ট্রাম্পের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ইরানের কাছ থেকে একটি চুক্তি আদায় করা নয়; বরং এমন একটি সমঝোতা তৈরি করা, যা ইরানের ক্ষমতাসীন কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণ করবে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ইরানের কোনো প্রেসিডেন্ট বা মধ্যপন্থী নেতা আলোচনায় আগ্রহ দেখালেই দেশটির পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক দিক বদলে যায় না।
ইরানে প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা, সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। ফলে ওয়াশিংটন যদি শুধু নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বৃহত্তর পরিবর্তনের আশা করে, তাহলে আবারও হতাশ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যুদ্ধ কি ইরানকে আরও কঠোর করেছে
সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বকে দুর্বল করার পরিবর্তে আরও শক্তিশালী করেছে—এমন মূল্যায়নও সামনে এসেছে। সংঘাতের সময় জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি হুমকির প্রশ্ন সামনে চলে আসায় ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী অবস্থানের জন্য নতুন যুক্তি তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের সামরিক চাপের লক্ষ্য ছিল ইরানের নেতৃত্বকে নত করা এবং জনগণের মধ্যে সরকারবিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে তেমন গণঅভ্যুত্থান দেখা যায়নি। বরং বিদেশি হামলার মুখে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চারপাশে সমর্থন আরও কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এতে একটি পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে—সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলানো সম্ভব, নাকি তা উল্টো দেশটির কঠোরপন্থীদের অবস্থান আরও শক্ত করবে?
হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় হরমুজ প্রণালি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে।
এ কারণেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়। হরমুজে অস্থিরতা তৈরি হলে এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এই বাস্তবতা ইরানের জন্যও একটি শক্তিশালী দর-কষাকষির হাতিয়ার তৈরি করে। তেহরান জানে, সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি দেশ দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দেবে।
ওয়াশিংটনের তাড়াহুড়োই তেহরানের সুযোগ
ইরানবিষয়ক অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত সমাধানের আকাঙ্ক্ষা ইরানকে বাড়তি সুবিধা দেয়।

ওয়াশিংটন সাধারণত রাজনৈতিক ফলাফল দ্রুত দেখাতে চায়। প্রেসিডেন্টের জন্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল। অর্থনীতিতে তেলের দামের চাপ তৈরি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়তে পারে।
তেহরান এই চাপের বিষয়টি বোঝে। ফলে ইরানের কৌশল হতে পারে সময় নেওয়া, সীমিত বিষয়ে আলোচনা করা এবং এমন কোনো প্রতিশ্রুতি না দেওয়া যা দেশটির মূল রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই জায়গাতেই ট্রাম্পের ‘দ্রুত চুক্তি’ করার আকাঙ্ক্ষা ইরানের সঙ্গে আলোচনায় দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে।
অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের সম্পর্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি প্রশাসন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। কেউ গোপন আলোচনা করেছে, কেউ সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে, কেউ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, আবার কেউ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে।
কিন্তু একটি স্থায়ী সমাধান কেউই তৈরি করতে পারেনি।
এর কারণ শুধু দুই দেশের পারস্পরিক অবিশ্বাস নয়। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রভাব, সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আদর্শ—সবকিছু মিলিয়ে তেহরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল।
এই বাস্তবতা না বুঝে শুধু একজন নেতাকে কেন্দ্র করে ইরানের নীতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ
ট্রাম্পের সামনে এখন মোটামুটি তিন ধরনের পথ রয়েছে। প্রথমত, সামরিক চাপ আরও বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, সীমিত বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করা। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ও ধীরগতির কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যাওয়া।
প্রথম পথ দ্রুত ফল দিতে পারে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং সংঘাত বাড়লে হরমুজ, তেলের বাজার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় পথ তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হতে পারে। পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজের নিরাপত্তা বা যুদ্ধবিরতির মতো নির্দিষ্ট বিষয়ে ধাপে ধাপে সমঝোতা হলে বৃহত্তর সংঘাত কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় পথ সবচেয়ে কঠিন হলেও দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। কারণ ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েক দশকের অবিশ্বাস একদিনে দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইরানকে বদলানো নয়, বোঝাই হতে পারে প্রথম কাজ

ট্রাম্পের বর্তমান অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক শিক্ষা সামনে আনছে। ইরানের সঙ্গে কূটনীতিতে প্রথম লক্ষ্য যদি হয় তেহরানকে দ্রুত নিজের শর্তে রাজি করানো, তাহলে ব্যর্থতার সম্ভাবনা বেশি।
বরং ইরানের ক্ষমতার প্রকৃতি, নেতৃত্বের নিরাপত্তাবোধ, যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের ঐতিহাসিক সন্দেহ এবং সময়কে কৌশল হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বোঝা জরুরি।
দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, ইরানের সঙ্গে সফল কূটনীতি শুধু শক্তি প্রদর্শনের বিষয় নয়। এখানে ধৈর্য, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য এবং ধারাবাহিক যোগাযোগের প্রয়োজন।
ট্রাম্পের জন্য তাই সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়তো ইরানকে হারানো নয়—ইরানকে ঠিকভাবে বোঝা। আর সেই জায়গাতেই তিনি তার পূর্বসূরিদের মতোই এক গভীর কূটনৈতিক গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















