বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নতুন ইঞ্জিনের কঠোর পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিমান ইঞ্জিন নির্মাতা জিই অ্যারোস্পেস ব্যবহার করছে একটি বিশেষভাবে রূপান্তরিত বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজ, যাকে বলা হয় ‘উড়ন্ত গবেষণাগার’। এই উড়োজাহাজেই পরীক্ষা করা হচ্ছে বোয়িংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত ৭৭৭এক্স বিমানের জন্য তৈরি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জেট ইঞ্জিন।
পুরোনো যাত্রীবাহী বিমান, নতুন বৈজ্ঞানিক দায়িত্ব
তিন দশকেরও বেশি পুরোনো একটি বোয়িং ৭৪৭-৪০০ একসময় শত শত যাত্রী বহন করত। এখন সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। যাত্রীবাহী আসনের বড় অংশ সরিয়ে সেখানে বসানো হয়েছে বিশাল তথ্য সংগ্রহের যন্ত্র, শক্তিশালী কম্পিউটার, সেন্সর এবং হাজার হাজার ফুট দীর্ঘ বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবস্থা।
উড়োজাহাজটির প্রতিটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা, জ্বালানি ব্যবহার, তাপমাত্রা, চাপ, কম্পনসহ প্রায় এক হাজার ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য পরে বিশ্লেষণ করে প্রকৌশলীরা ইঞ্জিনের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করেন।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক জেট ইঞ্জিন
এই উড়ন্ত গবেষণাগারের মূল দায়িত্ব এখন জিই-নাইন-এক্স ইঞ্জিন পরীক্ষা করা। এটি এতটাই বড় যে এর ভেতরে একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমানের মূল দেহের বড় অংশ ধরে যেতে পারে বলে প্রকৌশলীরা উল্লেখ করেন।
ইঞ্জিনটির স্বাভাবিক শক্তি এক লাখ দশ হাজার পাউন্ড থ্রাস্ট হলেও পরীক্ষার সময় এটি এক লাখ চৌত্রিশ হাজার তিনশ পাউন্ড পর্যন্ত থ্রাস্ট উৎপন্ন করে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। ভবিষ্যতের বোয়িং ৭৭৭এক্স উড়োজাহাজ এই ইঞ্জিনেই চলবে।
পরীক্ষাগারে রূপ নেওয়া কেবিন
বিমানের নিচতলার প্রায় পুরো অংশই এখন পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। সেখানে সারি সারি কম্পিউটার, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং তথ্য বিশ্লেষণের যন্ত্র বসানো হয়েছে। প্রতিটি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে পাইলট, প্রকৌশলী, যান্ত্রিক বিশেষজ্ঞ ও সহায়ক কর্মী মিলিয়ে সাধারণত আট থেকে বিশজন পর্যন্ত থাকেন।
তারা আকাশেই ইঞ্জিনের প্রতিটি পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন পরীক্ষা পরিচালনা করেন।
সামনে বিশ্রাম, পেছনে গবেষণা
যদিও বিমানের বেশিরভাগ অংশ গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সামনের অংশে কিছু আরামদায়ক আসন রাখা হয়েছে। সেখানে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সদস্যরা দীর্ঘ যাত্রার সময় বিশ্রাম নেন। পাশাপাশি খাবার প্রস্তুতের ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধাও রয়েছে, যাতে দূরবর্তী এলাকায় গিয়েও দলটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজ করতে পারে।
পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সহজ নয়
এই বিশেষ উড়োজাহাজের পাইলটদের কাজ সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের পাইলটদের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। পরীক্ষাধীন ইঞ্জিনটি অন্য তিনটি ইঞ্জিনের তুলনায় ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে পুরো বিমানের ভারসাম্য বজায় রাখতে পাইলটদের অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
ইঞ্জিনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা যাচাই করতে অনেক সময় এমন কৌশলী উড্ডয়ন করা হয়, যা সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইটে কখনোই করা হয় না।
বিশ্বের নানা প্রান্তে চলে পরীক্ষা

একটি ইঞ্জিনকে সব ধরনের আবহাওয়ায় নিরাপদভাবে চালানোর সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এই উড়োজাহাজ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উড়ে যায়। প্রচণ্ড ঠান্ডার পরীক্ষা হয় আলাস্কা ও উত্তর কানাডায়। আবার উচ্চ তাপমাত্রায় ইঞ্জিনের সক্ষমতা যাচাই করতে উড়োজাহাজটি হাওয়াইয়ে যায়।
এভাবে বরফ, তাপ, উচ্চতা ও বিভিন্ন বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থায় ইঞ্জিনের প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করা হয়।
৭৭৭এক্সের অপেক্ষা
দীর্ঘ বিলম্বের পর বোয়িংয়ের নতুন প্রজন্মের ৭৭৭এক্স উড়োজাহাজ বাণিজ্যিক সেবায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন বিমান সংস্থা শত শত উড়োজাহাজের অর্ডার দিয়েছে। নতুন এই উড়োজাহাজের অন্যতম আকর্ষণ ভাঁজ করা যায় এমন ডানার প্রান্ত, যা বড় আকারের বিমান হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যমান বিমানবন্দরের গেটে সহজে ব্যবহার করা সম্ভব করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উড়ন্ত গবেষণাগারের মাধ্যমে পরিচালিত পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ হলে ভবিষ্যতের দীর্ঘপাল্লার বিমান চলাচল আরও নিরাপদ, দক্ষ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















