পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার দাবি এবং বিতর্কিত পরীক্ষাগুলো বাতিলের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতের ঝাড়খণ্ড। সোমবার রাজ্যের রাজধানী রাঁচিতে হাজারো শিক্ষার্থী বিধানসভা অভিমুখে মিছিল করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং পরে লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু কিছু সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন থামানো যাবে না; বিতর্কিত পরীক্ষাগুলো বাতিল, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিয়োগ ব্যবস্থায় স্থায়ী সংস্কার করতে হবে।
ষষ্ঠ দফার আলোচনাতেও মেলেনি সমাধান
রোববার ঝাড়খণ্ড সরকার ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ষষ্ঠ দফায় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই আলোচনাতেও অচলাবস্থা কাটেনি। সরকার দাবি করেছে, শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৮ শতাংশ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর বেশির ভাগই এখনো পূরণ হয়নি।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, তাদের দাবিগুলো মূলত তিন ভাগে বিভক্ত—বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল, অনিয়মের তদন্ত এবং নিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কার। তাদের অভিযোগ, সংস্কারের কিছু প্রস্তাবে সরকার সম্মতি দিলেও পরীক্ষাগুলো বাতিল ও তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার পিছিয়ে রয়েছে।
যে দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীরা
আন্দোলনকারীরা ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার তদন্ত দাবি করছেন। একই সঙ্গে ২০১৯ সালের পর অনুষ্ঠিত কয়েকটি বিতর্কিত নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের দাবি রয়েছে তাদের।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, শ্রেণিভিত্তিক কাট-অফ প্রকাশ, উত্তরপত্র ও উত্তরসংক্রান্ত নথি প্রকাশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার আদলে নিয়মিত নিয়োগপঞ্জি চালু করা।
বিশেষ করে ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের সম্মিলিত স্নাতক স্তরের পরীক্ষা বাতিল ও তদন্তের দাবি আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই পরীক্ষা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এবং বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া তারা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবেন না।
অনশনরত নেতাও মিছিলে

আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো টানা কয়েক দিন ধরে অনশন করছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও সোমবার তিনি আন্দোলনকারীদের মিছিলে যোগ দেন। তাকে প্রথমে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসা হয় এবং পরে স্ট্রেচারে করে মিছিলে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
মিছিলের আগে মাহাতো শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আন্দোলন যেন কোনোভাবেই সহিংসতার দিকে না যায়। ব্যারিকেড ভাঙার পরও শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যান শিক্ষার্থীরা
সোমবার সকালে রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়াম থেকে শিক্ষার্থীরা বিধানসভা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। মিছিলকে ঘিরে আগে থেকেই ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিধানসভার আশপাশে কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয় এবং বিধানসভা ভবনের ৭৫০ মিটারের মধ্যে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারি করা হয়।
তবে এসব ব্যবস্থা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে পুরোনো বিধানসভা ভবনের কাছে পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে তারা নতুন বিধানসভা ভবনের দিকে এগিয়ে যান।
জলকামান ও লাঠিচার্জ
ব্যারিকেডের শেষ স্তরের কাছে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী শেষ ব্যারিকেড অতিক্রমের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
এক শিক্ষার্থী পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, লাঠিচার্জের সময় মাথা, মুখ, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম মাত্রায় লাঠিচার্জ করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক সমর্থনও বাড়ছে
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে বিরোধী বিজেপিও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দলের রাজ্য সভাপতি আদিত্য সাহু ও বিরোধী দলনেতা বাবুলাল মারান্ডির নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা এবং পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের দাবি জানানো হয়। পরে কয়েকজন বিজেপি নেতাকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার বিধায়ক জয়ারাম কুমার মাহাতোও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে পুলিশের প্রতি সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হলে সেখানে লাঠিচার্জ করা উচিত নয়।

কমিশনেও বড় পরিবর্তন
আন্দোলনের মধ্যেই ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। কমিশনের তিন সদস্য—অজীতা ভট্টাচার্য, অনিমা হান্সদা ও জামাল আহমদ—পদত্যাগ করেছেন। পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে রাজ্য অপরাধ তদন্ত বিভাগ তাদের তলব করার পর এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটে।
এর পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের ঘটনায় অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট মামলা করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনশনরতদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
আন্দোলনস্থলে অনশনরত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সোমবার সকালে চিকিৎসকদের একটি দল জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে গিয়ে অনশনরত পরীক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন অনশনে থাকা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোর শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, সরকার তাদের সব গুরুত্বপূর্ণ দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তাদের বক্তব্য, নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু বর্তমান পরীক্ষার্থীদের বিষয় নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্যও একটি নির্ভরযোগ্য নিয়োগ ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।

রাজ্যজুড়ে বাড়ছে উত্তেজনা
আন্দোলনের কারণে রাঁচিতে সোমবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়। বিধানসভা এলাকার আশপাশে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় অধিকাংশ স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নেতারা জানিয়েছেন, পুলিশ যেখানেই তাদের থামাবে, সেখানেই তারা শান্তিপূর্ণভাবে বসে পড়বেন। তাদের লক্ষ্য সরকারকে বোঝানো যে আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ এবং তারা পিছিয়ে যেতে প্রস্তুত নন।
এখন মূল প্রশ্ন, পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে সরকার শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর রাজপথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ায় ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের নজর এখন এই আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথের দিকে।
পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, নিয়োগে জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার অবসান—এই তিন দাবিকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কতদূর গড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে উত্তাল ঝাড়খণ্ড—আন্দোলন থামবে, নাকি আরও বড় হবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















