০৬:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
ইপস্টেইন নথি ঘেঁটে কিশোর সাংবাদিকের প্রতিবেদন, এরপরই শুরু বড়দের তোলপাড় খেলার মাঠের সীমানা পেরিয়ে তারকার মুকুটে: প্রথমবারের মতো ‘টাইম১০০ স্পোর্টস’-এ ক্রীড়াজগতের মহাতারকারা মহাকাশের স্বপ্নে ছুটছেন আইশোস্পিড, এবার লক্ষ্য মহাশূন্য নারী ফুটবল দলের কোচ হয়ে ফিরেও কেন ব্যর্থ টেড ল্যাসো? দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধই কি নতুন স্বাভাবিকতা? কেন আধুনিক সংঘাতের শেষ হচ্ছে না ‘দ্য ওডিসি’ পেরিয়ে গেল ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’, নোলানের ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ আয় শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া: ‘রুটস’-এর ৫০ বছর এবং অ্যালেক্স হেলির অমর উত্তরাধিকার সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি, মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা মানুষের মতো রোবটের যুগ কি দরজায়? চীনের ইউনিট্রির হাত ধরে বদলে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ ইমরান খানের বন্দিত্ব ও ওয়াশিংটনের গণতন্ত্র-ভুলে যাওয়া

লিথিয়াম আর ভূতাপীয় বিদ্যুতের স্বপ্নে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘হেলস কিচেন’, সামনে পরিবেশের কঠিন প্রশ্ন

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইম্পেরিয়াল ভ্যালিতে সল্টন সি হ্রদের তীরে গড়ে উঠছে এমন এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, যার লক্ষ্য একই সঙ্গে ভূতাপীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং লিথিয়াম আহরণ। প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পকে ঘিরে একদিকে যেমন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি পরিবেশ, পানি ব্যবহার, জনস্বাস্থ্য এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

‘হেলস কিচেন’ নামে পরিচিত এই বৃহৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কন্ট্রোলড থার্মাল রিসোর্সেস। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ভূগর্ভস্থ তাপ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হবে। এরপর একই ভূতাপীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রক্রিয়ায় লিথিয়াম আহরণের কার্যক্রম চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।

লিথিয়াম বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে লিথিয়ামের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগকে কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। তবে এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এর পরিবেশগত মূল্য কতটা হতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মরুভূমির উপত্যকায় নতুন শিল্পের স্বপ্ন

ইম্পেরিয়াল ভ্যালি দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা একটি অঞ্চল। এখানকার বহু মানুষ কৃষি ও নিম্নআয়ের কাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রকল্পটির সমর্থকদের মতে, নতুন শিল্প স্থাপিত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং অঞ্চলটি ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

বিশেষ করে ভূতাপীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূর্য বা বাতাসের ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুতের তুলনায় ভূতাপীয় শক্তি তুলনামূলকভাবে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন করা যায়। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকা সময়ে এ ধরনের প্রকল্পের গুরুত্বও বাড়ছে।

প্রকল্পটির উদ্যোক্তারা এখন শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য লিথিয়াম সরবরাহের সম্ভাবনাই সামনে রাখছেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর তথ্যকেন্দ্রের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, সেই বাজারেও ভূতাপীয় বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।

অর্থনীতির সম্ভাবনার পাশে পরিবেশের উদ্বেগ

কিন্তু সল্টন সি অঞ্চলের বাস্তবতা এই উন্নয়নের গল্পকে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।

এলাকাটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দরিদ্র এবং পরিবেশগতভাবে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা অঞ্চল। এখানকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ লাতিনো জনগোষ্ঠীর। দীর্ঘদিন ধরে খারাপ বায়ুমানের কারণে বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নতুন একটি বড় শিল্প প্রকল্প স্থানীয় পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে বায়ু, পানি এবং ভূগর্ভস্থ সম্পদের ওপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

সল্টন সি নিজেই পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বহু বছর ধরে সংকটের মধ্যে রয়েছে। হ্রদের পানির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং উন্মুক্ত হয়ে পড়া হ্রদের তলদেশ থেকে ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা স্থানীয় মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এর সঙ্গে নতুন শিল্প কার্যক্রম যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিরোধীরা।

Hell's Kitchen Lithium and Power Project, US

পানির ব্যবহার নিয়ে তীব্র বিতর্ক

প্রকল্পটির বিরুদ্ধে স্থানীয় উদ্বেগের অন্যতম প্রধান বিষয় পানি।

মরুভূমিপ্রধান এই অঞ্চলে পানি এমনিতেই অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। কৃষি, মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং পরিবেশ—সবকিছুর জন্য পানির ওপর তীব্র চাপ রয়েছে। তাই বৃহৎ শিল্প প্রকল্পে কী পরিমাণ পানি ব্যবহার হবে এবং সেই পানি কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূতাপীয় সম্পদ থেকে বিদ্যুৎ ও লিথিয়াম উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ জানতে চাইছেন, এই অর্থনৈতিক লাভের বিনিময়ে তাদের পানি ও পরিবেশের ওপর কতটা চাপ নিতে হবে।

এই প্রশ্ন শুধু একটি প্রকল্পকে ঘিরে নয়। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদন বাড়াতে চায়, তাহলে পানি-স্বল্প অঞ্চলে আরও কতগুলো এমন প্রকল্প গড়ে উঠবে—সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

আদালতের লড়াই শেষ হলেও বিরোধ থামেনি

প্রকল্পটি বন্ধের দাবিতে স্থানীয় বিরোধীরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। গত বছর ইম্পেরিয়াল কাউন্টি এবং প্রকল্পটির মালিক প্রতিষ্ঠান আদালতে সেই মামলা মোকাবিলায় সফল হয়। ফলে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পথ আরও পরিষ্কার হয়।

তবে আদালতের ওই সিদ্ধান্তের পরও বিরোধিতা থেমে যায়নি। প্রকল্পবিরোধীরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। অর্থাৎ আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধও অব্যাহত রয়েছে।

এ থেকে স্পষ্ট, শুধু আদালতের অনুমোদন পেলেই একটি বড় শিল্প প্রকল্প স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা কারা পাবেন, পরিবেশগত ঝুঁকি কারা বহন করবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়নের সুফল কার ঘরে পৌঁছাবে?

প্রকল্পকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হচ্ছে ‘কমিউনিটি বেনিফিট’ বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধা নিশ্চিত করার চুক্তি।

বড় শিল্প প্রকল্প সাধারণত একটি অঞ্চলে বিনিয়োগ, চাকরি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর-আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু এসব সুবিধা যদি স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন না আনে, তাহলে উন্নয়নের ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

স্থানীয় মানুষ তাই শুধু চাকরির প্রতিশ্রুতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং তাদের জীবনের ওপর প্রকল্পের প্রভাব নিয়েও নিশ্চয়তা চান।

একটি দরিদ্র অঞ্চলে নতুন শিল্প স্থাপন নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ যদি পরিবেশগত ক্ষতির সঙ্গে আসে, তাহলে উন্নয়নের হিসাবটি আর সরল থাকে না।

লিথিয়ামের বাজারেও বদল এসেছে

প্রকল্পটি যখন পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তখন বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণ লিথিয়ামের চাহিদা নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হয়েছে এবং লিথিয়ামের চাহিদা ও দামের পূর্বাভাসেও পরিবর্তন এসেছে।

ফলে শুধু লিথিয়াম বিক্রি করে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করার ধারণা আগের তুলনায় বেশি অনিশ্চিত।

এই বাস্তবতায় প্রকল্পের উদ্যোক্তারা ভূতাপীয় বিদ্যুৎকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর তথ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সম্ভাব্য নতুন বাজার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থাৎ প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জ্বালানি রূপান্তর এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।

একজন প্রবীণের হাতে কাদা, সামনে ভবিষ্যতের প্রশ্ন

সল্টন সি-র ভূতাপীয় কাদার পাত্রগুলো পরিদর্শনের সময় কুয়াইয়িমি লেগুনা সম্প্রদায়ের প্রবীণ কারমেন লুকাসের হাতে লেগে থাকা কাদা যেন এই পুরো বিতর্কের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

একদিকে মাটির গভীরে থাকা তাপ ও খনিজকে ব্যবহার করে নতুন অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা। অন্যদিকে সেই মাটি, পানি, বাতাস ও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনযাপন।

‘হেলস কিচেন’ তাই শুধু একটি খনি বা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নাম নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শিল্পনীতি ও স্থানীয় পরিবেশগত ন্যায়বিচারের মধ্যে তৈরি হওয়া সংঘাতেরও একটি উদাহরণ।

বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন লিথিয়াম ও বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন খনি ও জ্বালানি প্রকল্পের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি দরিদ্র ও পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেই সবচেয়ে বেশি দিতে হয়, তাহলে উন্নয়নের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

ইম্পেরিয়াল ভ্যালির ভবিষ্যৎ তাই শুধু একটি প্রকল্প সফল হবে কি না, সেই প্রশ্নে আটকে নেই। আসল প্রশ্ন হলো—অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা পূরণের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অধিকারকে একই কাঠামোর মধ্যে কতটা সফলভাবে রাখা যায়।

এই ভারসাম্য তৈরি করতে পারলে ‘হেলস কিচেন’ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জ্বালানি অর্থনীতির পথ দেখাতে পারে। আর তা না হলে এটি হয়ে উঠতে পারে উন্নয়নের নামে পরিবেশগত বোঝা স্থানীয় মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইপস্টেইন নথি ঘেঁটে কিশোর সাংবাদিকের প্রতিবেদন, এরপরই শুরু বড়দের তোলপাড়

লিথিয়াম আর ভূতাপীয় বিদ্যুতের স্বপ্নে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘হেলস কিচেন’, সামনে পরিবেশের কঠিন প্রশ্ন

০৫:৪০:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইম্পেরিয়াল ভ্যালিতে সল্টন সি হ্রদের তীরে গড়ে উঠছে এমন এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, যার লক্ষ্য একই সঙ্গে ভূতাপীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং লিথিয়াম আহরণ। প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পকে ঘিরে একদিকে যেমন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি পরিবেশ, পানি ব্যবহার, জনস্বাস্থ্য এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

‘হেলস কিচেন’ নামে পরিচিত এই বৃহৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কন্ট্রোলড থার্মাল রিসোর্সেস। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ভূগর্ভস্থ তাপ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হবে। এরপর একই ভূতাপীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রক্রিয়ায় লিথিয়াম আহরণের কার্যক্রম চালু করার লক্ষ্য রয়েছে।

লিথিয়াম বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে লিথিয়ামের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগকে কৌশলগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। তবে এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এর পরিবেশগত মূল্য কতটা হতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মরুভূমির উপত্যকায় নতুন শিল্পের স্বপ্ন

ইম্পেরিয়াল ভ্যালি দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা একটি অঞ্চল। এখানকার বহু মানুষ কৃষি ও নিম্নআয়ের কাজের ওপর নির্ভরশীল। প্রকল্পটির সমর্থকদের মতে, নতুন শিল্প স্থাপিত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং অঞ্চলটি ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

বিশেষ করে ভূতাপীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূর্য বা বাতাসের ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুতের তুলনায় ভূতাপীয় শক্তি তুলনামূলকভাবে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন করা যায়। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকা সময়ে এ ধরনের প্রকল্পের গুরুত্বও বাড়ছে।

প্রকল্পটির উদ্যোক্তারা এখন শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য লিথিয়াম সরবরাহের সম্ভাবনাই সামনে রাখছেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর তথ্যকেন্দ্রের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা যে হারে বাড়ছে, সেই বাজারেও ভূতাপীয় বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।

অর্থনীতির সম্ভাবনার পাশে পরিবেশের উদ্বেগ

কিন্তু সল্টন সি অঞ্চলের বাস্তবতা এই উন্নয়নের গল্পকে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে।

এলাকাটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম দরিদ্র এবং পরিবেশগতভাবে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থাকা অঞ্চল। এখানকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশ লাতিনো জনগোষ্ঠীর। দীর্ঘদিন ধরে খারাপ বায়ুমানের কারণে বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নতুন একটি বড় শিল্প প্রকল্প স্থানীয় পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে বায়ু, পানি এবং ভূগর্ভস্থ সম্পদের ওপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

সল্টন সি নিজেই পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বহু বছর ধরে সংকটের মধ্যে রয়েছে। হ্রদের পানির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং উন্মুক্ত হয়ে পড়া হ্রদের তলদেশ থেকে ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা স্থানীয় মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এর সঙ্গে নতুন শিল্প কার্যক্রম যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিরোধীরা।

Hell's Kitchen Lithium and Power Project, US

পানির ব্যবহার নিয়ে তীব্র বিতর্ক

প্রকল্পটির বিরুদ্ধে স্থানীয় উদ্বেগের অন্যতম প্রধান বিষয় পানি।

মরুভূমিপ্রধান এই অঞ্চলে পানি এমনিতেই অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। কৃষি, মানুষের দৈনন্দিন জীবন এবং পরিবেশ—সবকিছুর জন্য পানির ওপর তীব্র চাপ রয়েছে। তাই বৃহৎ শিল্প প্রকল্পে কী পরিমাণ পানি ব্যবহার হবে এবং সেই পানি কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পের পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূতাপীয় সম্পদ থেকে বিদ্যুৎ ও লিথিয়াম উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ জানতে চাইছেন, এই অর্থনৈতিক লাভের বিনিময়ে তাদের পানি ও পরিবেশের ওপর কতটা চাপ নিতে হবে।

এই প্রশ্ন শুধু একটি প্রকল্পকে ঘিরে নয়। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদন বাড়াতে চায়, তাহলে পানি-স্বল্প অঞ্চলে আরও কতগুলো এমন প্রকল্প গড়ে উঠবে—সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।

আদালতের লড়াই শেষ হলেও বিরোধ থামেনি

প্রকল্পটি বন্ধের দাবিতে স্থানীয় বিরোধীরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। গত বছর ইম্পেরিয়াল কাউন্টি এবং প্রকল্পটির মালিক প্রতিষ্ঠান আদালতে সেই মামলা মোকাবিলায় সফল হয়। ফলে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পথ আরও পরিষ্কার হয়।

তবে আদালতের ওই সিদ্ধান্তের পরও বিরোধিতা থেমে যায়নি। প্রকল্পবিরোধীরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। অর্থাৎ আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধও অব্যাহত রয়েছে।

এ থেকে স্পষ্ট, শুধু আদালতের অনুমোদন পেলেই একটি বড় শিল্প প্রকল্প স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা কারা পাবেন, পরিবেশগত ঝুঁকি কারা বহন করবেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্থানীয় মানুষের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়নের সুফল কার ঘরে পৌঁছাবে?

প্রকল্পকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হচ্ছে ‘কমিউনিটি বেনিফিট’ বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধা নিশ্চিত করার চুক্তি।

বড় শিল্প প্রকল্প সাধারণত একটি অঞ্চলে বিনিয়োগ, চাকরি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর-আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু এসব সুবিধা যদি স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন না আনে, তাহলে উন্নয়নের ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

স্থানীয় মানুষ তাই শুধু চাকরির প্রতিশ্রুতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং তাদের জীবনের ওপর প্রকল্পের প্রভাব নিয়েও নিশ্চয়তা চান।

একটি দরিদ্র অঞ্চলে নতুন শিল্প স্থাপন নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ যদি পরিবেশগত ক্ষতির সঙ্গে আসে, তাহলে উন্নয়নের হিসাবটি আর সরল থাকে না।

লিথিয়ামের বাজারেও বদল এসেছে

প্রকল্পটি যখন পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তখন বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণ লিথিয়ামের চাহিদা নিয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হয়েছে এবং লিথিয়ামের চাহিদা ও দামের পূর্বাভাসেও পরিবর্তন এসেছে।

ফলে শুধু লিথিয়াম বিক্রি করে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করার ধারণা আগের তুলনায় বেশি অনিশ্চিত।

এই বাস্তবতায় প্রকল্পের উদ্যোক্তারা ভূতাপীয় বিদ্যুৎকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর তথ্যকেন্দ্রগুলোর জন্য বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে সম্ভাব্য নতুন বাজার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থাৎ প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জ্বালানি রূপান্তর এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে।

একজন প্রবীণের হাতে কাদা, সামনে ভবিষ্যতের প্রশ্ন

সল্টন সি-র ভূতাপীয় কাদার পাত্রগুলো পরিদর্শনের সময় কুয়াইয়িমি লেগুনা সম্প্রদায়ের প্রবীণ কারমেন লুকাসের হাতে লেগে থাকা কাদা যেন এই পুরো বিতর্কের একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।

একদিকে মাটির গভীরে থাকা তাপ ও খনিজকে ব্যবহার করে নতুন অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা। অন্যদিকে সেই মাটি, পানি, বাতাস ও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনযাপন।

‘হেলস কিচেন’ তাই শুধু একটি খনি বা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নাম নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শিল্পনীতি ও স্থানীয় পরিবেশগত ন্যায়বিচারের মধ্যে তৈরি হওয়া সংঘাতেরও একটি উদাহরণ।

বিশ্ব যখন বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন লিথিয়াম ও বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন খনি ও জ্বালানি প্রকল্পের প্রয়োজন হবে। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি দরিদ্র ও পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেই সবচেয়ে বেশি দিতে হয়, তাহলে উন্নয়নের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

ইম্পেরিয়াল ভ্যালির ভবিষ্যৎ তাই শুধু একটি প্রকল্প সফল হবে কি না, সেই প্রশ্নে আটকে নেই। আসল প্রশ্ন হলো—অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা পূরণের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের অধিকারকে একই কাঠামোর মধ্যে কতটা সফলভাবে রাখা যায়।

এই ভারসাম্য তৈরি করতে পারলে ‘হেলস কিচেন’ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জ্বালানি অর্থনীতির পথ দেখাতে পারে। আর তা না হলে এটি হয়ে উঠতে পারে উন্নয়নের নামে পরিবেশগত বোঝা স্থানীয় মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আরেকটি দৃষ্টান্ত।