লন্ডনে নিবন্ধিত এক যৌন অপরাধীর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অভিযোগ, গ্রেপ্তার, জামিন এবং নজরদারির পরও তাকে কার্যকরভাবে আটক রাখতে ব্যর্থ হয় পুলিশ, প্রসিকিউশন ও বিচারব্যবস্থা। সেই ব্যর্থতার সুযোগে তিনি দুই নারীকে হত্যা, আরেক নারীকে ধর্ষণ এবং গণপরিবহনে আরও বহু নারীকে যৌন নিপীড়নের সুযোগ পান। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আদালতের রায়ের পর ঘটনাটির নেপথ্যের ধারাবাহিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যর্থতা সামনে এসেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, অপরাধী সাইমন লেভি আগেই যৌন অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন এবং কারাভোগও করেছিলেন। কারামুক্তির পরও তাকে নিবিড় নজরদারিতে রাখার কথা থাকলেও পুলিশ তার ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে দেয়। এর ফলে তার ওপর পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে শিথিল হয়ে যায়। পরে তিনি একের পর এক নতুন অপরাধ করলেও সেই মূল্যায়ন দীর্ঘ সময় পরিবর্তন করা হয়নি।
জামিনে মুক্ত থেকেই চলতে থাকে অপরাধ
লেভির বিরুদ্ধে গণপরিবহনে নারীদের যৌন নিপীড়নের একাধিক অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও বারবার জামিন দেওয়া হয়। এমনকি জামিনের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ থাকলেও তাকে আবারও মুক্তি দেওয়া হয়।

পুলিশ আদালতকে লিখিতভাবে সতর্ক করেছিল যে তিনি পুনরায় অপরাধ করার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবুও তিনি মুক্ত থেকে আরও অপরাধ সংঘটিত করেন। পরে প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষও স্বীকার করে যে জামিনের বিরোধিতায় তাদের অবস্থান আরও শক্ত হওয়া উচিত ছিল।
তদন্তে একের পর এক গাফিলতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন বহু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
একটি ধর্ষণের অভিযোগে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র থাকা সত্ত্বেও তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে নিহত এক নারীর মৃত্যুকেও প্রথমে হত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে বিশেষায়িত হত্যা তদন্ত দল অনেক দেরিতে তদন্তে যুক্ত হয়।
এছাড়া গণপরিবহনে সংঘটিত যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলোর তদন্তেও দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। অভিযোগ পাওয়ার পরও অভিযুক্তকে দ্রুত অভিযুক্ত করা হয়নি। তদন্তের এই বিলম্বের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা পরে নিজেদের অদক্ষতার কথাও স্বীকার করেছে।
কারাগারেও ছিল যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

কারাভোগের সময়ও লেভির বিরুদ্ধে এক নারী কারারক্ষীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি নজরদারি ক্যামেরায় ধারণ হলেও তদন্ত ও অভিযোগ গঠনে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরে স্বীকার করে, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরবর্তী অপরাধের আগেই তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারত।
চুরি হওয়া ভ্রমণ কার্ডও ফেরত দেয় পুলিশ
তদন্তে আরও জানা যায়, অভিযুক্তের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া একটি চুরি হওয়া গণপরিবহনের ভ্রমণ কার্ড পুলিশ ও পরিবহন পুলিশ—উভয় সংস্থাই পরে তাকে ফিরিয়ে দেয়। সেই কার্ড ব্যবহার করেই তিনি বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন এবং অন্তত একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটনের দিনও সেটি ব্যবহার করেছিলেন।
ভুক্তভোগীদের প্রতি সংবেদনশীলতার ঘাটতি
ধর্ষণের শিকার এক নারী, যিনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছিলেন, পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা বা তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরে পুলিশ স্বীকার করেছে, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নারীদের সঙ্গে কাজ করার পদ্ধতিতে আরও উন্নতি প্রয়োজন।

মেট্রোপলিটন পুলিশের দুঃখ প্রকাশ
মেট্রোপলিটন পুলিশ স্বীকার করেছে, দ্বিতীয় নিহত নারী শেরিল উইলকিন্সের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারত। বাহিনী তার পরিবারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পুরো ঘটনাকে “সমষ্টিগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরিবহন পুলিশও তদন্তে অদক্ষতার কথা স্বীকার করে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে একই ধরনের বিলম্ব এড়াতে তাদের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রসিকিউশন কর্তৃপক্ষও নিজেদের ত্রুটির জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছে।
আবারও প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
এই ঘটনা যুক্তরাজ্যে নারী নিরাপত্তা, যৌন অপরাধীদের ঝুঁকি মূল্যায়ন, জামিননীতি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতেই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে একাধিক নারীকে ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে হতো না।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















