বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে বলেছে, এই জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আরও প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে। এতে সংকটাপন্ন মানুষের মোট সংখ্যা বেড়ে ২৭ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনোর ঝুঁকি কেন বাড়ছে
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এবার অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বর্তমানে অন্তত ১৯৮২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। পরিস্থিতি একইভাবে চলতে থাকলে এটি ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হতে পারে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা বদলে যায়। কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও বর্ষা বিলম্বিত হয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি বা অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেখা দেয়। এসব পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোন অঞ্চল
সংস্থাটির বিশ্লেষণে ৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
মধ্য আমেরিকায় খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় এই বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৭৫ শতাংশ। দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রতিটিতে ১ কোটি ২০ লাখেরও বেশি নতুন মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
খাদ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে ভালো ফসল হওয়ায় বৈশ্বিক খাদ্যবাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় এল নিনো সময়ে প্রবেশ করেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং আবহাওয়াজনিত ফসলহানির কারণে খাদ্যের দামে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আগের এল নিনো ঘটনাগুলোতে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্যে বড় ধরনের উল্লম্ফন না হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যস্বল্পতা ও মূল্যবৃদ্ধি দরিদ্র পরিবারের জন্য খাদ্য সংগ্রহকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
![]()
সংকট মোকাবিলায় অর্থের অভাব
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ১১ লাখ পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৮ লাখে। ২০২৬ সালে অর্থসংকটের কারণে এই তথ্য সংগ্রহ আরও কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর মতো বড় ঝুঁকির সময় নিয়মিত ও দ্রুত তথ্য সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে কোথায় খাদ্যসংকট দ্রুত বাড়ছে, তা সময়মতো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার প্রভাব
পূর্ব আফ্রিকা, সাহেল অঞ্চল, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে সোমালিয়া ও আশপাশের এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও খরা, অনিয়মিত বর্ষা এবং স্থানভেদে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বলছে, পূর্বাভাসে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং সব অঞ্চলে একই ধরনের প্রভাব পড়বে না। তবুও সম্ভাব্য মানবিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংস্থাটি ইতোমধ্যে ১৮টি দেশে আগাম সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করেছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখের বেশি মানুষকে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যাতে চরম আবহাওয়ার প্রভাব শুরু হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী কিছুটা সুরক্ষা পায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















