রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী নারী তাতিয়ানা কিমের গড়ে তোলা অনলাইন বাণিজ্য সাম্রাজ্য ওয়াইল্ডবেরিজ এখন ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় বড় সংকটে পড়েছে। রাশিয়াজুড়ে কোম্পানিটির গুদামগুলোতে একের পর এক হামলায় বিপুল পরিমাণ পণ্য ধ্বংস হচ্ছে, কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ইউক্রেন ওয়াইল্ডবেরিজের অন্তত ২৩টি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কোম্পানির নয় কর্মী নিহত হয়েছেন। মস্কোভিত্তিক ই-কমার্স পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেটা ইনসাইটের হিসাবে, হামলায় ওয়াইল্ডবেরিজ তার গুদাম সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে এবং প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন রুবেল বা ৫৯০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গুদাম ধ্বংসে বিপাকে রুশ ই-কমার্স
ওয়াইল্ডবেরিজ রাশিয়ার খুচরা বাজারের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটির প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ পিকআপ পয়েন্টের নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং রাশিয়ার অর্ধেকের বেশি মানুষ মাসে অন্তত একবার এই প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটা করেন। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা কোম্পানিগুলো রাশিয়া থেকে সরে যাওয়ায় ওয়াইল্ডবেরিজের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

ডেটা ইনসাইটের বিশ্লেষক সের্গেই সেমকো জানিয়েছেন, কোম্পানিটির বড় গুদামগুলো প্রায় শেষ হয়ে আসছে। প্রতিদিন একটি করে গুদাম পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
হামলার প্রভাব শুধু ওয়াইল্ডবেরিজে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাশিয়ায় অনলাইন মার্কেটপ্লেসে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের ভোক্তা ব্যয় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে সবারইনডেক্সের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
কেন ওয়াইল্ডবেরিজকে লক্ষ্য করছে ইউক্রেন
ইউক্রেনের দাবি, ওয়াইল্ডবেরিজে রুশ সেনাদের জন্য ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। সাইটটির নীতিমালায় অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও সেখানে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট, ড্রোন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন সামগ্রী পাওয়া যায়।
আগস্টের শুরুতে প্ল্যাটফর্মটিতে প্রথম-ব্যক্তি-দৃষ্টিভিত্তিক ড্রোন এবং ড্রোন পরিচালনায় ব্যবহৃত ফাইবার-অপটিক তারের কুণ্ডলী বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি বিস্ফোরক ফেলার ব্যবস্থাসহ একটি ড্রোনের তালিকাও দেখা গেছে। তবে এসব পণ্য আদৌ কেনা বা সরবরাহ করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
ওয়াইল্ডবেরিজের সহপ্রতিষ্ঠাতা তাতিয়ানা কিম ইউক্রেনের হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, ওয়াইল্ডবেরিজে বিক্রি হওয়া পণ্য অন্য সাধারণ অনলাইন মার্কেটপ্লেসের পণ্যের মতোই। তিনি বলেন, হামলার উদ্দেশ্য কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টি, অস্থিতিশীলতা তৈরি এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো।
ব্যবসা বাঁচাতে নতুন লজিস্টিক পরিকল্পনা
![]()
৫০ বছর বয়সী কিম সংকট মোকাবিলায় ওয়াইল্ডবেরিজের সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নিয়েছেন। আঞ্চলিক সরকার ও বিক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কোম্পানিটি ৮০ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিক্রেতাকে দুই দফায় স্বেচ্ছা অর্থসহায়তা দিয়েছে এবং ড্রোন হামলার জন্য সীমিত বীমা সুবিধাও চালু করেছে।
রুশ সরকারও ওয়াইল্ডবেরিজের বিক্রেতাদের জন্য কর ছাড় ও বিভিন্ন মেয়াদি সুবিধাসহ সহায়তা প্যাকেজ তৈরির কাজ করছে।
তবে ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। শিল্প পর্যবেক্ষকদের মতে, কিছু বিক্রেতা এখন রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ওজনে সরে যাচ্ছেন। ওজনের সরবরাহব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় এবং ইউক্রেনের হামলার প্রধান লক্ষ্য না হওয়ায় বিক্রেতাদের কাছে এটি বেশি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
তাতিয়ানা কিমের ব্যবসায়িক উত্থানও কম নাটকীয় নয়। সাবেক ইংরেজি শিক্ষক কিম ২০০৪ সালে তৎকালীন স্বামী ভ্লাদিস্লাভ বাকালচুকের সঙ্গে ইউরোপীয় পোশাকের ক্যাটালগভিত্তিক ওয়েবসাইট হিসেবে ওয়াইল্ডবেরিজ শুরু করেন। ২০২৪ সালে একটি রুশ বহিরঙ্গন বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিতর্কিত একীভূতকরণ ঘিরে তাদের মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। এক পর্যায়ে ওয়াইল্ডবেরিজের মস্কো কার্যালয়ের কাছে সশস্ত্র সংঘর্ষে দুইজন নিহত ও সাতজন আহত হন। পরের বছর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
এখন যুদ্ধের আগুনে তার গড়া ব্যবসা সাম্রাজ্যই সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে। ওয়াইল্ডবেরিজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইউক্রেনের হামলা কতদিন চলবে, কোম্পানি কত দ্রুত নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে এবং রুশ সরকারের কাছ থেকে কতটা সহায়তা পাওয়া যাবে—তার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















