বিশ্বের সমুদ্রপথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-প্রাধান্য ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু সেই অবস্থান এখন ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ চীন শুধু যুদ্ধজাহাজের বহরই দ্রুত বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে গড়ে তুলেছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প। আর এই বেসামরিক শিল্পই চীনের সামরিক নৌবহরকে দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য বড় ধরনের সুবিধা দিচ্ছে।
চীনের নৌবাহিনীর উত্থান
চীন গত কয়েক দশকে একটি সীমিত উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালের মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চীনের যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন নৌযানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫০টি। এর মধ্যে যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহী রণতরী, মাইন অপসারণকারী জাহাজ ও সহায়ক নৌযানও রয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বহরে ছিল প্রায় ২৯৩টি যুদ্ধক্ষমতাসম্পন্ন নৌযান।
চীনের নৌবহর আরও দ্রুত বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাস্তবসম্মত বলে মনে করা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি নৌবহরের সংখ্যা ৪৩৫-এ উন্নীত করতে পারে। বিপরীতে ২০৩১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বহরে আরও ৫৮টি জাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা এবং নতুন পারমাণবিকচালিত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
বাণিজ্যিক জাহাজই চীনের বড় শক্তি
চীনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিশাল বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প। গত ২৫ বছরে বিশ্বজুড়ে জাহাজ নির্মাণের মোট সক্ষমতায় চীনের অংশ প্রায় ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প বৈশ্বিক বাজারে প্রায় অদৃশ্য অবস্থায় রয়েছে।
এই ব্যবধান শুধু বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। কারণ বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ নির্মাণের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। বড় জাহাজ নির্মাণে প্রয়োজনীয় ইস্পাত কাঠামো, পাইপলাইন, ইঞ্জিন, প্রপেলার, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং দক্ষ শ্রমিক—এসবের বড় অংশ যুদ্ধজাহাজ তৈরিতেও কাজে লাগে।
ফলে বেসামরিক জাহাজের অর্ডার কমে গেলে চীনের জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো সামরিক প্রকল্পে কাজে লাগানো সম্ভব। এতে কারখানাগুলো সচল থাকে, দক্ষ শ্রমিকদের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং সামরিক জাহাজ নির্মাণের খরচ ও সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
ইউরোপের অভিজ্ঞতা কী বলছে
ইউরোপও বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ নির্মাণের পারস্পরিক সম্পর্কের সুফল পাচ্ছে। ইউরোপে বিশেষায়িত জাহাজ—যেমন প্রমোদতরী, বরফভাঙা জাহাজ এবং সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি শিল্পের সহায়ক জাহাজ—নির্মাণের শক্তিশালী শিল্প এখনও টিকে আছে।
এই বেসামরিক জাহাজ নির্মাণশিল্প সামরিক জাহাজ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও ধরে রাখে। বাণিজ্যিক জাহাজে ঢালাই, পাইপ বসানো, তার সংযোগ এবং জটিল প্রকৌশলকাজের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে কাজে লাগে।
ইউরোপের অন্যতম বড় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফিনকান্তিয়েরির অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। বিশাল প্রমোদতরী নির্মাণে বিদ্যুৎকেন্দ্র, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং হাজার হাজার মানুষের জন্য নানা ধরনের জটিল অবকাঠামো তৈরি করতে হয়। ফলে বেসামরিক জাহাজ নির্মাণকে শক্তিশালী না করে সামরিক নৌশিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিই হয়ে উঠেছে বাধা
যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা আরও গভীর। দেশটির বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্পকে শক্তিশালী করার জন্য প্রায় এক শতাব্দী আগে যে আইন করা হয়েছিল, সেটিই এখন অনেক ক্ষেত্রে উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯২০ সালের জোন্স আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বন্দরগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহনে মার্কিন নির্মিত জাহাজ এবং মার্কিন কর্মী ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর ফলে প্রতিযোগিতা কমেছে এবং জাহাজ নির্মাণের ব্যয় বেড়েছে।
মার্কিন জাহাজ অনেক সময় একই ধরনের বিদেশি জাহাজের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য তিন শতাংশ—যা দেশটির সামুদ্রিক শক্তির দুর্বলতার একটি স্পষ্ট চিত্র।
এর প্রভাব পড়ছে মার্কিন নৌবাহিনীতেও। সামরিক জাহাজ নির্মাণের জন্য নির্ধারিত সময় ও বাজেট বজায় রাখতে দেশটির জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সমস্যায় পড়ছে।

বিমানবাহী রণতরী নির্মাণেও বিলম্ব
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একটি হান্টিংটন ইঙ্গলস ইন্ডাস্ট্রিজের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নির্মাণাধীন দুটি বিমানবাহী রণতরী ২০২৮ সালের মার্চের মধ্যে সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু এখন সেগুলো দুই বছরেরও বেশি সময় পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু বিমানবাহী রণতরী নয়, ফ্রিগেট, সাবমেরিন এবং অন্যান্য নৌযান নির্মাণের প্রায় পাঁচটির মধ্যে চারটি কর্মসূচিই নির্ধারিত সময়ের পেছনে রয়েছে।
সমাধানের চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা সমস্যাটি সম্পর্কে সচেতন। ২০২৫ সালে প্রস্তাব করা হয় ‘শিপস ফর আমেরিকা’ আইন। এর লক্ষ্য ছিল এক দশকে বেসামরিক নৌবহরে আরও ২৫০টি জাহাজ যুক্ত করা এবং ভর্তুকিসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তার মাধ্যমে জাহাজ নির্মাণশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা।
এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার একটি সামুদ্রিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। এতে জাহাজ নির্মাণশিল্পে বিনিয়োগের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে জাহাজ নির্মাণে দক্ষতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি বড় জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জাহাজ নির্মাণ অবকাঠামো গড়ে তোলা ও পুরোনো স্থাপনা উন্নয়নের জন্য ১৫টি সহযোগিতা প্রকল্প ঘোষণা করেছে।
এমনকি কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্রদেশের জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য জাহাজ তৈরির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন।
তবে দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কম
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছেন, এই সংকটের দ্রুত কোনো সমাধান নেই। কয়েক দশক ধরে দুর্বল হয়ে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্পকে পুনরায় বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে বিপুল বিনিয়োগ, দক্ষ শ্রমিক, অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প আবার কখনো চীনের মতো শক্তিশালী হয়ে নিজের নৌবাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবে কি না।
চীনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প ও সামরিক নৌবহর যেন একই ব্যবস্থার দুটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই যোগসূত্র বহুদিন ধরেই দুর্বল। ফলে সমুদ্রের ওপর আধিপত্য শুধু যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না; বরং কে কত দ্রুত, কত কম খরচে এবং কত বড় পরিসরে জাহাজ বানাতে পারে—সেটিও হয়ে উঠছে কৌশলগত শক্তির অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।
এই বাস্তবতায় চীনের নৌবাহিনীর উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়; এটি শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তারও বড় পরীক্ষা।
চীনের নৌশক্তি বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি: বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প
চীনের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণশিল্প, নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী, জাহাজ নির্মাণশিল্প, চীনের নৌশক্তি, সামুদ্রিক শক্তি, মার্কিন প্রতিরক্ষা, দক্ষিণ কোরিয়া, জাহাজ নির্মাণ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















