০৮:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী কিছুই ঘটবে না—এই বাজি কি ফেডের জন্য বিপজ্জনক? ৪৩ বছর বয়সেও ‘চিরকিশোর’ রাজনীতিক! জ্যাক পোলানস্কিকে ঘিরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক হরমুজ ও লোহিত সাগরের ঝুঁকি বাড়তেই বিশ্বজুড়ে তেল পাইপলাইনে বিনিয়োগের হিড়িক চাঁদের মাটিতে রকেট, পৃথিবীতে ধাক্কা—মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের নতুন শঙ্কা জাপানকে ঘিরে চীনের আগ্রাসী চাপ, আসল লক্ষ্য কি যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় আধিপত্য? দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্পে টিএসএমসির কৌশল, যেভাবে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে বিশ্বজয় গাজা নিয়ে ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ইসরায়েলের, হামাস নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার নয় দ্বৈত কৌশলগত সিদ্ধান্ত: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সংঘাত নয়, শান্তির পথ বেছে নেওয়ার সময় গ্র্যামির ‘এশিয়ান পপ’ খাঁচায় বিটিএসকে বন্দি করা কি সত্যিই স্বীকৃতি?

ডলারের রাজত্বে ফাটল, নিজেদের মুদ্রার দিকে ঝুঁকছে আফ্রিকা

আফ্রিকার অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলারের যে শক্ত আধিপত্য ছিল, তা ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। মহাদেশটির কয়েকটি দেশ এখন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনা মুদ্রা ইউয়ান এবং নিজেদের স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বৈদেশিক ঋণের চাপ, মুদ্রার ওঠানামা, আমদানি-রপ্তানির ব্যয় এবং চীনের সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক সম্পর্ক এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাম্বিয়ায় বদলের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ

আফ্রিকার এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ জাম্বিয়া। দেশটির রাজধানী লুসাকার ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় একসময় পণ্য কেনাবেচা থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়িক চুক্তি—অনেক লেনদেনই মার্কিন ডলারে হতো। গাড়ি কেনা, ব্যবসায়িক চুক্তি কিংবা বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ—সব ক্ষেত্রেই ডলারের ব্যবহার ছিল ব্যাপক।

দীর্ঘদিন ধরে জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে ডলারের এমন প্রভাব ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার পরিবর্তনের প্রভাবও দেশটির পণ্য ও বাড়িভাড়ার দামে গিয়ে পড়ত। ২০২০ সালে জাম্বিয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর শক্তিশালী ডলার দেশটির অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।

এখন সেই নির্ভরতা কমাতে চাইছে জাম্বিয়া।

গত বছরের অক্টোবর থেকে দেশটি খনিজ সম্পদের রয়্যালটি ও কর চীনা মুদ্রা ইউয়ানে গ্রহণ শুরু করেছে। এর ফলে জাম্বিয়ার সবচেয়ে বড় তামা ক্রেতা এবং অন্যতম প্রধান ঋণদাতা চীনের সঙ্গে অর্থের প্রবাহ আরও সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে ডলারের ওপর জাম্বিয়ার নির্ভরতাও কিছুটা কমছে।

গত ডিসেম্বর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেনে স্থানীয় মুদ্রা কোয়াচা ব্যবহারের ওপরও কঠোরভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। নিয়ম ভাঙলে জরিমানা, এমনকি দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ডলারের বিকল্প খুঁজছে আরও আফ্রিকান দেশ

জাম্বিয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। আফ্রিকার বৈদেশিক সরকারি ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো ডলারে নির্ধারিত। সীমান্ত পেরিয়ে বাণিজ্যিক লেনদেনের বড় অংশও ডলারে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিত্র বদলানোর চেষ্টা চলছে।

এই পরিবর্তনের অন্যতম সুবিধাভোগী হচ্ছে চীনা ইউয়ান। আফ্রিকার বড় অর্থনীতির দেশ মিসর, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা চীনের সঙ্গে নতুন মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা করেছে। দুই পক্ষের বাণিজ্যে ইউয়ানে লেনদেনের অংশও বাড়ছে।

কেনিয়া ইতোমধ্যে ডলারে নেওয়া কিছু ঋণ ইউয়ানে রূপান্তর করেছে। এর ফলে দেশটির বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার সুদ ব্যয় কমতে পারে। চীনের কাছে কেনিয়ার মোট বকেয়া ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ইউয়ানে নির্ধারিত।

ইথিওপিয়া ও মোজাম্বিকও একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা করছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাড়ছে ইউয়ানের ব্যবহার

ইউয়ানের ব্যবহার শুধু সরকারি ঋণ ও বাণিজ্যিক চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। আফ্রিকার বিভিন্ন ব্যাংকও চীনা মুদ্রায় সরাসরি লেনদেনের অবকাঠামো তৈরি করছে।

আফ্রিকার সম্পদের দিক থেকে অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গত বছরের সেপ্টেম্বরে চীনের আন্তঃব্যাংক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার বড় ব্যাংক আবসা এবং আফ্রিকার ৩০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম থাকা ইকোব্যাংকও ইউয়ানে সরাসরি অর্থ পরিশোধের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে এখনো আফ্রিকার আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে ডলারের তুলনায় ইউয়ানের ব্যবহার অনেক কম। তারপরও ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউয়ানে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ পরিবর্তনটি এখনো ছোট হলেও এর গতি স্পষ্ট।

Dollar scarcity is pushing more african countries to crisis | The Business  Standard

ডলারের বদলে শুধু ইউয়ানও নয়

আফ্রিকার দেশগুলো শুধু একটি বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরেকটি বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। তাদের লক্ষ্য আরও বড়—নিজেদের স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং আফ্রিকার ভেতরের বাণিজ্যে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন কমানো।

২০২২ সালে আফ্রিকান রপ্তানি-আমদানি ব্যাংক ও আফ্রিকান ইউনিয়ন আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য নিজস্ব অর্থ পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ব্যাংক স্থানীয় মুদ্রায় একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন করতে পারে। ইতোমধ্যে ১৬০টির বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ২২টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতে যুক্ত হয়েছে।

ব্যবস্থাটি আরও বিস্তৃত হলে আফ্রিকার ব্যবসাগুলো প্রতিবছর ব্যাংকিং ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের খরচে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে।

ডলার ছাড়ার পথও সহজ নয়

তবে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর এই প্রক্রিয়ায় আফ্রিকার ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।

জাম্বিয়ায় ডলারে করা পুরোনো চুক্তিগুলো নতুন করে লিখতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন বা পুনরায় আলোচনা করতে হচ্ছে। পুরোনো ডলারভিত্তিক চুক্তির কারণে অনেক ব্যবসা লোকসানের মুখেও পড়েছে।

যেসব রপ্তানিকারক ডলারে আয় করেন, তাদের এখন বারবার এক মুদ্রা থেকে অন্য মুদ্রায় অর্থ পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

নির্মাণ ও কৃষির মতো অনেক খাত আবার জ্বালানি, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানকে আমদানির জন্য বারবার মুদ্রা পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

শক্তিশালী হচ্ছে জাম্বিয়ার কোয়াচা

তবে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাম্বিয়ার পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।

২০২৫ সালে ভালো অবস্থানের পর চলতি বছরে কোয়াচা ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৫ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। একই সময়ে জাম্বিয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরকারি বন্ড কেনার সুযোগও বাড়িয়েছে।

আগে সরকারের বার্ষিক বন্ড বিক্রির সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিনতে পারতেন। সেই সীমা বাড়িয়ে এখন ২৩ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে কোয়াচায় বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাও কিছুটা সহজ হচ্ছে।

ডলারের আধিপত্য কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?

আফ্রিকায় ডলারের আধিপত্য এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ এবং আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে ডলার এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রাগুলোর একটি।

তবে পরিবর্তনের দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকার দেশগুলো আগের মতো একটি বিদেশি মুদ্রার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে থাকতে চাইছে না। কেউ ইউয়ানের দিকে এগোচ্ছে, কেউ স্থানীয় মুদ্রাকে শক্তিশালী করছে, আবার কেউ আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নিজেদের মুদ্রায় লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।

এর অর্থ, ডলারের আধিপত্য হয়তো রাতারাতি শেষ হবে না। কিন্তু আফ্রিকার অর্থনীতিতে একক মুদ্রার ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী মুদ্রাব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে আরও বেশি স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ডলারের পাশাপাশি ইউয়ান এবং স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আফ্রিকার দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়তে পারে।

আফ্রিকার স্থানীয় মুদ্রাগুলো তাই এখন শুধু ডলারের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এগুলো মহাদেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবেও সামনে আসছে।

মহাদেশটিতে ডলারের আধিপত্য কমানোর এই প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু জাম্বিয়া, কেনিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া ও মোজাম্বিকের পদক্ষেপ দেখাচ্ছে—আফ্রিকার অর্থনৈতিক মানচিত্রে ধীরে ধীরে নতুন মুদ্রার ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

পারি মনির ধর্ষণচেষ্টা মামলা: ৩০ নভেম্বর ফের জেরার মুখোমুখি অভিনেত্রী

ডলারের রাজত্বে ফাটল, নিজেদের মুদ্রার দিকে ঝুঁকছে আফ্রিকা

০৭:০০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

আফ্রিকার অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলারের যে শক্ত আধিপত্য ছিল, তা ধীরে ধীরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। মহাদেশটির কয়েকটি দেশ এখন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনা মুদ্রা ইউয়ান এবং নিজেদের স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বৈদেশিক ঋণের চাপ, মুদ্রার ওঠানামা, আমদানি-রপ্তানির ব্যয় এবং চীনের সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক সম্পর্ক এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জাম্বিয়ায় বদলের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ

আফ্রিকার এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ জাম্বিয়া। দেশটির রাজধানী লুসাকার ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় একসময় পণ্য কেনাবেচা থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়িক চুক্তি—অনেক লেনদেনই মার্কিন ডলারে হতো। গাড়ি কেনা, ব্যবসায়িক চুক্তি কিংবা বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ—সব ক্ষেত্রেই ডলারের ব্যবহার ছিল ব্যাপক।

দীর্ঘদিন ধরে জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে ডলারের এমন প্রভাব ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার পরিবর্তনের প্রভাবও দেশটির পণ্য ও বাড়িভাড়ার দামে গিয়ে পড়ত। ২০২০ সালে জাম্বিয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর শক্তিশালী ডলার দেশটির অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।

এখন সেই নির্ভরতা কমাতে চাইছে জাম্বিয়া।

গত বছরের অক্টোবর থেকে দেশটি খনিজ সম্পদের রয়্যালটি ও কর চীনা মুদ্রা ইউয়ানে গ্রহণ শুরু করেছে। এর ফলে জাম্বিয়ার সবচেয়ে বড় তামা ক্রেতা এবং অন্যতম প্রধান ঋণদাতা চীনের সঙ্গে অর্থের প্রবাহ আরও সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে ডলারের ওপর জাম্বিয়ার নির্ভরতাও কিছুটা কমছে।

গত ডিসেম্বর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ লেনদেনে স্থানীয় মুদ্রা কোয়াচা ব্যবহারের ওপরও কঠোরভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। নিয়ম ভাঙলে জরিমানা, এমনকি দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ডলারের বিকল্প খুঁজছে আরও আফ্রিকান দেশ

জাম্বিয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। আফ্রিকার বৈদেশিক সরকারি ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো ডলারে নির্ধারিত। সীমান্ত পেরিয়ে বাণিজ্যিক লেনদেনের বড় অংশও ডলারে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই চিত্র বদলানোর চেষ্টা চলছে।

এই পরিবর্তনের অন্যতম সুবিধাভোগী হচ্ছে চীনা ইউয়ান। আফ্রিকার বড় অর্থনীতির দেশ মিসর, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা চীনের সঙ্গে নতুন মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা করেছে। দুই পক্ষের বাণিজ্যে ইউয়ানে লেনদেনের অংশও বাড়ছে।

কেনিয়া ইতোমধ্যে ডলারে নেওয়া কিছু ঋণ ইউয়ানে রূপান্তর করেছে। এর ফলে দেশটির বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ২১ কোটি ৫০ লাখ ডলার সুদ ব্যয় কমতে পারে। চীনের কাছে কেনিয়ার মোট বকেয়া ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ইউয়ানে নির্ধারিত।

ইথিওপিয়া ও মোজাম্বিকও একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা করছে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বাড়ছে ইউয়ানের ব্যবহার

ইউয়ানের ব্যবহার শুধু সরকারি ঋণ ও বাণিজ্যিক চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। আফ্রিকার বিভিন্ন ব্যাংকও চীনা মুদ্রায় সরাসরি লেনদেনের অবকাঠামো তৈরি করছে।

আফ্রিকার সম্পদের দিক থেকে অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক গত বছরের সেপ্টেম্বরে চীনের আন্তঃব্যাংক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার বড় ব্যাংক আবসা এবং আফ্রিকার ৩০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম থাকা ইকোব্যাংকও ইউয়ানে সরাসরি অর্থ পরিশোধের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে এখনো আফ্রিকার আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে ডলারের তুলনায় ইউয়ানের ব্যবহার অনেক কম। তারপরও ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউয়ানে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ পরিবর্তনটি এখনো ছোট হলেও এর গতি স্পষ্ট।

Dollar scarcity is pushing more african countries to crisis | The Business  Standard

ডলারের বদলে শুধু ইউয়ানও নয়

আফ্রিকার দেশগুলো শুধু একটি বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরেকটি বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। তাদের লক্ষ্য আরও বড়—নিজেদের স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং আফ্রিকার ভেতরের বাণিজ্যে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন কমানো।

২০২২ সালে আফ্রিকান রপ্তানি-আমদানি ব্যাংক ও আফ্রিকান ইউনিয়ন আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য নিজস্ব অর্থ পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের ব্যাংক স্থানীয় মুদ্রায় একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন করতে পারে। ইতোমধ্যে ১৬০টির বেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ২২টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতে যুক্ত হয়েছে।

ব্যবস্থাটি আরও বিস্তৃত হলে আফ্রিকার ব্যবসাগুলো প্রতিবছর ব্যাংকিং ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের খরচে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে।

ডলার ছাড়ার পথও সহজ নয়

তবে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর এই প্রক্রিয়ায় আফ্রিকার ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।

জাম্বিয়ায় ডলারে করা পুরোনো চুক্তিগুলো নতুন করে লিখতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত পরিবর্তন বা পুনরায় আলোচনা করতে হচ্ছে। পুরোনো ডলারভিত্তিক চুক্তির কারণে অনেক ব্যবসা লোকসানের মুখেও পড়েছে।

যেসব রপ্তানিকারক ডলারে আয় করেন, তাদের এখন বারবার এক মুদ্রা থেকে অন্য মুদ্রায় অর্থ পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচ তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

নির্মাণ ও কৃষির মতো অনেক খাত আবার জ্বালানি, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে গেলে এসব প্রতিষ্ঠানকে আমদানির জন্য বারবার মুদ্রা পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

শক্তিশালী হচ্ছে জাম্বিয়ার কোয়াচা

তবে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাম্বিয়ার পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।

২০২৫ সালে ভালো অবস্থানের পর চলতি বছরে কোয়াচা ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৫ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। একই সময়ে জাম্বিয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরকারি বন্ড কেনার সুযোগও বাড়িয়েছে।

আগে সরকারের বার্ষিক বন্ড বিক্রির সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিনতে পারতেন। সেই সীমা বাড়িয়ে এখন ২৩ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে কোয়াচায় বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনাও কিছুটা সহজ হচ্ছে।

ডলারের আধিপত্য কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?

আফ্রিকায় ডলারের আধিপত্য এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ এবং আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে ডলার এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রাগুলোর একটি।

তবে পরিবর্তনের দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকার দেশগুলো আগের মতো একটি বিদেশি মুদ্রার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে থাকতে চাইছে না। কেউ ইউয়ানের দিকে এগোচ্ছে, কেউ স্থানীয় মুদ্রাকে শক্তিশালী করছে, আবার কেউ আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে নিজেদের মুদ্রায় লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।

এর অর্থ, ডলারের আধিপত্য হয়তো রাতারাতি শেষ হবে না। কিন্তু আফ্রিকার অর্থনীতিতে একক মুদ্রার ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী মুদ্রাব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে আরও বেশি স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ডলারের পাশাপাশি ইউয়ান এবং স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ার ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আফ্রিকার দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়তে পারে।

আফ্রিকার স্থানীয় মুদ্রাগুলো তাই এখন শুধু ডলারের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এগুলো মহাদেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবেও সামনে আসছে।

মহাদেশটিতে ডলারের আধিপত্য কমানোর এই প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু জাম্বিয়া, কেনিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া ও মোজাম্বিকের পদক্ষেপ দেখাচ্ছে—আফ্রিকার অর্থনৈতিক মানচিত্রে ধীরে ধীরে নতুন মুদ্রার ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।