উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ার ভূতাত্ত্বিক সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড এখন বড় এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল দেশটি এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরও কাছে যাবে কি না, তা নিয়ে জনগণের মতামত জানতে যাচ্ছে।
আগামী ২৯ আগস্ট প্রায় চার লাখ মানুষের দেশটিতে গণভোট হবে—ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যপদ পাওয়ার আলোচনা আবার শুরু করা হবে কি না, সেই প্রশ্নে। তবে এই ভোট সরাসরি ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। আলোচনা শেষ হওয়ার পর সদস্যপদ গ্রহণের বিষয়ে আলাদা গণভোট হবে।
পুরোনো সম্পর্ক, নতুন বাস্তবতা
আইসল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। দেশটিতে ন্যাটোর কেফ্লাভিক ঘাঁটি রয়েছে এবং দেশটির আকাশসীমা ও আশপাশের সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বিমান নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে।
অন্যদিকে ইতিহাস ও অর্থনীতির দিক থেকে আইসল্যান্ড গভীরভাবে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত। দেশটি ১৯৪৪ সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বর্তমানে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক এলাকার সদস্য।
প্রায় দুই দশক আগে আইসল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার আলোচনা শুরু করেছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে ইউরোপবিরোধী একটি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
এখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আবার দেশটির ইউরোপমুখী হওয়ার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নীতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে
আইসল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত হুমকি।
গ্রিনল্যান্ড আইসল্যান্ড থেকে মাত্র প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে। স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ অঞ্চলটির ওপর ট্রাম্পের অধিকার প্রতিষ্ঠার হুমকি আইসল্যান্ডের অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।
আইসল্যান্ডের নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই। দেশটির হাতে মূলত উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ রয়েছে। তাই আকাশ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তার জন্য তাকে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জুলাইয়ের এক দিনে কেফ্লাভিকের ন্যাটো ঘাঁটি প্রায় অস্বাভাবিকভাবে নীরব ছিল। একজন আইসল্যান্ডীয় কর্মকর্তা জানান, মার্কিন বিমানগুলো তখন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্যস্ত ছিল।
এর পাশাপাশি আইসল্যান্ডের আশপাশে রুশ সামরিক তৎপরতাও বাড়ছে। দেশটির কাছে রুশ সাবমেরিনের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জুন মাসে আইসল্যান্ডের জলসীমার ঠিক বাইরে একটি রুশ গোয়েন্দা জাহাজ শনাক্ত করা হয়।
আইসল্যান্ড সরকার এখন সম্ভাব্য অবকাঠামো হামলা ও অন্যান্য অপ্রচলিত বা গোপন ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কাও করছে।
ইউরোপকে নিরাপত্তার বিকল্প হিসেবে দেখছে কেউ কেউ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন মূলত সামরিক জোট নয়। তবে এর সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার একটি ব্যবস্থা রয়েছে। ছোট একটি দেশের জন্য ভূখণ্ড, বাণিজ্য কিংবা অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ইউরোপীয় সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ ডেনমার্কের অনুরোধে প্রতীকীভাবে সেনা পাঠিয়েছিল। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁও গ্রিনল্যান্ড সফর করে ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানান।
আইসল্যান্ডের ইউরোপপন্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী থরগেরদুর কাটরিন গুনারসদোত্তির মনে করেন, বাণিজ্য ও শুল্ক যখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন ছোট দেশ হিসেবে আইসল্যান্ডের নিজের স্বার্থ কোথায় সবচেয়ে ভালোভাবে সুরক্ষিত হবে, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
তার মতে, গ্রিনল্যান্ডের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেভাবে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তা আইসল্যান্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

ইউরোপবিরোধী শিবিরও শক্তিশালী
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যাওয়ার প্রশ্নে আইসল্যান্ডের সমাজে গভীর বিভাজন রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সদস্যপদ আলোচনা পুনরায় শুরু করার পক্ষে সমর্থন মাত্র ৫২ থেকে ৫৩ শতাংশ।
অর্থাৎ সামান্য ব্যবধানেই ইউরোপপন্থীরা এগিয়ে রয়েছে। শেষ মুহূর্তে এই ব্যবধান বদলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপবিরোধী প্রচারে বাম ও ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী, রক্ষণশীল এবং দেশের বড় মাছধরা শিল্পের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে কাজ করছে। তাদের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে আইসল্যান্ডের মাছ ধরার জলসীমা, কৃষি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মকানুন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা।
প্রচারে কিছু বিভ্রান্তিকর দাবিও ছড়িয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, আসন্ন গণভোটেই নাকি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। আরেকটি দাবি, ইউনিয়নে গেলে আইসল্যান্ডকে একটি ইউরোপীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে।
বাস্তবে কোনোটিই সঠিক নয়। ২৯ আগস্টের ভোট কেবল সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তের জন্য।
আইসল্যান্ডকে নিয়ে ইউরোপও সতর্ক
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য আইসল্যান্ডের সম্ভাব্য সদস্যপদ আকর্ষণীয়। দেশটির মাথাপিছু আয় ইউনিয়নের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। তাছাড়া সদস্যপদ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাজ আইসল্যান্ড আগেই সম্পন্ন করেছে।
মাছ ধরার অধিকার নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় কমিশন কিছুটা নমনীয়তার সুযোগ রাখার কথা জানিয়েছে।
তবে ইউরোপীয় নেতারা প্রকাশ্যে খুব বেশি চাপ দিতে চাইছেন না। তারা চান না, আইসল্যান্ডের ভোটারদের মনে এমন ধারণা তৈরি হোক যে বাইরের কোনো শক্তি তাদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো ২০ জুলাই রেইকিয়াভিক সফরের সময় বলেন, আলোচনা শুরু করলে আইসল্যান্ডের জনগণের হারানোর কিছু নেই। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
‘না’ ভোট হলে প্রতীকী ধাক্কা
গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে তা শুধু আইসল্যান্ডের জন্য নয়, ইউরোপের জন্যও একটি প্রতীকী ধাক্কা হবে।
দীর্ঘদিন ধরে আইসল্যান্ডের মানুষ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে এসেছে। ফলে ইউরোপকে নিরাপত্তার বিকল্প হিসেবে দেখার মানসিকতা এখনও সবার মধ্যে তৈরি হয়নি।
আইসল্যান্ডের অভিজ্ঞ সম্প্রচারক বোগি অগুস্তসনের ভাষায়, দেশটির অনেক মানুষ এখনও বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিতে চাইছেন না এবং ইউরোপকে নিরাপত্তার বিকল্প হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করছেন না।
আইসল্যান্ডের সামনে তাই প্রশ্নটি কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার নয়। প্রশ্নটি হলো—বদলে যাওয়া বৈশ্বিক রাজনীতি, আর্কটিক অঞ্চলের নতুন প্রতিযোগিতা এবং অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিবেশে দেশটি ভবিষ্যতে কার ওপর কতটা নির্ভর করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















