জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে পুরোনো জলবাহী অগ্নিনির্বাপক বিমানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন প্রজন্মের জলবোমারু বিমান তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে ইউরোপের কয়েকটি নতুন প্রতিষ্ঠান। চলতি বছর ইউরোপে প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে যাওয়ার পর এই উদ্যোগ আরও গতি পেয়েছে।
ফ্রান্সের তুলুজ শহরে একটি পুরোনো টার্বোপ্রপ বিমানের কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে প্রকৌশলী জোনাথন বেক দেখাচ্ছেন, কীভাবে তার প্রতিষ্ঠান নতুন ধরনের জলবাহী বিমান তৈরি করতে চায়। পুরোনো বিমানকে রূপান্তর করে তৈরি এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের দাবানল মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
পুরোনো জলবাহী বিমানের সংকট

দশকের পর দশক ধরে কানাডার তৈরি জল সংগ্রহকারী বিমানগুলো ইউরোপের দাবানল নিয়ন্ত্রণে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু এসব বিমানের সংখ্যা কমছে এবং নতুন বিমান তৈরির গতি দীর্ঘদিন ধরে থেমে ছিল।
ফ্রান্সের একটি সংসদীয় কমিটি এর আগে সতর্ক করে জানিয়েছিল, দেশটির আকাশভিত্তিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো তাই নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে।
তবে নতুন জলবাহী বিমান তৈরি সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির ওপর থেকে পানি সংগ্রহ করতে সক্ষম উভচর বিমানের নকশা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বহু বছর ধরে হারিয়ে গেছে।
নতুন প্রযুক্তির স্বপ্ন
ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান পজিটিভ এভিয়েশন পুরোনো বিমানকে পরিবর্তন করে এমন একটি জলবাহী বিমান তৈরির পরিকল্পনা করছে, যাতে একবারে প্রায় আট টন পানি বহন করা যাবে। প্রতিষ্ঠানটি পুরোনো এটিআর-৭২ বিমানের কাঠামো ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক কাজ চালাচ্ছে।

অন্যদিকে কেপলেয়ার নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান মাটিতে পানি ভরে উড়তে সক্ষম অগ্নিনির্বাপক বিমান তৈরির পরিকল্পনা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো আগুন শুরুর প্রথম পর্যায়েই তা নিয়ন্ত্রণে আনা, যাতে তা বড় ধরনের বিপর্যয়ে পরিণত না হয়।
বিনিয়োগই বড় বাধা
নতুন জলবোমারু বিমান তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, পুরোনো বিমান রূপান্তরের জন্য কয়েক কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন বিমান তৈরির খরচ এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নকশা তৈরি করলেই হবে না। নিরাপত্তা পরীক্ষা, অনুমোদন, কারখানা স্থাপন এবং উৎপাদন শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগে।
ইউরোপে একাধিক প্রকল্প
ফ্রান্সের নতুন প্রতিষ্ঠান হাইনায়েরো তাদের ফ্রেগেট-এফ১০০ নামের জল সংগ্রহকারী বিমানের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি প্রায় ১০ টন পানি বহন করতে পারবে এবং প্রচলিত কানাডেয়ার বিমানের তুলনায় দ্বিগুণ কার্যকর হবে।
ইতালির ১৯-০১ হোল্ডিং নতুন উভচর বিমানভিত্তিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ২০৩১ সাল থেকে ইতালিতে উৎপাদন শুরু করা।
বেলজিয়ামেও স্থপতি গায়েতান দু ফোরের নেতৃত্বে সিগল নামের একটি উভচর বিমানের পরিকল্পনা চলছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, অর্থ সংগ্রহ ও শিল্প সক্ষমতা তৈরি বড় চ্যালেঞ্জ।
পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়াই
নতুন উদ্যোগগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হচ্ছে কানাডার তৈরি নতুন প্রজন্মের জলবোমারু বিমান। দীর্ঘ ১১ বছর বন্ধ থাকার পর আবার উৎপাদনে ফিরেছে এই বিমান। তবে নতুন সংস্করণের সরবরাহ শুরু হতে সময় লাগছে।
বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, নতুন বিকল্প তৈরি করতে বহু বছর ধরে প্রকৌশল গবেষণা প্রয়োজন। তাই দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন।
তবুও ইউরোপের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, বাড়তে থাকা দাবানলের কারণে এখনই নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সময়। তাদের আশঙ্কা, আগুনের মৌসুম শেষ হলে রাজনৈতিক আগ্রহ আবার কমে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















