মিসিসিপির ক্যান্টনে নিসানের গাড়ি তৈরির কারখানায় এখন কর্মীদের কাজের ধরন বিশ্লেষণ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ক্যামেরা। কর্মীরা কীভাবে হাঁটছেন, ঝুঁকছেন, শরীর মোচড়াচ্ছেন কিংবা গাড়ির বিভিন্ন অংশ সংযোজন করছেন—এসব নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি শনাক্ত করছে প্রযুক্তিটি।
কারখানাটিতে নিসানের অল্টিমা সেডান ও ফ্রন্টিয়ার পিকআপ তৈরি হয়। কোম্পানির দাবি, প্রযুক্তিটি শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সাহায্য করছে না, বরং কর্মীদের শারীরিক চাপ ও আঘাতের ঝুঁকি কমাতেও বড় ভূমিকা রাখছে।
কর্মীর শরীরের ভঙ্গি বিশ্লেষণ করে এআই
নিসানের প্রতিটি কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘আদর্শ কর্মচক্র’ রয়েছে। এতে একটি কাজ কীভাবে করা হবে, গাড়ির কোন অংশ কোন ক্রমে বসানো হবে, কত সময় লাগবে এবং কর্মীর শরীরের কোন ভঙ্গি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ—এসব নির্ধারণ করা থাকে।
ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই কর্মীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। কোনো কর্মী প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঝুঁকে গেলে বা দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাজ করলে সিস্টেম সম্ভাব্য ঝুঁকির সংকেত দেয়।
এরপর ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশলীরা ওই তথ্য ব্যবহার করে কর্মীকে নিরাপদভাবে কাজ করার প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। প্রয়োজনে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া, কাজের পদ্ধতি পরিবর্তন করা কিংবা কর্মস্থলের নকশায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তও নেওয়া যায়।
মানুষের পর্যবেক্ষণের বদলে প্রযুক্তি
নিসানের প্রকৌশলী চি আমেচির মতে, আগে কর্মীদের কাজের ভঙ্গি পর্যবেক্ষণে মানুষের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু কর্মীরা জানতেন যে কেউ তাদের দেখছে, তখন স্বাভাবিক আচরণ বদলে ফেলতে পারতেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা সেই সীমাবদ্ধতা কমিয়েছে। কর্মীরা প্রতিদিন স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সময় তাদের নড়াচড়া বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা যায়।
তবে নিসান বলছে, এর উদ্দেশ্য কর্মী ছাঁটাই নয়। কোম্পানির উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তা ভিক্টর টেলরের ভাষায়, লক্ষ্য হলো এমন একঘেয়ে ও পুরোনো ধরনের কাজ কমানো, যা মানুষের শরীরের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে।
কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ ছিল কর্মীদের
প্রযুক্তিটি চালুর শুরুতে কর্মীদের মধ্যে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে কারখানার নিরাপত্তা কমিটিগুলোর মাধ্যমে কর্মীদের শুরু থেকেই আলোচনায় যুক্ত করা হয়।
নিসান যখন বোঝায় যে প্রযুক্তিটির মূল লক্ষ্য নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ উন্নত করা, তখন কর্মীদের মনোভাবও ধীরে ধীরে বদলায়। এমনকি প্রযুক্তির বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কাজের ধরন পরিবর্তনের কিছু উদ্যোগ কর্মীরাই স্বাগত জানিয়েছেন বলে কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার সাশ্রয়ের দাবি
নিসানের হিসাবে, ক্যান্টন কারখানায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও কর্মীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যয়ে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার সাশ্রয় হয়েছে।
কোম্পানির দাবি, প্রযুক্তিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারখানার অভিজ্ঞ ও বয়স্ক কর্মীদের ক্ষেত্রে। অনেক কর্মী সেখানে ২০ থেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ধরে রাখার পাশাপাশি শারীরিক চাপ কমানোও এখন নিসানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে প্রযুক্তিটি শুধু ক্যান্টন কারখানাতেই চালু রয়েছে। সেখানে প্রয়োগ পুরোপুরি সম্পন্ন করার পর টেনেসির স্মির্না কারখানায় এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে অন্যান্য উৎপাদনকেন্দ্রেও এর ব্যবহার কতটা করা যায়, তা মূল্যায়ন করবে কোম্পানিটি।
নিসানের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় নতুন প্রযুক্তি
গত কয়েক বছর নিসানের জন্য সহজ ছিল না। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে এবং নতুন ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো, উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্বিন্যাস ও কার্যক্রম সহজ করার পরিকল্পনা নেয়।
এর প্রভাব ক্যান্টন কারখানাতেও পড়েছে। মে মাসে সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির জন্য ৫০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা বাতিল করে নিসান।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কিছু ইতিবাচক সংকেতও পেয়েছে। দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি প্রান্তিকে নিট মুনাফা করেছে কোম্পানিটি। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে বিক্রি বাড়ার পাশাপাশি ব্যয় কমানোর পদক্ষেপও এতে ভূমিকা রেখেছে।
নিসানের ক্যান্টন কারখানার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, গাড়ি উৎপাদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুধু দ্রুত উৎপাদন বা খরচ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কর্মীদের শরীরের ওপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মীদের নিরাপদে কাজে ধরে রাখাও এ প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















