ভারতের সংসদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জবাব দেবেন। একই সঙ্গে আলোচনার সময় বিরোধীদের সংসদে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
সোমবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কার্যক্রম পরামর্শ কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। বৈঠকে সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু সরকারের পক্ষ থেকে জানান, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে সরকার প্রস্তুত। আলোচনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সরকারের পক্ষ থেকে জবাব দেবেন।
দুই সপ্তাহ ধরে অচলাবস্থা
বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর পর থেকেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংসদে অচলাবস্থা চলছে। গত ২০ জুলাই শিক্ষার্থীদের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে পুলিশের পদক্ষেপের পর বিষয়টি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর থেকে বিরোধী দলগুলো সংসদে অমিত শাহের বক্তব্য দাবি করে আসছে।
বিরোধী দলের অভিযোগ, জাতীয় যোগ্যতা নির্ধারণী পরীক্ষা বা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপের বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার দাবিকে তারা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিরোধের কারণে লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষের কার্যক্রমই বারবার ব্যাহত হয়েছে। হট্টগোলের মধ্যেই কয়েকটি বিল পাস করা হয়েছে। ফলে সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে বিরোধীদের পাশাপাশি বিভিন্ন মহলেও প্রশ্ন উঠেছে।
অমিত শাহের বক্তব্য চায় বিরোধীরা
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং ২০ জুলাইয়ের পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে সংসদে অমিত শাহের বিবৃতি দাবি করেছিলেন। বিরোধীদের কাছে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও আপসহীন দাবি।
সোমবার সকালে বিরোধী দলগুলোর কৌশল নির্ধারণী বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে অমিত শাহের বক্তব্যের দাবিতে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এরপরই সরকার সংসদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তাব দেয়। সরকারের এক কর্মকর্তা মনে করেন, বিরোধীরা যেহেতু অমিত শাহের বক্তব্য চাইছিল, তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবসহ পূর্ণাঙ্গ আলোচনার এই প্রস্তাব তাদের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘আলোচনার সময় বিশৃঙ্খলা নয়’
সরকারের প্রস্তাবের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান কিরেন রিজিজু। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ এবং বিস্তারিত আলোচনা করতে সরকার প্রস্তুত।
তবে একই সঙ্গে বিরোধীদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বক্তব্য দেবেন, তখন যেন সংসদে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা না হয়। সরকারের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আলোচনা শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ও গভীর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
সরকারের এই অবস্থানকে সংসদের দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিরোধী শিবিরের সবাই বিষয়টিকে সরলভাবে দেখছে না।
বিরোধীদের সন্দেহ, বিভাজনের কৌশল
বিরোধী দলের কয়েকজন নেতা মনে করছেন, সরকারের এই প্রস্তাবের পেছনে বিরোধী জোটের মধ্যে বিভাজন তৈরির কৌশল থাকতে পারে। কারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি অযোধ্যায় রামমন্দির-সংক্রান্ত অনুদান চুরির অভিযোগ নিয়েও সংসদে আলোচনা চায় বিরোধীরা।
সমাজবাদী পার্টি বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী হলেও কংগ্রেসসহ বিরোধী জোটের অন্য দলগুলো শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে চাইছে।
কংগ্রেসের প্রধান হুইপ গৌরব গগৈ জানিয়েছেন, বিরোধীরা কোনো একটি বিষয়কে বাদ দিয়ে অন্যটি নিয়ে আলোচনা করতে চায় না। তাদের কাছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং রামমন্দির-সংক্রান্ত অনুদানের অভিযোগ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।
অধিবেশন শেষ হচ্ছে ১৩ আগস্ট
চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশন আগামী ১৩ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা। তার আগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ বিরোধীদের উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা হয় কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকার আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ায় সংসদের অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বিরোধীরা তাদের একাধিক দাবিতে অনড় রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিন ভারতীয় সংসদের কার্যক্রমে রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকতে পারে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে সংসদে কী আলোচনা হয় এবং অমিত শাহ কী জবাব দেন, তা এখন দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















