যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসের মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তা ও এজেন্টের শরীরে ক্যামেরা বসানোর কার্যক্রম চলতি আগস্টের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হবে। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডেভিড ভেনচুরেলা শনিবার এ ঘোষণা দিয়েছেন।
আইসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাঠে দায়িত্ব পালনকারী প্রত্যেক কর্মকর্তা ও এজেন্টকে আগস্টের শেষ নাগাদ শরীরে পরিধানযোগ্য ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। সংস্থাটির আগের নির্ধারিত সময়সূচির তুলনায় এই কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের ফলে অভিবাসন অভিযান, আটক, গাড়ি থামানো এবং অন্যান্য মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ক্যামেরায় ধারণ করার সুযোগ তৈরি হবে। আইন প্রয়োগের সময় কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে ক্যামেরার ধারণ করা ভিডিও তা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
গুরুতর আহত বা মৃত্যুর ঘটনায় ফুটেজ প্রকাশের সুযোগ
আইসের নীতিমালায় বলা হয়েছে, হেফাজতে থাকা কোনো ব্যক্তির গুরুতর আহত হওয়া বা মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটলে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও দ্রুত প্রকাশ করা যেতে পারে।

তবে সব পরিস্থিতিতে ভিডিও প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়। কোনো ফুটেজ প্রকাশ করলে চলমান তদন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে হলে সংস্থা সেটি আটকে রাখতে পারবে। একইভাবে ভিডিও প্রকাশের কারণে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ফুটেজ প্রকাশ না করার সুযোগ থাকবে।
ফলে নতুন ক্যামেরা ব্যবস্থা একদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে তদন্তের গোপনীয়তা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকছে।
মিনেসোটায় দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর চাপ
আইসের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহারের কর্মসূচি দেশব্যাপী চালুর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায় মিনেসোটায় অভিবাসনবিরোধী অভিযানের সময় দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর।
ওই ঘটনার পর তৎকালীন মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা প্রধান ক্রিস্টি নোয়েম জানিয়েছিলেন, অর্থায়ন পাওয়া সাপেক্ষে আইসের প্রতিটি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাকে শরীরে ক্যামেরার আওতায় আনা হবে।
এরপর অভিবাসন কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড রেকর্ড করার দাবি আরও জোরালো হয়। বিশেষ করে অভিযান চলাকালে গুলিবর্ষণ বা প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটলে কী ঘটেছিল, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার জন্য ক্যামেরার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে আসে।
মেইন ও টেক্সাসের গুলির ঘটনায় বিতর্ক
গত মাসে মেইন ও টেক্সাসে গাড়ি থামানোর সময় গুলিতে মৃত্যুর দুটি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা ঘিরে প্রতিবাদ শুরু হয় এবং আইস কর্মকর্তাদের শরীরে ক্যামেরা না থাকার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে কী ঘটেছিল তা যাচাই করার জন্য যদি কোনো ভিডিও না থাকে, তাহলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে আইসের শরীরে ক্যামেরা ব্যবহারের কর্মসূচিকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গাড়ি থামানোর সময় ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক
এরপর ট্রাম্প প্রশাসনের সীমান্তবিষয়ক কর্মকর্তা টম হোম্যান জানান, আইস কর্মকর্তাদের গাড়ি থামানোর সময় অন্তত একটি শরীরে পরিধানযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহার করে পুরো কার্যক্রম রেকর্ড করতে হবে।
এই নির্দেশের ফলে গাড়ি থামানো, কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথোপকথন এবং পরবর্তী পদক্ষেপের একটি ভিডিও নথি তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে।
বিশেষ করে সড়কে গাড়ি থামানোকে কেন্দ্র করে কোনো বিরোধ, বলপ্রয়োগ, গুলিবর্ষণ বা আটকের ঘটনা ঘটলে ক্যামেরার ফুটেজ পরবর্তী তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জবাবদিহিতা বাড়ানোর উদ্যোগ
আইসের সব মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও এজেন্টকে ক্যামেরার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন প্রয়োগ ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা বাড়ানোর একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অভিবাসন অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক রয়েছে। কর্মকর্তাদের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা থাকায় তাদের কর্মকাণ্ড কতটা নিয়ম মেনে হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে।
শরীরে থাকা ক্যামেরার মাধ্যমে অভিযানের সময়কার দৃশ্য সংরক্ষণ করা গেলে অভিযোগ, বিরোধ বা প্রাণঘাতী ঘটনার পর তদন্তকারীরা ভিডিও প্রমাণ পর্যালোচনা করতে পারবেন।
তবে ক্যামেরা থাকলেই সব ফুটেজ জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে না। তদন্তের স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনা করে আইস প্রয়োজন অনুযায়ী ভিডিও আটকে রাখতে পারবে।
আগস্টের শেষেই পুরো কার্যক্রম
আইসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডেভিড ভেনচুরেলার ঘোষণা অনুযায়ী, আগস্টের শেষ নাগাদ মাঠে থাকা প্রতিটি কর্মকর্তা ও এজেন্টকে ক্যামেরার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে সংস্থাটির আগের সময়সূচির চেয়েও দ্রুত দেশব্যাপী ক্যামেরা কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিডিও রেকর্ড একটি নিয়মিত অংশ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ এবং অভিযান চলাকালে ঘটে যাওয়া গুরুতর ঘটনার বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও বেশি ভিডিও প্রমাণ পাওয়া সম্ভব হবে।
অভিবাসন অভিযানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে যখন নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা নিয়ে বিতর্ক চলছে, তখন আইসের এই ক্যামেরা কর্মসূচি সেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















