যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটাকে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য তহবিলে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে কিশোর ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা জোরদারে একাধিক বাধ্যতামূলক পরিবর্তন আনার আদেশও দিয়েছেন বিচারক। এই রায়কে শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
সান্তা ফে-র বিচারক ব্রায়ান বিডশাইড রায়ে বলেন, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো নিউ মেক্সিকোর আইন অনুযায়ী ‘জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করেছে। আদালতের মতে, প্রতিষ্ঠানের নকশা ও পরিচালন পদ্ধতি শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং এর প্রভাব পরিবার, বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ওপরও পড়েছে।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস অভিযোগ করেন, মেটা এমনভাবে তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে যাতে কিশোররা দীর্ঘ সময় ধরে আসক্ত হয়ে থাকে। পাশাপাশি শিশুদের যৌন শোষণ ও অন্যান্য অনলাইন ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।
পাঁচ বছরের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মেটাকে আগামী পাঁচ বছর ধরে কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য বেশ কয়েকটি নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে প্রতি মাসে ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন সীমিত করা, প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যোগাযোগে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটব্যবস্থায় নিরাপত্তা বাড়ানো এবং শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা।
এছাড়া আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, নিউ মেক্সিকোর কোনো শিশু যেন মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটব্যবস্থার সঙ্গে রোমান্টিক বা যৌনধর্মী কথোপকথনে জড়াতে না পারে। একইভাবে কোনো প্রাপ্তবয়স্কও যেন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশুকে কেন্দ্র করে যৌনধর্মী পরিস্থিতি তৈরি বা আলোচনা করতে না পারে।
মেটার অবস্থান
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষতিকর বিষয়বস্তু শনাক্ত ও অপসারণে কাজ করছে এবং কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু করেছে।
মেটার ভাষ্য, আদালতের সিদ্ধান্তে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তা প্রকৃত পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে তুলে ধরে না এবং প্রতিষ্ঠানটি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।
আগের রায়ের ধারাবাহিকতা
এটি একই মামলার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রায়। এর আগে চলতি বছরের মার্চে এক জুরি বোর্ড কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নিরাপত্তা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগে মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছিল।
নতুন রায়ে শুধু আর্থিক জরিমানাই নয়, ভবিষ্যতের জন্য বাধ্যতামূলক নীতিগত পরিবর্তনের নির্দেশও যুক্ত হয়েছে।
অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত
অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেস বলেছেন, এই রায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়; এটি অন্য অঙ্গরাজ্য ও দেশগুলোর জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। তাঁর মতে, শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্য এবং এক হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা করেছে। এসব মামলায় ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যপ্রণালীতেও পরিবর্তন আনার দাবি জানানো হয়েছে।
সামনে আরও বড় আইনি লড়াই
আগামী সপ্তাহেই ক্যালিফোর্নিয়ায় আরেকটি বড় মামলার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মেটা। সেখানে ২৯টি অঙ্গরাজ্য অভিযোগ করেছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ইচ্ছাকৃতভাবে শিশু-কিশোরদের আসক্ত করে রাখার মতোভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউ মেক্সিকোর এই রায় ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে এবং শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















