চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপের মধ্যে সম্ভাব্য যেকোনো সংঘাত মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে বছরের সবচেয়ে বড় সামরিক মহড়া শুরু করেছে তাইওয়ান। ৫ আগস্ট শুরু হওয়া বার্ষিক হান কুয়াং মহড়া চলবে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত। এই মহড়ায় শুধু সেনাবাহিনী নয়, রিজার্ভ বাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদেরও অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পুরো সমাজ কীভাবে কাজ করবে, তার বাস্তব অনুশীলন করা যায়।
বাস্তব যুদ্ধের পরিস্থিতি অনুকরণ
হান কুয়াং মহড়ায় এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যেন চীনা বাহিনী সত্যিই দ্বীপে আক্রমণ চালিয়েছে। সৈন্য ও রিজার্ভ সদস্যরা উপকূলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ, মর্টার মোতায়েন, আধুনিক রাইফেল পরিচালনা এবং শত্রুপক্ষের অবতরণ ঠেকানোর অনুশীলন করছেন।
তাইওয়ানের দক্ষিণাঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ ও একটি সাবমেরিন মোতায়েন করা হয়েছে। মধ্যাঞ্চলের তাইচুং শহরে ভোরের আগে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে মহড়া চালানো হয়েছে। আকাশে উড়তে দেখা গেছে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার।
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের মহড়ার লক্ষ্য কেবল নিয়মিত প্রশিক্ষণ নয়; বরং সেনাদের এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে বাস্তব যুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার নতুন কৌশল
এবারের মহড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কেন্দ্রীয় নির্দেশনার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা কমান্ডারদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানো। অর্থাৎ, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুশীলন করা হচ্ছে।
পাশাপাশি নজরদারি ড্রোন ও হামলাকারী ড্রোনকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের কৌশলও পরীক্ষা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য যুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তাইওয়ান।
সাধারণ নাগরিকদেরও প্রস্তুত করা হচ্ছে
মহড়ার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। বিভিন্ন অঞ্চলে বিমান হামলার সতর্কতা মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে মানুষ কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, তা পরীক্ষা করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য, যুদ্ধ কিংবা বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ—উভয় পরিস্থিতিতেই পুরো সমাজকে প্রস্তুত রাখা।

সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলার মহড়া
চীন যদি তাইওয়ানকে ঘিরে নৌ অবরোধ সৃষ্টি করে, সেই পরিস্থিতিও মহড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পূর্ব উপকূলে নৌবাহিনী ও উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ দিয়ে সরবরাহ বহরের নিরাপদ চলাচলের অনুশীলন করা হবে।
এ ছাড়া যুদ্ধকালীন সময়ে কারখানাগুলো কত দ্রুত সামরিক উৎপাদনে রূপান্তরিত হতে পারে এবং প্রয়োজনে শিল্পকারখানা স্থানান্তরের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করা হবে।
প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন
তাইওয়ানের সরকার আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
সম্প্রতি পার্লামেন্টে একটি বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদিত হলেও সরকারের চাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দেশীয় ড্রোন উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নির্ধারিত বিপুল অর্থ বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ড্রোন খাতে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
চীনের চাপ বাড়ছেই
চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের চারপাশে প্রায় প্রতিদিনই চীনা যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি উপকূলরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে এমন নানা তৎপরতা চালানো হচ্ছে, যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে না পৌঁছালেও চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
এই পরিস্থিতিতে তাইওয়ান সরকার বলছে, দেশের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা হবে, যেখানে সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে যেকোনো সংকট মোকাবিলা করতে প্রস্তুত থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















