থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের উপকণ্ঠের একটি স্কুলে শুক্রবার সকালটা হঠাৎই পরিণত হয় আতঙ্ক আর মৃত্যুর মিছিলে। শ্রেণিকক্ষের দরজা আটকে, আলো নিভিয়ে, জানালার পাশে গা ঢাকা দিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছিল ১৪ বছরের শিক্ষার্থীরা। বাইরে তখন একের পর এক গুলির শব্দ। কেউ জানত না পরের গুলিটি কোথায় গিয়ে আঘাত করবে।
দেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলে ঘটে যাওয়া এই হামলায় এখন পর্যন্ত নয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৩ জন। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিক্ষক ও দুজন স্কুল কর্মকর্তা রয়েছেন। হামলাকারীও নিহত হয়েছে। শনিবার ১২ বছরের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে নয়জনে দাঁড়ায়।
২০২২ সালের পর এটিই থাইল্যান্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্দুক হামলা। ঘটনাটি দেশটিতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
প্রথমে মনে হয়েছিল নির্মাণকাজের শব্দ
শুক্রবার সকাল। স্কুলের ভবনের একটি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ১৪ বছরের খিম ও তার সহপাঠীরা হঠাৎ একটি গুলির শব্দ শুনতে পায়। প্রথমে তারা ভেবেছিল, হয়তো কাছাকাছি কোনো নির্মাণকাজ চলছে।
কিন্তু পরপর আরও কয়েকটি বিকট শব্দ শোনা যায়।
![]()
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে এক শিক্ষক দ্রুত শিক্ষার্থীদের একটি শ্রেণিকক্ষে নিয়ে যান। তিনি শিক্ষার্থীদের একটি বার্তা আদান-প্রদানকারী দলের খবর দেখে নিশ্চিত হন—স্কুলের ভেতরেই একজন বন্দুকধারী সক্রিয় রয়েছে।
খিম জানায়, গুলির শব্দ শোনার পর তার মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো আর বেঁচে ফিরবে না।
শ্রেণিকক্ষের দরজা নিরাপদ করতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ডেস্ক সরিয়ে দরজার সামনে ব্যারিকেড তৈরি করে। এরপর আলো নিভিয়ে সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়ে জানালার কাছাকাছি লুকিয়ে থাকে।
‘মা, আমাকে ফোন কোরো না’
এরপর শুরু হয় অপেক্ষা। বাইরে কী ঘটছে, তা জানার জন্য খিম তার হাতে থাকা যন্ত্রে সহপাঠীদের বার্তা দেখতে থাকে।
এ সময় তার বড় বোন জানায়, সে পাশের চার নম্বর ভবনের একটি শ্রেণিকক্ষে আটকা পড়েছে। একই সময়ে তাদের মা-ও মেয়েকে ফোন করে স্কুলে বন্দুকধারী থাকার খবর দেন।
খিম মাকে জানান, সে বিষয়টি জানে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মাকে বলেন, তাকে যেন ফোন না করেন।
কারণ ফোনের শব্দ বেজে উঠলে বন্দুকধারী তাদের অবস্থান জেনে যেতে পারে।
এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের বার্তা আদান-প্রদানের দলগুলোতে সন্দেহভাজন হামলাকারীর ছবি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। স্কুলটি বড়—গত বছরের তথ্য অনুযায়ী এখানে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং প্রায় দেড়শ শিক্ষক রয়েছেন।

কিছুক্ষণ পর খিম এমন একটি গুলির শব্দ শুনতে পায়, যা তার ভাষায় এতটাই তীব্র ছিল যে মনে হয়েছিল শব্দটি যেন তার কানের পাশেই হয়েছে।
তখনই সে বুঝতে পারে, বন্দুকধারী তাদের শ্রেণিকক্ষ থেকে মাত্র কয়েকটি দরজা দূরে।
খিম জানত না, হামলাকারী নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে কি না। সে এটাও জানত না, পুরো স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওপরই হামলা চালানোর উদ্দেশ্য তার রয়েছে কি না।
চল্লিশ মিনিটের আতঙ্ক
প্রায় ৪০ মিনিট ধরে স্কুলের ভেতরে চলতে থাকে আতঙ্কের পরিস্থিতি।
পুলিশ স্কুলের কিছু অংশ নিরাপদ করার চেষ্টা করছিল। একপর্যায়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার নির্দেশ দেন।
কিন্তু ততক্ষণে হামলাকারী পাশের চার নম্বর ভবনে চলে গেছে। সেখানেই তখন খিমের বড় বোন লুকিয়ে ছিল।
এই কয়েক মিনিটই পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়াবহ সময়।
‘গুলির শব্দ গুনে দেখো’
শুক্রবার সকালে একটি সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছিলেন ৫২ বছরের নার্স কোয়ান। হঠাৎ তার বড় মেয়ে ফোন করে জানায়, স্কুলে গুলি চলছে।
মেয়ের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং শিক্ষার্থীদের বার্তা আদান-প্রদানের দলের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে কোয়ানের ধারণা হয়, হামলাকারীর হাতে সম্ভবত একটি হাতবন্দুক রয়েছে।

তিনি তখন মেয়েকে একটি অদ্ভুত কিন্তু জীবন বাঁচানোর মতো নির্দেশ দেন—গুলির শব্দ গুনতে।
কোয়ানের ধারণা ছিল, এ ধরনের অস্ত্রে সাধারণত একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০টির বেশি গুলি থাকে না। তাই তিনি মেয়েকে বলেন, গুলির সংখ্যা গুনে দেখতে, হয়তো একসময় হামলাকারীর গুলি শেষ হয়ে যাবে।
পরে পুলিশ জানায়, হামলাকারী অন্তত ২৬টি গুলি ছুড়েছিল। তার কাছে আরও ৩৪টি গুলি পাওয়া যায়।
কিন্তু মায়ের আশঙ্কা সত্যি হয়ে ওঠে। গুলির শব্দ ধীরে ধীরে আরও কাছে আসতে থাকে।
একপর্যায়ে শব্দ পৌঁছে যায় চার নম্বর ভবনে—যেখানে কোয়ানের মেয়ে লুকিয়ে ছিল।
ফোনের ওপাশে শুধু আতঙ্ক
কোয়ান আরেকটি ফোন থেকে জরুরি সেবায় যোগাযোগ করেন। তাকে জানানো হয়, পুলিশ ও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি ইউনিট স্কুলে পৌঁছে গেছে।
তিনি তখন জরুরি সেবার কর্মীকে জানান, তার মেয়ে ফোনের স্পিকারে রয়েছে। মেয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দুকধারী দ্বিতীয় তলায় একের পর এক কক্ষ তল্লাশি করছিল এবং এক পাশ থেকে অন্য পাশে এগিয়ে যাচ্ছিল।
এরপর হঠাৎ মেয়ের সঙ্গে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কোয়ান অপেক্ষা করতে থাকেন। তিনি প্রার্থনা করতে শুরু করেন।

কয়েক মিনিট পর মেয়ের ফোন আবার আসে।
মেয়ে তখনও নিরাপদ। অক্ষত অবস্থায় বেঁচে আছে।
ঘরে ফিরে বদলে গেল দুই বোনের সম্পর্ক
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্যরা ব্যাংককের উপকণ্ঠে নিজেদের বাড়িতে আবার একত্রিত হন।
দুই বোনের সম্পর্ক নিয়ে খিমের স্বীকারোক্তি ছিল গভীরভাবে আবেগময়। সে জানায়, তারা একসঙ্গে থাকলে প্রায়ই ঝগড়া করে। কিন্তু এই ভয়াবহ ঘটনার পর বোনকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মৃত্যুর এত কাছ থেকে ফিরে এসে সে বুঝেছে, নিজের বড় বোনকে সে কতটা ভালোবাসে।
এদিকে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, স্কুলে হামলা চালানোর আগে সন্দেহভাজন ১৪ বছরের কিশোরটি ভোরে নিজের বাড়িতে তার দাদা-দাদিকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের ওই স্কুলে বাসে করে যায়। সকাল ১০টার কিছু আগে স্কুলে পৌঁছে সে গুলি চালানো শুরু করে।

প্রায় ৪০ মিনিটের সেই হামলায় প্রাণ হারান শিক্ষক, স্কুল কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীসহ একাধিক মানুষ। শেষ পর্যন্ত হামলাকারী নিজেও আত্মহত্যা করে।
শনিবার ১২ বছরের এক মেয়ের মৃত্যুর খবর আসার পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে নয়জনে। আহত ২৩ জনের চিকিৎসা চলছে।
এই হামলা থাইল্যান্ডে বন্দুক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় অস্ত্রধারী সমাজ হওয়ায় স্কুলের মতো নিরাপদ বলে বিবেচিত জায়গায় এমন হামলা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
একটি শ্রেণিকক্ষের দরজার ওপাশে যখন গুলির শব্দ এগিয়ে আসছিল, তখন শিশুদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল না কেন এই ঘটনা ঘটল। তাদের একমাত্র প্রশ্ন ছিল—আর কতক্ষণ বেঁচে থাকা যাবে?
খিমের সেই কথাই হয়তো পুরো ঘটনার সবচেয়ে মানবিক প্রতিচ্ছবি—‘মা, আমাকে ফোন কোরো না।’

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















