চীনের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় নিজেদের বিমানঘাঁটি সচল রাখার কঠিন প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ান। হামলার প্রথম ধাক্কায় রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা অচল হয়ে গেলেও যাতে যুদ্ধবিমান আকাশে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যেই বিশেষ মহড়া চালিয়েছে দেশটির বিমানবাহিনী।
তাইওয়ানের বার্ষিক ‘হান কুয়াং’ সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে শুক্রবার হিনচু বিমানঘাঁটিতে এই প্রস্তুতি নেওয়া হয়। চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার দূরের এই ঘাঁটিটি তাইওয়ানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দেশটির মিরাজ ২০০০-৫ যুদ্ধবিমানের বড় একটি বহর রয়েছে।
প্রথম হামলাতেই ঝুঁকিতে পড়তে পারে বিমানঘাঁটি
তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক চাপ দীর্ঘদিন ধরেই বাড়ছে। সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলার ক্ষেত্রে তাইওয়ানের বিমানঘাঁটিগুলোই চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
হিনচু বিমানঘাঁটিও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়। প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই ঘাঁটিটি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং চীনের খুব কাছাকাছি হওয়ায় প্রথম দফার হামলায় এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক বেঞ্জামিন ব্লানডিনের মতে, চীনের স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম ঢেউতেই হিনচু বিমানঘাঁটি অচল হয়ে যেতে পারে। এমনকি বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঘাঁটিটির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই তাইওয়ান এবার শুধু যুদ্ধবিমান ওড়ানোর অনুশীলন করেনি, বরং হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিমানঘাঁটি কীভাবে দ্রুত আবার সচল করা যায়, তারও মহড়া চালিয়েছে।
রানওয়ে ভেঙে গেলেও যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রস্তুতি
মহড়ায় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যেখানে চীনা ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট হামলায় রানওয়ের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এরপর মাটিতে থাকা সেনারা দ্রুত ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলেন। বড় যন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিষ্কার করা হয় এবং রানওয়ের তৈরি হওয়া গর্ত ভরাট করা হয়। পরে যুদ্ধবিমান ওঠানামার উপযোগী করতে সেখানে ভারী তন্তুযুক্ত বিশেষ চাদর বসানোর অনুশীলন করা হয়।
এর পাশাপাশি বিমানগুলোতে দ্রুত অস্ত্র ও গোলাবারুদ যুক্ত করার মহড়াও চালানো হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে দুইটি মিরাজ যুদ্ধবিমানকে দ্রুত আকাশে পাঠানোর অনুশীলন করা হয়।
অর্থাৎ, হামলার পর বিমানঘাঁটি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও সীমিত সক্ষমতায় যুদ্ধবিমান চালু রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ান।
চীনের খুব কাছেই তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান
হিনচু বিমানঘাঁটিতে তাইওয়ানের ৫৩টি মিরাজ ২০০০-৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। ফ্রান্সের তৈরি এই যুদ্ধবিমানগুলো তাইওয়ানের প্রধান প্রতিরোধক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি।
তাইওয়ানের বিমানবাহিনীর কাছে আরও ১৩০টির বেশি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং দেশটির নিজস্ব তৈরি ১২৯টি এফ-সিকে-১ যুদ্ধবিমান রয়েছে।
তবে হিনচুর বিশেষ গুরুত্ব হলো এর অবস্থান। চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে ঘাঁটিটি খুব বেশি দূরে নয়। ফলে চীনের বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে এখানকার যুদ্ধবিমান ও অবকাঠামো দ্রুত হামলার মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে তাইওয়ানের জন্য শুধু শক্তিশালী যুদ্ধবিমান থাকা যথেষ্ট নয়। হামলার পর সেগুলোকে কোথা থেকে, কীভাবে এবং কত দ্রুত আবার আকাশে পাঠানো যাবে—সেটিও এখন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠাই বড় চ্যালেঞ্জ
তাইওয়ানের এবারের মহড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা যুদ্ধের শুরুতেই বিমানঘাঁটি হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে।
চীন যদি তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে প্রথম পর্যায়ে বিমানঘাঁটি, যোগাযোগব্যবস্থা, সামরিক স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রানওয়ে অচল হয়ে গেলে যুদ্ধবিমান থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তাইওয়ান সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে দ্রুত রানওয়ে মেরামত, বিকল্পভাবে বিমান পরিচালনা এবং জরুরি অবস্থায় যুদ্ধবিমানকে আকাশে পাঠানোর সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
এবার মহড়ায় বদল এসেছে
এবারের ‘হান কুয়াং’ মহড়ার আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো এর ধরন। আগের মতো পুরোপুরি নির্ধারিত ও সাজানো অনুশীলনের বদলে এবার বিভিন্ন ইউনিটকে তুলনামূলকভাবে বাস্তব পরিস্থিতির মতো অনিশ্চিত অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
১০ দিন ৯ রাতের এই মহড়ায় শুধু সরাসরি যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের আগের ধাপে চীনের চাপ সৃষ্টি, ভয় দেখানো এবং সীমিত মাত্রার শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলার বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাইওয়ানের এই প্রস্তুতি মূলত একটি বার্তাই দিচ্ছে—চীনের সম্ভাব্য প্রথম হামলায় কোনো বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেন সঙ্গে সঙ্গে থেমে না যায়।
চীনের সামরিক শক্তি ও তাইওয়ানের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় যুদ্ধ শুরু হলে প্রথম কয়েক ঘণ্টা এবং প্রথম কয়েক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাইওয়ান এখন সেই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখার প্রস্তুতিই জোরদার করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















