০৮:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা জাপানকে ঘিরে চীনের আগ্রাসী চাপ, আসল লক্ষ্য কি যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আধিপত্য? দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্পে টিএসএমসির কৌশল, যেভাবে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে বিশ্বজয় গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার নয় দ্বৈত কৌশলগত সিদ্ধান্ত: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সংঘাত নয়, শান্তির পথ বেছে নেওয়ার সময় গ্র্যামির ‘এশিয়ান পপ’ খাঁচায় বিটিএসকে বন্দি করা কি সত্যিই স্বীকৃতি?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কা সামলে টিকে আছে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যতটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখনো তার পুরো অভিঘাত দেখা যায়নি। বরং এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের মধ্যেও ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প নতুন ধরনের কাজ, দক্ষতা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে নিজেদের অবস্থান বদলে নিচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আসবে না। বরং এআই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে তরুণ ও প্রবেশপর্যায়ের চাকরিপ্রার্থীদের ওপর।

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখনো বড় ধস নেই

এআইয়ের উত্থানের আগে ভারতের প্রযুক্তি খাত নিয়ে একটি প্রচলিত রসিকতা ছিল—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থ আসলে ‘ভারতীয়রা’। কারণ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও ব্যবসার যে বিপুল কাজ ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের কাছে আউটসোর্স করা হতো, তার বড় অংশই ছিল সফটওয়্যার তৈরি, বেতন ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অন্যান্য নিয়মিত কাজ।

কিন্তু চ্যাটবট ও আধুনিক এআইয়ের অগ্রগতির পর এসব কাজের অনেকটাই মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রের মাধ্যমে করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে ধারণা ছিল, এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত।

বাস্তব চিত্র অবশ্য এখনো তেমন নয়। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সংগঠন ন্যাসকমের হিসাবে দেশটিতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করেন। সংখ্যাটি বিশাল হলেও ভারতের মোট কর্মশক্তির মাত্র প্রায় ১ শতাংশ। ফলে পুরো দেশের কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে এ খাতের পরিবর্তন সহজে ধরা পড়ে না।

বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মী কমলেও কারণ শুধু এআই নয়

ভারতের বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীসংখ্যায় সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পতন দেখা গেছে। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিসসহ শীর্ষ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীসংখ্যা কমেছে।

২০২৩ সালে নিফটি তথ্যপ্রযুক্তি সূচকের অন্তর্ভুক্ত বড় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ লাখ ১০ হাজার। চলতি বছরের জুন শেষে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজারে।

তবে এই পতনকে সরাসরি এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মহামারির সময় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক নিয়োগ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অতিরিক্ত নিয়োগের কিছুটা সমন্বয় করছে। ফলে কর্মীসংখ্যা কমলেও তা এখনো মহামারির আগের প্রবণতার তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।

ক্যাপজেমিনি, কগনিজ্যান্ট ও অ্যাকসেঞ্চারের মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারতীয় কার্যক্রমেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।

নতুন কর্মসংস্থানের বড় কেন্দ্র বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মসংস্থানের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি, মানবসম্পদ, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ভারতে পরিচালনা করছে।

২০১৯ সালে ভারতে এসব কেন্দ্রে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লাখ। চলতি বছর তা বেড়ে প্রায় ২৪ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রচলিত আউটসোর্সিংয়ের বাইরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ভারতে পরিচালনার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।

এআইয়ের যুগে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। কারণ প্রযুক্তি এখন আর কোনো প্রতিষ্ঠানের শুধু সহায়ক ব্যবস্থা নয়; অনেক ব্যবসার মূল প্রতিযোগিতামূলক শক্তির অংশ হয়ে উঠেছে।

আউটসোর্সিং থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে

এআই ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে পরিবর্তনটি ত্বরান্বিত করছে, তার একটি হলো আউটসোর্সিং থেকে ইনসোর্সিংয়ে যাওয়া।

ব্যবসার কিছু কাজ তুলনামূলকভাবে সহজে বাইরের প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া যায়। যেমন হিসাব পরিশোধ, সাধারণ প্রযুক্তিগত সহায়তা কিংবা নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ। কিন্তু ব্যবসার মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত কাজ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।

এআই যত বেশি ব্যবসার মূল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তত বেশি প্রযুক্তি-সম্পর্কিত কাজ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নিয়ে আসার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে ভারতের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে স্টারবাকস নিজেদের বিক্রয়কেন্দ্রের সফটওয়্যার তৈরি করছে। এ কাজের একটি অংশ ভারতে তাদের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্রে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

India's IT sector is surviving artificial intelligence

সবচেয়ে বড় চাপ তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর

তবে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো নতুন স্নাতকদের কর্মসংস্থান।

আগে কম অভিজ্ঞ কর্মীদের দিয়ে যে পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়মিত কাজ করানো হতো, এআই সেই কাজের বড় অংশ করে ফেলতে পারছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু সাধারণ প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী নয়, বরং এআইয়ের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এমন প্রকৌশলী ও দক্ষ কর্মী খুঁজছে।

গত এক বছরে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের সামগ্রিক চাহিদা ৩ শতাংশ কমলেও এআই ও যন্ত্রশিক্ষায় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ চাকরির বাজার পুরোপুরি সংকুচিত হচ্ছে না; বরং বাজারের চাহিদার ধরন বদলে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে

ভারতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক দশকের বেশি সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১০-এর দশকের শুরুতে যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী ছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ হয়েছে।

কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারবিজ্ঞানের নতুন স্নাতকদের প্রাথমিক বেতন প্রায় দুই দশক ধরে বছরে ৩ লাখ ১০ হাজার রুপির আশপাশে আটকে আছে। ফলে শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়লেও ভালো চাকরির সুযোগ একই হারে বাড়ছে না।

এই বাস্তবতা তরুণদেরও দক্ষতা পরিবর্তনে বাধ্য করছে। নিয়োগ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষায়িত এআই প্রশিক্ষণ নেওয়া ভারতের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকেরা সাধারণ কম্পিউটারবিজ্ঞান নিয়ে পড়া সহপাঠীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

এআই এখনো চাকরি খায়নি, কিন্তু চাকরির ধরন বদলে দিচ্ছে

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সামনে তাই চিত্রটি সরল নয়। এআই এখনো সফটওয়্যার পরিষেবা খাতকে ধ্বংস করে দেয়নি। বরং এটি একই সঙ্গে কিছু পুরোনো কাজের চাহিদা কমাচ্ছে এবং নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়াচ্ছে।

ভারতের বড় সুযোগ হলো দেশটির বিশাল প্রযুক্তিশিক্ষিত কর্মীসমাজ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্রের দ্রুত সম্প্রসারণ। কিন্তু ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষ করে যেসব তরুণ শুধু নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, তাদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে।

অর্থাৎ এআই এখনো ভারতের সফটওয়্যার পরিষেবা শিল্পকে গ্রাস করেনি। কিন্তু শিল্পটির দিকে তার নজর গভীর হচ্ছে। আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে ভারত কত দ্রুত তার কর্মীদের এআই-নির্ভর নতুন অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করতে পারে তার ওপর।

এআই, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও কর্মসংস্থান—এই তিনটির সম্পর্ক আগামী বছরগুলোতে দেশটির অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের চাকরি এখনো ব্যাপকভাবে কমায়নি, তবে তরুণদের জন্য দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চাকরি কেড়ে নিচ্ছে?

এখনো বড় ধরনের চাকরি ধস দেখা না গেলেও বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন। কম দক্ষ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের চাহিদা কমছে, বিপরীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষায় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে ভারতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্রের বিস্তার নতুন কর্মসংস্থানের দরজাও খুলছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধাক্কা সামলে টিকে আছে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত

০৬:৪১:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে যতটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখনো তার পুরো অভিঘাত দেখা যায়নি। বরং এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের মধ্যেও ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প নতুন ধরনের কাজ, দক্ষতা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে নিজেদের অবস্থান বদলে নিচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আসবে না। বরং এআই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে তরুণ ও প্রবেশপর্যায়ের চাকরিপ্রার্থীদের ওপর।

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখনো বড় ধস নেই

এআইয়ের উত্থানের আগে ভারতের প্রযুক্তি খাত নিয়ে একটি প্রচলিত রসিকতা ছিল—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অর্থ আসলে ‘ভারতীয়রা’। কারণ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও ব্যবসার যে বিপুল কাজ ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের কাছে আউটসোর্স করা হতো, তার বড় অংশই ছিল সফটওয়্যার তৈরি, বেতন ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অন্যান্য নিয়মিত কাজ।

কিন্তু চ্যাটবট ও আধুনিক এআইয়ের অগ্রগতির পর এসব কাজের অনেকটাই মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রের মাধ্যমে করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে ধারণা ছিল, এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে থাকবে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত।

বাস্তব চিত্র অবশ্য এখনো তেমন নয়। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সংগঠন ন্যাসকমের হিসাবে দেশটিতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করেন। সংখ্যাটি বিশাল হলেও ভারতের মোট কর্মশক্তির মাত্র প্রায় ১ শতাংশ। ফলে পুরো দেশের কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে এ খাতের পরিবর্তন সহজে ধরা পড়ে না।

বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মী কমলেও কারণ শুধু এআই নয়

ভারতের বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীসংখ্যায় সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পতন দেখা গেছে। টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস, ইনফোসিসসহ শীর্ষ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীসংখ্যা কমেছে।

২০২৩ সালে নিফটি তথ্যপ্রযুক্তি সূচকের অন্তর্ভুক্ত বড় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ লাখ ১০ হাজার। চলতি বছরের জুন শেষে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজারে।

তবে এই পতনকে সরাসরি এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মহামারির সময় তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক নিয়োগ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অতিরিক্ত নিয়োগের কিছুটা সমন্বয় করছে। ফলে কর্মীসংখ্যা কমলেও তা এখনো মহামারির আগের প্রবণতার তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।

ক্যাপজেমিনি, কগনিজ্যান্ট ও অ্যাকসেঞ্চারের মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারতীয় কার্যক্রমেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।

নতুন কর্মসংস্থানের বড় কেন্দ্র বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মসংস্থানের গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি, মানবসম্পদ, অর্থ ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ভারতে পরিচালনা করছে।

২০১৯ সালে ভারতে এসব কেন্দ্রে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লাখ। চলতি বছর তা বেড়ে প্রায় ২৪ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রচলিত আউটসোর্সিংয়ের বাইরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ভারতে পরিচালনার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।

এআইয়ের যুগে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। কারণ প্রযুক্তি এখন আর কোনো প্রতিষ্ঠানের শুধু সহায়ক ব্যবস্থা নয়; অনেক ব্যবসার মূল প্রতিযোগিতামূলক শক্তির অংশ হয়ে উঠেছে।

আউটসোর্সিং থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে

এআই ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে পরিবর্তনটি ত্বরান্বিত করছে, তার একটি হলো আউটসোর্সিং থেকে ইনসোর্সিংয়ে যাওয়া।

ব্যবসার কিছু কাজ তুলনামূলকভাবে সহজে বাইরের প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া যায়। যেমন হিসাব পরিশোধ, সাধারণ প্রযুক্তিগত সহায়তা কিংবা নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ। কিন্তু ব্যবসার মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত কাজ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।

এআই যত বেশি ব্যবসার মূল কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তত বেশি প্রযুক্তি-সম্পর্কিত কাজ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নিয়ে আসার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে ভারতের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে স্টারবাকস নিজেদের বিক্রয়কেন্দ্রের সফটওয়্যার তৈরি করছে। এ কাজের একটি অংশ ভারতে তাদের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্রে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

India's IT sector is surviving artificial intelligence

সবচেয়ে বড় চাপ তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর

তবে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো নতুন স্নাতকদের কর্মসংস্থান।

আগে কম অভিজ্ঞ কর্মীদের দিয়ে যে পুনরাবৃত্তিমূলক ও নিয়মিত কাজ করানো হতো, এআই সেই কাজের বড় অংশ করে ফেলতে পারছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু সাধারণ প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী নয়, বরং এআইয়ের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এমন প্রকৌশলী ও দক্ষ কর্মী খুঁজছে।

গত এক বছরে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের সামগ্রিক চাহিদা ৩ শতাংশ কমলেও এআই ও যন্ত্রশিক্ষায় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ চাকরির বাজার পুরোপুরি সংকুচিত হচ্ছে না; বরং বাজারের চাহিদার ধরন বদলে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে

ভারতে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক দশকের বেশি সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১০-এর দশকের শুরুতে যেখানে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ শিক্ষার্থী ছিল, ২০২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ হয়েছে।

কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারবিজ্ঞানের নতুন স্নাতকদের প্রাথমিক বেতন প্রায় দুই দশক ধরে বছরে ৩ লাখ ১০ হাজার রুপির আশপাশে আটকে আছে। ফলে শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়লেও ভালো চাকরির সুযোগ একই হারে বাড়ছে না।

এই বাস্তবতা তরুণদেরও দক্ষতা পরিবর্তনে বাধ্য করছে। নিয়োগ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষায়িত এআই প্রশিক্ষণ নেওয়া ভারতের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকেরা সাধারণ কম্পিউটারবিজ্ঞান নিয়ে পড়া সহপাঠীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

এআই এখনো চাকরি খায়নি, কিন্তু চাকরির ধরন বদলে দিচ্ছে

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সামনে তাই চিত্রটি সরল নয়। এআই এখনো সফটওয়্যার পরিষেবা খাতকে ধ্বংস করে দেয়নি। বরং এটি একই সঙ্গে কিছু পুরোনো কাজের চাহিদা কমাচ্ছে এবং নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়াচ্ছে।

ভারতের বড় সুযোগ হলো দেশটির বিশাল প্রযুক্তিশিক্ষিত কর্মীসমাজ এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্রের দ্রুত সম্প্রসারণ। কিন্তু ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষ করে যেসব তরুণ শুধু নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, তাদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হতে পারে।

অর্থাৎ এআই এখনো ভারতের সফটওয়্যার পরিষেবা শিল্পকে গ্রাস করেনি। কিন্তু শিল্পটির দিকে তার নজর গভীর হচ্ছে। আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে ভারত কত দ্রুত তার কর্মীদের এআই-নির্ভর নতুন অর্থনীতির জন্য প্রস্তুত করতে পারে তার ওপর।

এআই, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও কর্মসংস্থান—এই তিনটির সম্পর্ক আগামী বছরগুলোতে দেশটির অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের চাকরি এখনো ব্যাপকভাবে কমায়নি, তবে তরুণদের জন্য দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাত

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চাকরি কেড়ে নিচ্ছে?

এখনো বড় ধরনের চাকরি ধস দেখা না গেলেও বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন। কম দক্ষ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের চাহিদা কমছে, বিপরীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষায় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে ভারতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্রের বিস্তার নতুন কর্মসংস্থানের দরজাও খুলছে।