করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা সামলে ইউরোপের অর্থনীতিকে দ্রুত ঘুরে দাঁড় করাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে বিশাল পুনরুদ্ধার তহবিল গঠন করেছিল, তার সুফল কি সত্যিই মিলেছে? বিশেষ করে ইতালি ও স্পেনের মতো বড় সুবিধাভোগী দেশগুলো কতটা এগিয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি ইতিবাচকও নয়, আবার নেতিবাচকও নয়।
ফ্লোরেন্সে দৃশ্যমান পরিবর্তন
ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে ১৯৬৬ সালের ভয়াবহ বন্যার পর এত বড় ধরনের অবকাঠামোগত ব্যাঘাত আর দেখা যায়নি। শহরের কেন্দ্র ঘিরে এখন চলছে বিশাল ট্রামপথ নির্মাণ। প্রায় ৫০ কোটি ইউরো ব্যয়ের এই প্রকল্পটি শহরের সবচেয়ে বড় প্রকল্প, যার অর্থের বড় অংশ এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি থেকে।
এই তহবিলের অর্থে ফ্লোরেন্সে শিশুযত্নকেন্দ্র, সাইকেলপথসহ আরও ৫৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। শহরটির মেয়র সারা ফুনারো এটিকে ফ্লোরেন্সের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন।
মাদ্রিদের মাছের বাজারেও প্রযুক্তির ছোঁয়া
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ভোর পাঁচটায়ও জমজমাট থাকে বিশাল পাইকারি বাজার। বিশ্বের অন্যতম বড় মাছের বাজারটিও এখানে। প্রায় ৪ লাখ ইউরোর পুনরুদ্ধার তহবিলের সহায়তায় মাছ ব্যবসায়ীদের সংগঠন ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ ও পণ্য অর্ডারের ব্যবস্থা চালু করেছে।
আগের মতো হাতে লেখা অর্ডার কিংবা ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন হচ্ছে না। ব্যবসায়ী ক্রিশ্চিয়ান কোবো জানান, নতুন ব্যবস্থাটি তাদের বিপুল সময় বাঁচিয়েছে।
ইউরোপের ইতিহাসে নজিরবিহীন তহবিল
এই কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু হলো পুনরুদ্ধার ও স্থিতিস্থাপকতা তহবিল। মহামারির সময় ২০২০ সালে এটি গঠন করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৭৭ বিলিয়ন ইউরোর অনুদান ও ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর আগে এত দ্রুত এত বিপুল অর্থ ব্যয় করেনি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর অর্থের বড় অংশ সংগ্রহ করা হয়েছে যৌথ ঋণপত্রের মাধ্যমে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও শক্তিশালী করার পক্ষের মানুষরা তখন এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
উদ্দেশ্য ছিল মহামারির অর্থনৈতিক ধাক্কা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা, বিশেষ করে ইউরোপের তুলনামূলক দরিদ্র দক্ষিণাঞ্চলকে সহায়তা করা। পাশাপাশি অর্থনীতিকে আরও সবুজ ও ডিজিটাল করা এবং সংস্কারের মাধ্যমে দেশগুলোর অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ানো ছিল পরিকল্পনার অংশ।
ইতালি ও স্পেনের ফলাফল এক নয়
এই তহবিলের সবচেয়ে বড় দুই সুবিধাভোগী হলো ইতালি ও স্পেন। ইতালি পেয়েছে প্রায় ১৯৪ বিলিয়ন ইউরো এবং স্পেন প্রায় ১০৩ বিলিয়ন ইউরো। দুই দেশ মিলে মোট তহবিলের প্রায় ৫২ শতাংশ পেয়েছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে দুই দেশের চিত্র বেশ আলাদা। তহবিল চালুর সময় ইতালি আশা করেছিল, তার বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের প্রায় ১ শতাংশের গড় থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে উঠবে। বাস্তবে ২০২৩ সালের পর থেকে দেশটির বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির হার ১ শতাংশের নিচেই রয়েছে।
অন্যদিকে স্পেন ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর অন্তত ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
স্পেনের সাফল্য কি পুরোপুরি তহবিলের কারণে?
এখানেই বিষয়টি জটিল। স্পেনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এই ইউরোপীয় তহবিলের কারণে হয়নি। মহামারির পর অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
স্পেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও করেছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মীদের অস্থায়ী চুক্তিতে আটকে রাখার সুযোগ নিয়োগদাতাদের জন্য সীমিত করা হয়েছে। ছোট ব্যবসা ও নতুন উদ্যোগের পথে থাকা কিছু নিয়ন্ত্রক বাধাও কমানো হয়েছে।
তবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার এখনো খুব বেশি নয়। গত বছর তা ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
দেশটিতে ব্যাপক অভিবাসনও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ব্যাংক অব স্পেনের হিসাবে, মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় অর্ধেক এবং নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সঙ্গে অভিবাসন যুক্ত।
পর্যটন এবং অন্যান্য সেবা রপ্তানিও স্পেনের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
দীর্ঘমেয়াদে তহবিলের সুফল মিলতে পারে
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপীয় তহবিলের প্রভাব নেই। কিছু প্রকল্পের সুফল বোঝার জন্য আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
স্পেন বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি শিল্পসহ বড় মূলধনী প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করেছে। আন্দালুসিয়ায় স্পেনের জ্বালানি কোম্পানি মোয়েভ প্রায় ১০০ কোটি ইউরো ব্যয়ে একটি সবুজ হাইড্রোজেন কারখানা নির্মাণ করছে। এর মধ্যে ৩০ কোটি ইউরো এসেছে এই তহবিল থেকে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের আশা, আগামী পাঁচ বছরে হাইড্রোজেন তৈরির জন্য ব্যবহৃত তড়িৎ বিশ্লেষণ যন্ত্রের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমবে। তার মতে, সরকারি অর্থায়ন নতুন প্রযুক্তিতে প্রথম বিনিয়োগের ঝুঁকি সামলাতে সহায়তা করছে।
ইতালির সংস্কারেও কিছু অগ্রগতি
ইতালির ক্ষেত্রেও তহবিলের কিছু ইতিবাচক প্রভাব সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হতে পারে। ইউরোপীয় কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশটির বিচারব্যবস্থাকে দ্রুততর করা। ঋণ আদায় ও ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ইতালিতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করত।
মিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের হিসাবে, ২০১৯ সালের তুলনায় আদালতের মামলার গড় সময় প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে।
ইতালিতে শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার আসনও প্রায় দেড় লাখ বাড়ানোর পথে রয়েছে। এর মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় তহবিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব কেন্দ্রের অর্থায়ন কীভাবে চলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া তহবিলের অর্থে নেপলস ও বারির মধ্যে দ্রুতগতির রেলপথ নির্মাণ হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এটি দক্ষিণ ইতালির দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহরকে যুক্ত করবে।
তহবিলের কাঠামোতেই ছিল কিছু দুর্বলতা
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই বিশাল কর্মসূচির কিছু সীমাবদ্ধতাও শুরু থেকেই ছিল। মহামারির সময় দ্রুত অর্থ ছাড় করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ফলে এমন কিছু প্রকল্পেও অর্থ গেছে, যেগুলো হয়তো তহবিল ছাড়াই বাস্তবায়িত হতো।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অর্থ মূলত জাতীয় সরকারগুলোর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। ইউরোপজুড়ে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করা আন্তঃদেশীয় অবকাঠামো প্রকল্পে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ এখনো মহাদেশীয় পর্যায়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি।
তাহলে কি তহবিল সফল?
সার্বিক বিচারে উত্তর হলো—আংশিকভাবে সফল। এই অর্থ ইতালি ও স্পেনে বহু দৃশ্যমান প্রকল্প তৈরি করেছে, ডিজিটাল ও সবুজ বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং কিছু কাঠামোগত সংস্কারকে এগিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু শুধু এই তহবিলের অর্থ দিয়ে স্পেনের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ব্যাখ্যা করা যায় না। আবার ইতালির দুর্বল প্রবৃদ্ধিও তহবিলের সম্পূর্ণ ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। প্রকৃত সাফল্য বোঝা যাবে আরও কয়েক বছর পর, যখন অবকাঠামো, উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্পষ্ট হবে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত অন্য জায়গায়—পরবর্তী প্রজন্মের ইউরোপীয় বিনিয়োগ তহবিল যদি সত্যিই মহাদেশের অর্থনীতিকে বদলে দিতে চায়, তবে জাতীয় প্রকল্পের পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে পুরো ইউরোপকে যুক্ত করা বড় অবকাঠামো ও প্রযুক্তি প্রকল্পে আরও বেশি নজর দিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















