০৬:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
ঘরের কাজই যখন রোবটের শিক্ষক, মানুষের হাতের ভিডিওতে তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের যন্ত্রমানব জেনসেন হুয়াংয়ের পছন্দের ইজাকায়ায় ভিড়, বদলে যাচ্ছে জাপানের পানশালা ব্যবসা ইপস্টেইন নথি ঘেঁটে কিশোর সাংবাদিকের প্রতিবেদন, এরপরই শুরু বড়দের তোলপাড় খেলার মাঠের সীমানা পেরিয়ে তারকার মুকুটে: প্রথমবারের মতো ‘টাইম১০০ স্পোর্টস’-এ ক্রীড়াজগতের মহাতারকারা মহাকাশের স্বপ্নে ছুটছেন আইশোস্পিড, এবার লক্ষ্য মহাশূন্য নারী ফুটবল দলের কোচ হয়ে ফিরেও কেন ব্যর্থ টেড ল্যাসো? দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধই কি নতুন স্বাভাবিকতা? কেন আধুনিক সংঘাতের শেষ হচ্ছে না ‘দ্য ওডিসি’ পেরিয়ে গেল ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’, নোলানের ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ আয় শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া: ‘রুটস’-এর ৫০ বছর এবং অ্যালেক্স হেলির অমর উত্তরাধিকার সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি, মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা

গুরুত্বপূর্ণ খনিজের দখলে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তার নতুন লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রূপান্তর, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের গুরুত্বও অভূতপূর্বভাবে বেড়ে যাচ্ছে। লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজসহ বিভিন্ন খনিজ এখন শুধু শিল্পের কাঁচামাল নয়; এগুলো পরিণত হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ভূখণ্ডে খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়লে কিংবা বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবনতি হলে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও প্রযুক্তি খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রশ্নটি এখন আর কেবল পরিবেশ বা অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি ক্রমেই জাতীয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্র পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে এসব খনিজের প্রয়োজন বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোলের ভাষায়, এটি উদীয়মান জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। শুল্ক আরোপের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বেইজিং যখন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ সীমিত করার হুমকি দেয়, তখন ওয়াশিংটন দ্রুত নিজস্ব খনিজ শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে। এরপর খনি প্রকল্পের অনুমোদন দ্রুত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে সরকারি অর্থ বিনিয়োগের উদ্যোগও জোরদার হয়।

নেভাদার থ্যাকার পাস হয়ে উঠেছে প্রতীক

এই নতুন খনিজ প্রতিযোগিতার অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ নেভাদার উত্তরাঞ্চলের থ্যাকার পাস। ম্যানহাটন দ্বীপের চেয়েও বড় এই এলাকায় কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় লিথিয়াম খনি প্রকল্প গড়ে উঠছে।

পরিষ্কার জ্বালানির রূপান্তরের সময় লিথিয়ামের চাহিদা মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির মতো প্রযুক্তির কারণে বাড়ছিল। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্রের বিপুল শক্তির চাহিদা এবং সেই অবকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রশ্ন।

তবে খনি প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব যতই বাড়ুক, স্থানীয় মানুষের উদ্বেগও ততটাই প্রবল। ফোর্ট ম্যাকডারমিট পাইউট ও শোশোনি জনগোষ্ঠী থ্যাকার পাস প্রকল্পের বিরোধিতা করেছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রকল্প আদিবাসীদের পবিত্র ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধ্বংস করতে পারে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সেই খনিজ উত্তোলনের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ক্ষতি না করা।

খনিজের নিচে শুধু সম্পদ নয়, রয়েছে মানুষের বসতিও

এই দ্বন্দ্ব শুধু নেভাদায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ধেকেরও বেশি খনিজ আদিবাসী জনগোষ্ঠী বা তাদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত ভূমির ওপর কিংবা কাছাকাছি এলাকায় রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

ইতিহাস বলছে, খনিজ উত্তোলনের এই প্রতিযোগিতায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রায়ই সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে। কোথাও মানুষকে নিজ ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও দূষিত হয়েছে পানি ও বায়ু। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বহু বছর পরও তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার টার ক্রিক খনির উদাহরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। খনিটি ১৯৭০-এর দশকে বন্ধ হয়ে গেলেও এর অবশিষ্ট দূষণ মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষের ওপর পড়েছে। শিশুদের স্নায়বিক ক্ষতি এবং শারীরিক বিকাশে বাধার মতো সমস্যার সঙ্গেও ওই দূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

Transforming Metals and Minerals into Jobs and Lasting Prosperity

ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের খনিজের সামনে নতুন বিতর্ক

ক্যালিফোর্নিয়ার সালটন সি-র দক্ষিণ প্রান্তের নিচে থাকা লিথিয়াম মজুদও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন খনিজ প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে। সেখানে থাকা লিথিয়ামের সম্ভাব্য মূল্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু এই সম্পদ উত্তোলনের পরিকল্পনা স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার কুয়ায়ামি জনগোষ্ঠীর ৯০ বছর বয়সী কারমেন লুকাস দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে খনি উন্নয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

লুকাসের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভূমিকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন সেখানে আগে থেকে কোনো মানুষ বসবাস করে না। অথচ সেই ভূমির সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয় গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

তার আশঙ্কা, খনি উন্নয়ন স্থানীয় দূষণ বাড়িয়ে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি করতে পারে।

সামাজিক অনুমোদন এখন খনি প্রকল্পের বড় শর্ত

যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বড় খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু সরকারি অনুমোদনই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন বা অন্তত গ্রহণযোগ্যতাও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

খনি কোম্পানি সাউথ৩২-এর অ্যারিজোনা-ভিত্তিক হেরমোসা প্রকল্পের প্রধান প্যাট রিসনারের মতে, কোনো খনি পরিচালনার জন্য স্থানীয় মানুষের সামাজিক অনুমোদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটি শুধু আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুমতির বিষয় নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সামাজিক অনুমোদন পাওয়া সহজ নয়। কারণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগের তালিকা দীর্ঘ—ভূমি, পানি, বায়ু, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত।

দ্রুতগতির খনিজ উত্তোলন নতুন নজির তৈরি করছে

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রায় ঐকমত্যে পৌঁছেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নীতিনির্ধারকেরাও মনে করছেন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কিছু উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ দেশের ভেতরেই ফিরিয়ে আনা জরুরি।

ফেডারেল সরকারের দ্রুত অনুমোদন কর্মসূচির তালিকায় ইতিমধ্যে ৪০টি খনি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু এই তাড়াহুড়ো ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রশ্নও তৈরি করছে। বড় খনি নির্মাণের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ কতটা গুরুত্ব দিতে হবে, সরকারি সংস্থাগুলো কী ধরনের শর্ত দেবে এবং কোথায় সীমারেখা টানা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনের খনিজ নীতির নজির তৈরি করবে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানির পথেও খনির প্রয়োজন

বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এসেছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার জন্যও বিপুল পরিমাণ খনিজ প্রয়োজন।

বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি, আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্র—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ একদিকে বিশ্ব কার্বন নির্গমন কমাতে চাইছে, অন্যদিকে সেই রূপান্তরের জন্য নতুন করে খনিজ উত্তোলন বাড়াতে হচ্ছে।

এ কারণেই খনিজের প্রতিযোগিতা এখন কেবল খনি শিল্পের বিষয় নয়। এটি জলবায়ু নীতি, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।

সামনে কঠিন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জটি তাই দ্বিমুখী। চীনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নির্ভরতা কমিয়ে নিজের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন খনি প্রকল্প যেন স্থানীয় জনগোষ্ঠী, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় না ডেকে আনে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন একই প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তির ক্ষমতা নির্ধারণ করতে পারে। ফলে খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো ক্রমেই ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে খনিজের এই নতুন দৌড়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কে কত খনিজ তুলবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কীভাবে তুলবে, কার ভূমি থেকে তুলবে এবং সেই উন্নয়নের মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান খনিজ পুনর্জাগরণ সেই প্রশ্নেরই একটি বড় পরীক্ষা। চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা যেমন বাস্তব, তেমনি স্থানীয় মানুষের অধিকার ও পরিবেশ রক্ষার দাবিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে, তার উত্তর নির্ভর করবে এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য কতটা সফলভাবে তৈরি করা যায় তার ওপর।

গুরুত্বপূর্ণ বাক্য: গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন আর শুধু শিল্পের কাঁচামাল নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির শক্তির উৎস।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘরের কাজই যখন রোবটের শিক্ষক, মানুষের হাতের ভিডিওতে তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের যন্ত্রমানব

গুরুত্বপূর্ণ খনিজের দখলে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তার নতুন লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র

০৫:৩১:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রূপান্তর, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের গুরুত্বও অভূতপূর্বভাবে বেড়ে যাচ্ছে। লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজসহ বিভিন্ন খনিজ এখন শুধু শিল্পের কাঁচামাল নয়; এগুলো পরিণত হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব ভূখণ্ডে খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়লে কিংবা বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবনতি হলে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও প্রযুক্তি খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রশ্নটি এখন আর কেবল পরিবেশ বা অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি ক্রমেই জাতীয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্র পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে এসব খনিজের প্রয়োজন বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোলের ভাষায়, এটি উদীয়মান জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। শুল্ক আরোপের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বেইজিং যখন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ সীমিত করার হুমকি দেয়, তখন ওয়াশিংটন দ্রুত নিজস্ব খনিজ শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে। এরপর খনি প্রকল্পের অনুমোদন দ্রুত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে সরকারি অর্থ বিনিয়োগের উদ্যোগও জোরদার হয়।

নেভাদার থ্যাকার পাস হয়ে উঠেছে প্রতীক

এই নতুন খনিজ প্রতিযোগিতার অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ নেভাদার উত্তরাঞ্চলের থ্যাকার পাস। ম্যানহাটন দ্বীপের চেয়েও বড় এই এলাকায় কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় লিথিয়াম খনি প্রকল্প গড়ে উঠছে।

পরিষ্কার জ্বালানির রূপান্তরের সময় লিথিয়ামের চাহিদা মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির মতো প্রযুক্তির কারণে বাড়ছিল। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্রের বিপুল শক্তির চাহিদা এবং সেই অবকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রশ্ন।

তবে খনি প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব যতই বাড়ুক, স্থানীয় মানুষের উদ্বেগও ততটাই প্রবল। ফোর্ট ম্যাকডারমিট পাইউট ও শোশোনি জনগোষ্ঠী থ্যাকার পাস প্রকল্পের বিরোধিতা করেছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রকল্প আদিবাসীদের পবিত্র ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধ্বংস করতে পারে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একটি কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের খনিজ সরবরাহ নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সেই খনিজ উত্তোলনের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ক্ষতি না করা।

খনিজের নিচে শুধু সম্পদ নয়, রয়েছে মানুষের বসতিও

এই দ্বন্দ্ব শুধু নেভাদায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্ধেকেরও বেশি খনিজ আদিবাসী জনগোষ্ঠী বা তাদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত ভূমির ওপর কিংবা কাছাকাছি এলাকায় রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

ইতিহাস বলছে, খনিজ উত্তোলনের এই প্রতিযোগিতায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রায়ই সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে। কোথাও মানুষকে নিজ ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও দূষিত হয়েছে পানি ও বায়ু। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বহু বছর পরও তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার টার ক্রিক খনির উদাহরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। খনিটি ১৯৭০-এর দশকে বন্ধ হয়ে গেলেও এর অবশিষ্ট দূষণ মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষের ওপর পড়েছে। শিশুদের স্নায়বিক ক্ষতি এবং শারীরিক বিকাশে বাধার মতো সমস্যার সঙ্গেও ওই দূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

Transforming Metals and Minerals into Jobs and Lasting Prosperity

ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের খনিজের সামনে নতুন বিতর্ক

ক্যালিফোর্নিয়ার সালটন সি-র দক্ষিণ প্রান্তের নিচে থাকা লিথিয়াম মজুদও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন খনিজ প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে। সেখানে থাকা লিথিয়ামের সম্ভাব্য মূল্য ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু এই সম্পদ উত্তোলনের পরিকল্পনা স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার কুয়ায়ামি জনগোষ্ঠীর ৯০ বছর বয়সী কারমেন লুকাস দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে খনি উন্নয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।

লুকাসের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভূমিকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন সেখানে আগে থেকে কোনো মানুষ বসবাস করে না। অথচ সেই ভূমির সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয় গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

তার আশঙ্কা, খনি উন্নয়ন স্থানীয় দূষণ বাড়িয়ে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি করতে পারে।

সামাজিক অনুমোদন এখন খনি প্রকল্পের বড় শর্ত

যুক্তরাষ্ট্রে কোনো বড় খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু সরকারি অনুমোদনই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমর্থন বা অন্তত গ্রহণযোগ্যতাও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

খনি কোম্পানি সাউথ৩২-এর অ্যারিজোনা-ভিত্তিক হেরমোসা প্রকল্পের প্রধান প্যাট রিসনারের মতে, কোনো খনি পরিচালনার জন্য স্থানীয় মানুষের সামাজিক অনুমোদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এটি শুধু আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুমতির বিষয় নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সামাজিক অনুমোদন পাওয়া সহজ নয়। কারণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগের তালিকা দীর্ঘ—ভূমি, পানি, বায়ু, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত।

দ্রুতগতির খনিজ উত্তোলন নতুন নজির তৈরি করছে

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রায় ঐকমত্যে পৌঁছেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নীতিনির্ধারকেরাও মনে করছেন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কিছু উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ দেশের ভেতরেই ফিরিয়ে আনা জরুরি।

ফেডারেল সরকারের দ্রুত অনুমোদন কর্মসূচির তালিকায় ইতিমধ্যে ৪০টি খনি প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

কিন্তু এই তাড়াহুড়ো ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রশ্নও তৈরি করছে। বড় খনি নির্মাণের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ কতটা গুরুত্ব দিতে হবে, সরকারি সংস্থাগুলো কী ধরনের শর্ত দেবে এবং কোথায় সীমারেখা টানা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনের খনিজ নীতির নজির তৈরি করবে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানির পথেও খনির প্রয়োজন

বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এসেছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার জন্যও বিপুল পরিমাণ খনিজ প্রয়োজন।

বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি, আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্র—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা বাড়ছে। অর্থাৎ একদিকে বিশ্ব কার্বন নির্গমন কমাতে চাইছে, অন্যদিকে সেই রূপান্তরের জন্য নতুন করে খনিজ উত্তোলন বাড়াতে হচ্ছে।

এ কারণেই খনিজের প্রতিযোগিতা এখন কেবল খনি শিল্পের বিষয় নয়। এটি জলবায়ু নীতি, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।

সামনে কঠিন সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জটি তাই দ্বিমুখী। চীনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নির্ভরতা কমিয়ে নিজের সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন খনি প্রকল্প যেন স্থানীয় জনগোষ্ঠী, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় না ডেকে আনে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন একই প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তির ক্ষমতা নির্ধারণ করতে পারে। ফলে খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো ক্রমেই ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে খনিজের এই নতুন দৌড়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কে কত খনিজ তুলবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—কীভাবে তুলবে, কার ভূমি থেকে তুলবে এবং সেই উন্নয়নের মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান খনিজ পুনর্জাগরণ সেই প্রশ্নেরই একটি বড় পরীক্ষা। চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা যেমন বাস্তব, তেমনি স্থানীয় মানুষের অধিকার ও পরিবেশ রক্ষার দাবিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে, তার উত্তর নির্ভর করবে এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য কতটা সফলভাবে তৈরি করা যায় তার ওপর।

গুরুত্বপূর্ণ বাক্য: গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন আর শুধু শিল্পের কাঁচামাল নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির শক্তির উৎস।