গরমের সময় বাইরে বের হওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, তীব্র রোদ আর আর্দ্র আবহাওয়া—সব মিলিয়ে ত্বকের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এ সময় অনেকেই শুধু মুখে সানস্ক্রিন লাগানো বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের মধ্যেই ত্বকের যত্ন সীমাবদ্ধ রাখেন। কিন্তু ত্বক বিশেষজ্ঞদের নিজেদের গ্রীষ্মকালীন অভ্যাস দেখলে বোঝা যায়, ত্বক ভালো রাখতে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা দরকার।
চিকিৎসকদের মতে, গরমে ত্বকের যত্ন মানে শুধু রোদ থেকে বাঁচা নয়। শরীরের যেসব অংশ সাধারণত চোখ এড়িয়ে যায়, সেগুলো সুরক্ষিত রাখা, ঘাম জমে থাকতে না দেওয়া, উপযুক্ত পোশাক পরা এবং ত্বকে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব জায়গায় সানস্ক্রিন দিতে ভুল হয়
সানস্ক্রিন ব্যবহারের সময় মুখ, গলা ও হাতের দিকে বেশির ভাগ মানুষের নজর থাকে। কিন্তু কানের ওপর ও পেছনে, মাথার সিঁথি, পায়ের ওপরের অংশ, পায়ের আঙুল এবং হাঁটুর পেছনের মতো জায়গাগুলো অনেক সময় বাদ পড়ে যায়।
বিশেষ করে পানির কাছে থাকলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। কারণ পানির ওপর সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে শরীরের এমন অংশেও পৌঁছাতে পারে, যেগুলো সরাসরি আকাশের দিকে না থাকলেও রোদ পায়।
ঠোঁটও রোদের ক্ষতি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তাই ঠোঁটের জন্য সূর্যরোধী উপাদানযুক্ত বাম ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মাথার চুলের ফাঁক দিয়ে সরাসরি রোদ ত্বকে পৌঁছাতে পারে বলেও মাথার সিঁথির অংশে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
চোখের সুরক্ষাও ত্বকের যত্নের অংশ
সানস্ক্রিন চোখের চারপাশের সব জায়গাকে সুরক্ষিত করতে পারে না। তাই গরমের সময় ভালো মানের রোদচশমা ব্যবহার করা জরুরি।
দীর্ঘদিন অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ চোখের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে পানির কাছে বা খোলা জায়গায় দীর্ঘ সময় কাটালে প্রতিফলিত সূর্যের আলো চোখের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই রোদচশমা কেনার সময় শুধু দেখতে সুন্দর কি না, সেটি না দেখে অতিবেগুনি রশ্মির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দেয় কি না, সেটিও দেখা উচিত।
গরমে শরীরকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিন
গরমের সময় আঁটসাঁট ও কৃত্রিম তন্তুর পোশাক ত্বকের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে। এসব পোশাক শরীরের তাপ ও ঘাম আটকে রাখে। ফলে ত্বকে র্যাশ, লোমকূপে প্রদাহ কিংবা ছত্রাকজাতীয় সংক্রমণের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ত্বক বিশেষজ্ঞরা গরমে এমন পোশাক বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন, যা বাতাস চলাচলের সুযোগ দেয় এবং ঘাম দ্রুত শুষে নিতে পারে। বিশেষ করে অন্তর্বাসের ক্ষেত্রে আরামদায়ক ও বাতাস চলাচল করে এমন কাপড় ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পরও শরীরে রেখে দেবেন না
ব্যায়াম করার পর কিংবা প্রচণ্ড গরমে বাইরে থাকার পর শরীরে ঘাম জমে থাকে। অনেকেই ঘাম শুকিয়ে গেলে বিষয়টিকে আর গুরুত্ব দেন না। কিন্তু ঘাম শুকানোর সময় ত্বকের ওপর লবণজাতীয় উপাদান থেকে যেতে পারে, যা সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ঘাম ও আর্দ্রতা ত্বকে জমে থাকলে জীবাণুর বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এর ফলে লোমকূপে প্রদাহ, ব্রণ বা অন্যান্য ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই বেশি ঘাম হওয়ার পর সুযোগ পেলেই পরিষ্কার পানি দিয়ে শরীর ধুয়ে নেওয়া ভালো অভ্যাস। বিশেষ করে ব্যায়াম বা দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার পর দ্রুত গোসল করা ত্বকের জন্য উপকারী হতে পারে।

ত্বকে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে অবহেলা নয়
গ্রীষ্মে মানুষ সাধারণত বেশি ত্বক খোলা রাখেন। ফলে নিজের শরীরের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা সঙ্গীর ত্বকেও অস্বাভাবিক কোনো দাগ বা পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে।
কোনো তিল বা দাগ যদি শরীরের অন্য দাগগুলোর তুলনায় একেবারেই আলাদা মনে হয়, সেটিকে অবহেলা না করাই ভালো। কোনো দাগের আকৃতি, রং বা চেহারায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ত্বকের গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাই অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াই নিরাপদ।
গরমে ত্বকের যত্নে ছোট অভ্যাসই বড় সুরক্ষা
গরমের সময় ত্বক ভালো রাখার জন্য খুব জটিল কোনো ব্যবস্থা সবসময় প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত সূর্যরোধী সুরক্ষা নেওয়া, ভুলে যাওয়া শরীরের অংশগুলোতেও নজর দেওয়া, রোদচশমা ব্যবহার করা, বাতাস চলাচল করে এমন পোশাক পরা এবং অতিরিক্ত ঘামের পর দ্রুত শরীর পরিষ্কার করার মতো ছোট অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় উপকার করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের ত্বকের স্বাভাবিক চেহারা ও পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা। ত্বকে এমন কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে, যা আগে ছিল না বা অন্য দাগগুলোর সঙ্গে মিলছে না, সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গরমের মৌসুমে ত্বকের যত্ন তাই শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















