিলাসহ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে উভয় দেশ।
সুচির ছবি প্রকাশের কৌশল
মিন অং হ্লাইংয়ের থাইল্যান্ড সফরের কয়েক দিন আগে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে অং সান সুচির সাক্ষাতের ছবি প্রকাশ করে মিয়ানমারের সামরিক সরকার।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে থাইল্যান্ডকে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আসিয়ানের সঙ্গে সহযোগিতায় আগ্রহী। এতে ব্যাংককের জন্যও যুক্তি দাঁড় করানো সহজ হয়েছে যে তাদের ধাপে ধাপে পুনঃসম্পৃক্ততার নীতি ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।
এখনো বহাল পাঁচ দফা শর্ত
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সুচির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই মিন অং হ্লাইংকে আসিয়ানের শীর্ষ বৈঠকগুলো থেকে দূরে রাখা হয়েছে।
আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনায় সহিংসতা বন্ধ, রাজনৈতিক সংলাপ শুরু এবং বাধাহীন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। তবে মিন অং হ্লাইং বারবার দাবি করেছেন, পরিকল্পনাটি সব সদস্য দেশের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে গৃহীত হয়নি এবং এটি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তার নেই।
আসিয়ানের ভেতরে বদলাচ্ছে অবস্থান
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এতদিন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে ছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেপিদো সফর করায় তাদের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, থাইল্যান্ড চাইছে ইন্দোনেশিয়াকেও আরও সক্রিয়ভাবে পুনঃসম্পৃক্ততার উদ্যোগে যুক্ত করতে।
সামনে বড় বাধা
২০২৬ সালে আসিয়ানের সভাপতিত্ব করছে ফিলিপাইন। আগামী বছর এই দায়িত্ব নেবে সিঙ্গাপুর এবং ২০২৮ সালে সভাপতিত্ব করবে থাইল্যান্ড।
বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গাপুর যদি বর্তমান কঠোর অবস্থান বজায় রাখে, তাহলে ২০২৮ সালের আগে মিয়ানমারের পূর্ণ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা
পর্যবেক্ষকদের মতে, থাইল্যান্ড যদি বাস্তব সংস্কার ছাড়াই মিয়ানমারের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে অতিরিক্ত জোর দেয়, তাহলে আসিয়ানের চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে শুধু মিয়ানমারের সামরিক সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাই বাড়বে না, বরং জোটের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও গভীর হতে পারে।
তাদের মতে, সত্যিকারের অগ্রগতি বলতে সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক পাচার, প্রতারণা চক্র দমন, সহিংসতা হ্রাস এবং রাজনৈতিক সংলাপের মতো ক্ষেত্রে পরিমাপযোগ্য ফলাফল নিশ্চিত হওয়া জরুরি। অন্যথায় এই সফর কেবল কূটনৈতিক প্রদর্শনী হিসেবেই থেকে যাবে, যার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















