যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে করনীতি নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ডেমোক্র্যাট-শাসিত রাজ্যগুলো যখন ধনী ও উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর কর বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে, তখন রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যগুলোর একটি বড় অংশ ব্যক্তিগত আয়কর কমানো কিংবা পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পথে হাঁটছে। এর ফলে দেশটির অঙ্গরাজ্যগুলোর করব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যও দ্রুত বাড়ছে।
টেনেসির নক্স কাউন্টির রিপাবলিকান মেয়র গ্লেন জ্যাকবসের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের একটি প্রতীকী উদাহরণ। পেশাদার কুস্তির জগতে তিনি ‘কেন’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং কর্মজীবনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে কাজ করেছেন। বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করার কারণে একসময় তার আয়কর সংক্রান্ত কাগজপত্রের স্তূপ এত বড় হয়ে যেত যে তিনি সেটিকে প্রায় এক ফুট উঁচু বলে বর্ণনা করেছেন।
তাই টেনেসি ২০২১ সালে ব্যক্তিগত আয়কর পুরোপুরি বাতিল করার পর জ্যাকবস এতে সন্তুষ্ট। তার মতে, টেনেসির এই নীতি এখন অন্য রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যগুলোর জন্য একটি সম্ভাব্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
মিসৌরিতে চেষ্টা, কিন্তু ভোটে ব্যর্থ
আয়কর কমানো বা বাতিল করার এই প্রবণতা এবার মিসৌরিতেও বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। ৪ আগস্ট রাজ্যটিতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ব্যক্তিগত আয়কর তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে ভোট হয়। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
তবে প্রস্তাবটি ভোটের মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছানোই দেখিয়ে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর করনীতি কীভাবে নতুন পথে এগোচ্ছে। রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন অনেক রাজ্য এখন মনে করছে, মানুষের উপার্জনের ওপর কর কমিয়ে ভোগ ও অন্যান্য উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করতে পারে।
গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি অঙ্গরাজ্য ব্যক্তিগত আয়করের হার কমিয়েছে। এসব রাজ্যের বেশির ভাগই রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন। মিসৌরিতেও ২০১৭ সালের তুলনায় সর্বোচ্চ আয়করের হার ২০ শতাংশের বেশি কমেছে।
দুই দলের করনীতিতে বাড়ছে দূরত্ব
যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে করনীতি নিয়ে মতপার্থক্য নতুন নয়। তবে আগে অঙ্গরাজ্যগুলো সাধারণত এমন একটি মাঝামাঝি অবস্থানে থাকার চেষ্টা করত, যেখানে সরকারের প্রয়োজনীয় রাজস্বও উঠবে আবার অতিরিক্ত করের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হবে না।
এখন সেই মাঝামাঝি অবস্থান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। কিছু রাজ্য ব্যক্তিগত আয়কর চার শতাংশের নিচে নামিয়ে আনছে, আবার অন্য কিছু রাজ্যে করের হার দুই অঙ্কে পৌঁছে যাচ্ছে।
ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা আয়কর ব্যবস্থাকে বেশি সমর্থন করেন। তাদের যুক্তি হলো, বেশি আয় করা মানুষ তুলনামূলক বেশি কর দিতে সক্ষম। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ মনে করে, মানুষের উপার্জনের ওপর কর বসানোর বদলে ভোগের ওপর কর আরোপ করা অর্থনীতির জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
তবে ভোগের ওপর করের একটি বড় সমস্যা রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের উপার্জনের বড় অংশ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে খরচ করেন। ফলে একই হারে ভোগকর আরোপ করা হলে তাদের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ পড়ে।
আয়কর না থাকলেই কি রাজস্বের সমস্যা হয় না?
আয়কর বাতিলের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি হলো মানুষের উপার্জনের ওপর কম কর থাকলে বিনিয়োগ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবে আয়কর বাদ দেওয়ার পর রাজ্যের বিপুল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হলে সেই অর্থ অন্য কোনো উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
ফ্লোরিডার উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ব্যক্তিগত আয়কর নেই। কিন্তু বিপুলসংখ্যক পর্যটকের কাছ থেকে বিক্রয়কর আদায় করা সম্ভব হয়। ফলে পর্যটন অর্থনীতির ওপর ভর করে রাজ্যটি বিকল্প রাজস্বের ব্যবস্থা করতে পারে।
টেক্সাসেও ব্যক্তিগত আয়কর নেই। তবে তেল ও গ্যাস খাত থেকে পাওয়া রাজস্ব এবং বিভিন্ন ধরনের ফি রাজ্যের অর্থভাণ্ডারকে শক্তিশালী করে।
অর্থাৎ একটি রাজ্যে যে করব্যবস্থা সফল, অন্য রাজ্যেও সেটি একইভাবে কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
![]()
মিসৌরির জন্য টেনেসি কতটা বাস্তবসম্মত?
মিসৌরিতে আয়কর বাতিলের সমর্থকেরা টেনেসিকে তুলনামূলক বাস্তবসম্মত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ ক্যারোলিনার দিকেও নজর রয়েছে। সেখানে মার্চ মাসে আইনপ্রণেতারা আয়কর ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
উত্তর ক্যারোলিনাতেও আয়কর কমানো এবং তার সর্বোচ্চ হার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখার বিষয়ে নভেম্বর মাসে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে আগামী দিনে আরও কয়েকটি রাজ্য একই পথে হাঁটতে পারে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোচনা বাড়ছে।
কিন্তু মিসৌরির বাস্তবতা ভিন্ন
আয়কর বাতিলের বিরোধীরা বলছেন, বিভিন্ন রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো এক নয়। তাই একটি রাজ্যের সাফল্য দেখে অন্য রাজ্য একই নীতি গ্রহণ করলে একই ফল পাওয়া যাবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক।
টেনেসি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যক্তিগত আয়করের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল ছিল না। তাই সেখানে আয়কর পুরোপুরি বাতিল করার প্রভাব তুলনামূলকভাবে সামলানো সহজ হয়েছে।
মিসৌরির পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। গত বছর রাজ্যটির মোট রাজস্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছিল ব্যক্তিগত আয়কর থেকে। ফলে এই আয়কর একেবারে তুলে দিলে যে বিশাল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হবে, সেটি পূরণ করতে অন্য কোনো কর বা রাজস্বের উৎস বাড়াতে হবে।
এখানেই বিতর্কের মূল জায়গা।
এক কর কমালে অন্য কর বাড়ানোর চাপ
মিসৌরিতে আয়কর বাতিলের বিরোধীরা মনে করছেন, একটি কর তুলে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে সরকারের অর্থের প্রয়োজনও শেষ হয়ে যাবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে রাজ্যের ব্যয় চলতেই থাকবে।
ফলে আয়কর কমানো বা বাতিল করা হলে বিকল্প হিসেবে বিক্রয়কর, সেবার ওপর কর, সম্পত্তি কর কিংবা অন্যান্য ফি বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
এর আগে ২০১৬ সালে মিসৌরির ভোটাররা সেবার ওপর নতুন কর আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে আয়কর বাতিলের পর বিকল্প রাজস্ব সংগ্রহ কতটা সহজ হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ পর্যন্ত মিসৌরির ভোটে আয়কর ধীরে ধীরে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব ব্যর্থ হয়েছে। তবে এই ভোট যুক্তরাষ্ট্রের করনীতির একটি বড় পরিবর্তনের দিক স্পষ্ট করেছে। দেশটির একদিকে যেমন ধনী মানুষের ওপর কর বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন রাজ্যগুলোর একটি অংশ মানুষের আয় থেকে কর সরিয়ে অন্য উৎসের ওপর নির্ভর করতে চাইছে।
আগামী দিনে এই দুই ভিন্ন করদর্শনের প্রতিযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















