আফ্রিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ হয়তো সিলিকন ভ্যালির বিশালাকৃতির মডেলের পথ অনুসরণ করবে না। বরং কম্পিউটিং শক্তি, তথ্য ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে আফ্রিকার গবেষক ও উদ্যোক্তারা তৈরি করছেন ছোট, নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী এবং স্থানীয় ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
নাইজেরিয়ার উদ্যোক্তা ওলুবায়ো আদেকানবমির কাছে আফ্রিকান এআইয়ের একটি পরিষ্কার চিত্র রয়েছে। তাঁর মতে, এমন এআই দরকার যা ইংরেজির মতো আফ্রিকার স্থানীয় ভাষাতেও স্বচ্ছন্দ, লিখিত কথার পাশাপাশি মুখের ভাষা বুঝতে পারে এবং কম শক্তিশালী যন্ত্রেও কাজ করতে পারে। কারণ আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে উন্নত চিপের সরবরাহ সীমিত, আবার ইন্টারনেট সংযোগও সব জায়গায় নির্ভরযোগ্য নয়।
এই চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে টেলিযোগাযোগ খাতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পর আদেকানবমি ‘ইকুয়ালাইজএআই’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানটি মায়েদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শ, ব্যবসায়ীদের হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকের গ্রাহকসেবা পরিচালনার মতো নির্দিষ্ট কাজের জন্য এআই সরঞ্জাম তৈরি করছে। এসব ব্যবস্থা ইংরেজির পাশাপাশি নাইজেরিয়ার চারটি স্থানীয় ভাষায় কাজ করতে পারে।
স্থানীয় ভাষাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
আফ্রিকায় বড় বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও স্থানীয় ভাষার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। কর্মক্ষম বয়সী মানুষের মধ্যে ইথিওপিয়ায় প্রায় ৮ শতাংশ, কঙ্গোতে ৯ শতাংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ২৩ শতাংশ মানুষ সৃষ্টিশীল এআই ব্যবহার করেছেন বলে মাইক্রোসফটের হিসাব।
চ্যাটজিপিটির ব্যবহারও আফ্রিকায় দ্রুত বাড়ছে। তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে কম। চীনে তৈরি এআই মডেলও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সমস্যা হলো, সবচেয়ে উন্নত বৃহৎ ভাষা মডেলগুলোরও আফ্রিকার ভাষায় দক্ষতা ইংরেজির তুলনায় অনেক কম। বিভিন্ন পরীক্ষায় আফ্রিকান ভাষায় এসব মডেলের ফলাফল ইংরেজির তুলনায় সাধারণত ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কম।
শুধু ভাষা নয়, স্থানীয় উপভাষা এবং একই কথোপকথনে একাধিক ভাষা ব্যবহারের প্রবণতাও এআইয়ের জন্য বড় সমস্যা। আফ্রিকার মানুষ প্রায়ই একই বাক্যে ইংরেজি ও মাতৃভাষা মিলিয়ে কথা বলেন। এ ধরনের ভাষা পরিবর্তন বা মিশ্র কথাবার্তা অনেক এআই মডেলের পক্ষে সঠিকভাবে বোঝা কঠিন।
তথ্যের ঘাটতিই মূল বাধা
আফ্রিকান ভাষায় এআইয়ের দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরিতে ব্যবহৃত ‘কমন ক্রল’ তথ্যভান্ডার গত জুলাইয়ে প্রায় ৮৭ কোটি ২০ লাখ ইংরেজি ওয়েব পৃষ্ঠা সংগ্রহ করেছে। অথচ আমহারিক ভাষায় পৃষ্ঠার সংখ্যা ছিল মাত্র প্রায় ৮০ হাজার।
আফ্রিকার ভাষাগুলোর মধ্যে সোয়াহিলি তুলনামূলকভাবে বেশি তথ্য পেয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আফ্রিকার অধিকাংশ ভাষাই অনলাইনে তথ্যের দিক থেকে বিশ্বের অনেক ছোট ভাষার চেয়েও পিছিয়ে।
মুখের ভাষা বোঝার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। উচ্চমানের অডিও তথ্য খুবই সীমিত। ফলে আফ্রিকার গবেষকেরা নিজেরাই বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ ও উপভাষার মানুষের কথা রেকর্ড করে নতুন তথ্যভান্ডার তৈরি করছেন। গুগল ও বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানও এসব উদ্যোগে সহায়তা করছে।
রুয়ান্ডার ডিজিটাল উমুগান্ডা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের মানুষের কথা সংগ্রহ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে কোনো একটি বয়স, লিঙ্গ বা অঞ্চলের ভাষাভঙ্গি অতিরিক্ত প্রাধান্য না পায়।

বিশাল মডেলের বদলে ছোট মডেল
আফ্রিকার গবেষকেরা শূন্য থেকে বিশাল এআই মডেল তৈরি করার বদলে উন্মুক্ত মডেলকে স্থানীয় তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত করছেন। এতে কম কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হয় এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী এআই তৈরি করা সম্ভব।
কেনিয়ার স্বাস্থ্যবিষয়ক বেসরকারি সংস্থা জাকারান্ডা হেলথ মেটার ‘লামা ২’ মডেলকে সোয়াহিলি ভাষায় প্রশিক্ষিত করেছে, যাতে সেটি মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারে।
তবে এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। স্থানীয় তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণের পর কোনো মডেল নির্দিষ্ট কাজে ভালো করলেও সাধারণ কাজের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি অত্যাধুনিক মডেলের চেয়ে পিছিয়ে থাকতে পারে।
নির্দিষ্ট কাজের জন্য ক্ষুদ্র এআই
এই জায়গাতেই আফ্রিকার নতুন উদ্ভাবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে—ক্ষুদ্র ভাষা মডেল।
এসব মডেলে সাধারণত কয়েকশ কোটি বা তারও কম পরামিতি থাকে, যেখানে সবচেয়ে উন্নত বৃহৎ ভাষা মডেলগুলোতে পরামিতির সংখ্যা কয়েক ট্রিলিয়ন পর্যন্ত হতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার লেলাপা এআই এমন একটি মডেল তৈরি করেছে, যার নাম ‘ইনকুবাএলএম’। এতে প্রায় ৪০ কোটি পরামিতি রয়েছে। নামটি নেওয়া হয়েছে ইসিজুলু ভাষার একটি শব্দ থেকে, যার অর্থ এমন এক গোবরপোকা, যে নিজের ওজনের তুলনায় বহু গুণ ভারী বস্তু সরাতে পারে।
এই ধরনের ছোট মডেলের বড় সুবিধা হলো এগুলো স্থানীয় যন্ত্রে এমনকি ইন্টারনেট ছাড়াও চালানো সম্ভব।
তথ্যের নিরাপত্তা ও এআইয়ের সার্বভৌমত্ব
স্থানীয়ভাবে এআই চালানোর আরেকটি বড় সুবিধা হলো সংবেদনশীল তথ্য দেশের বাইরে পাঠাতে হয় না।
নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলের কানু রাজ্য সরকারের জন্য ইকুয়ালাইজএআই এমন একটি স্থানীয় মডেল তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তারা বিভিন্ন নথি ও বৈঠকের রেকর্ড থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নিতে পারেন।
আদেকানবমির ভাষায়, কোনো দেশ যদি এআইয়ের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে চায়, তাহলে ছোট মডেলই হতে পারে কার্যকর পথ।
আফ্রিকার এই পদ্ধতি তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রচলিত ধারণার কিছুটা বিপরীত। যেখানে সিলিকন ভ্যালির বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বড় মডেল, আরও বেশি তথ্য এবং আরও শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সেখানে আফ্রিকার উদ্ভাবকেরা গুরুত্ব দিচ্ছেন ছোট আকার, স্থানীয় বাস্তবতা এবং নির্দিষ্ট প্রয়োজনকে।
বিশ্বের এআই প্রতিযোগিতায় এই মডেল শেষ পর্যন্ত কতটা টিকে থাকবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে আফ্রিকা দেখিয়ে দিচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শক্তি সবসময় তার আকারে নয়—কখনো কখনো স্থানীয় মানুষের বাস্তব সমস্যার উপযোগী ছোট প্রযুক্তিই সবচেয়ে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















