ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র যখন সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, ঠিক সেই সময় সৌদি আরবকে বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। এই নীতির বৈপরীত্য ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত ২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ ঘোষণা করে, সৌদি আরবের নিজ ভূখণ্ডে বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি চালুর জন্য দেশটির সঙ্গে একটি বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, একদিকে ওয়াশিংটন ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা ঠেকাতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে একই অঞ্চলের আরেক দেশ সৌদি আরবকে পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে এই চুক্তি পুরো অঞ্চলে নতুন ধরনের পরমাণু প্রতিযোগিতার সূচনা করতে পারে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পরমাণু নীতি কর্মসূচির সহপরিচালক জেমস অ্যাকটন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এই খবর সত্য হলে তা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
তার উদ্বেগের মূল কারণ সৌদি আরবকে এমন প্রযুক্তি দেওয়ার সম্ভাবনা, যা ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও একই পথে যেতে বাধ্য হতে পারে।
ফলে সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা বেসামরিক ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইরানের ওপরও পড়তে পারে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচির অনুমোদন ইরানের নিরাপত্তা হিসাবও বদলে দিতে পারে।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক রোজমেরি কেলানিক মনে করেন, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য মিত্রদের সঙ্গে করা আগের পরমাণু চুক্তিগুলোর তুলনায় ভিন্ন। কারণ অতীতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব নিত।
নতুন ব্যবস্থায় সৌদি আরবের নিজস্ব ভূখণ্ডে বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি গড়ে ওঠার সুযোগ থাকায় প্রযুক্তি হস্তান্তর ও ভবিষ্যৎ ব্যবহারের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কেলানিকের মতে, সৌদি আরবকে দেওয়া এই সুযোগ ইরানের কাছে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দিতে পারে যে উপসাগরের অপর পারে একটি সম্ভাব্য পরমাণু শক্তিধর দেশ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ইরানও নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিকে অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে নেওয়ার চাপ অনুভব করতে পারে।
অর্থাৎ, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখাই যদি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির অন্যতম লক্ষ্য হয়, তাহলে সৌদি আরবকে দেওয়া এই সুযোগ সেই লক্ষ্যকেই পরোক্ষভাবে দুর্বল করতে পারে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা
তবে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চুক্তি ঘোষণার পরদিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, সৌদি আরবের সঙ্গে এই পরমাণু সহযোগিতার বিষয়টি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে করা আব্রাহাম চুক্তিতে সৌদি আরবের যোগদানের সঙ্গে যুক্ত।
আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার অর্থ হলো ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটও স্পষ্ট করে বলেছেন, সৌদি আরব এতে যোগ না দিলে পরমাণু সহযোগিতার চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে।
ফলে সৌদি আরবের পরমাণু কর্মসূচি এখন শুধু জ্বালানি ও প্রযুক্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি সম্পর্ক, ইরানের পরমাণু সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ভারসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বিষয়।
বদলে যেতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ
সৌদি আরব যদি বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি সফলভাবে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর।
পরমাণু প্রযুক্তির বেসামরিক ব্যবহার এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক সীমারেখা রয়েছে। কিন্তু কোনো দেশ যখন পরমাণু প্রযুক্তিতে উন্নত সক্ষমতা অর্জন করে, তখন ভবিষ্যতে সেই সক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে—এ নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এই কারণেই সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সহযোগিতাকে শুধু একটি বেসামরিক জ্বালানি চুক্তি হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, এটি যদি যথেষ্ট কঠোর নিরাপত্তা ও পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের শর্ত ছাড়া বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ নিজেদের পরমাণু সক্ষমতা বাড়ানোর পথে যেতে পারে।
ইরানকে পরমাণু অস্ত্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা এবং সৌদি আরবকে পরমাণু প্রযুক্তিতে সহযোগিতা—এই দুই নীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আর সেই ভারসাম্য ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরমাণু প্রতিযোগিতার ঝুঁকি আরও গভীর হতে পারে।
সৌদি আরবের আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হয় কি না এবং পরমাণু সহযোগিতার ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বাড়াবে, নাকি নতুন নিরাপত্তা সংকটের দরজা খুলে দেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















