উচ্চবিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার একটি সাধারণ বাড়ির কাজ কীভাবে একটি বড় বিতর্কে পরিণত হতে পারে, ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড হাইস্কুলের শিক্ষার্থী বেন মুলারের ঘটনা তারই ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ইপস্টেইন-সংক্রান্ত সরকারি নথির বিশাল ভাণ্ডার ঘেঁটে নিজের এলাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য খুঁজে বের করে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। প্রতিবেদনটি ব্যাপক প্রশংসা পাওয়ার পর এক পর্যায়ে সেটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের ওপর আইনি চাপও তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত নথি যাচাই করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিবেদন পুনরায় প্রকাশ করে।
ঘটনাটি শুধু একটি কিশোরের সাংবাদিকতার দক্ষতাই সামনে আনেনি, বরং শিক্ষার্থী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং সত্য তথ্য প্রকাশের অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাড়ির কাজ থেকেই অনুসন্ধানের শুরু
২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বাড়ি ফিরে মুলারের সামনে ছিল সাংবাদিকতা বিষয়ের একটি নির্দিষ্ট কাজ। যেকোনো একটি সংবাদ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক ছবির মাধ্যমে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।
প্রথমে কিছুটা সময় তিনি পড়াশোনা ফাঁকি দিয়ে সম্ভাব্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান ঘাঁটছিলেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ইপস্টেইন নথির অনলাইন ভাণ্ডারে প্রবেশ করেন। সেখানে তখন প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি ছিল, যেগুলো প্রকাশের মাত্র ১১ দিন পেরিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার মারিন কাউন্টির একটি সমৃদ্ধ এলাকায় বেড়ে ওঠা মুলারের মনে প্রশ্ন জাগে, ইপস্টেইনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার নিজের এলাকার কোনো যোগসূত্র আছে কি না। এরপর নিজের ঘরেই বসে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সরকারি নথি খুঁজতে থাকেন।
মারিনের সঙ্গে ইপস্টেইনের হাজারো যোগসূত্র
নথি ঘেঁটে মুলার মারিন কাউন্টির বিভিন্ন শহর ও এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত হাজার হাজার উল্লেখ খুঁজে পান। অধিকাংশ তথ্যই ছিল সাধারণ ও গুরুত্বহীন। কোথাও ইপস্টেইনের কেনাকাটার তথ্য, কোথাও স্থানীয় কোনো অনুষ্ঠানের উল্লেখ।
তবে কিছু তথ্য তার নজর কেড়ে নেয়। এর মধ্যে ছিল ২০১৪ সালের সসালিটোর একটি শিল্পকলা অনুষ্ঠান, টিবুরনে উডি অ্যালেনের সঙ্গে একটি বৈঠকের উল্লেখ এবং বিশেষভাবে ২০১৩ সালের একটি ই-মেইল বিনিময়।
ওই ই-মেইলে একটি মডেল সরবরাহের প্রসঙ্গ উঠে আসে। মুলারের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় এবং তিনি সেটিকে তার প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় তথ্যগুলোর একটি হিসেবে রাখেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ, মুহূর্তেই বিপুল সাড়া
১২ ফেব্রুয়ারি মুলার তার প্রতিবেদনটি রেডউড হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত সংবাদপত্র ‘রেডউড বার্ক’-এর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পাতায় প্রকাশ করেন।
প্রথম পাতায় প্রশ্ন ছিল—ইপস্টেইন নথিতে মারিনের কোন কোন শহরের নাম এসেছে? এরপর একের পর এক পাতায় বিভিন্ন এলাকার উল্লেখ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর দ্রুতই হাজার হাজার মানুষের নজরে আসে। চার হাজারের বেশি মানুষ এতে প্রতিক্রিয়া জানান। অনেকে শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতার প্রশংসা করে বলেন, এমন প্রতিবেদন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের চেয়েও ভালো। কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেন যে একটি উচ্চবিদ্যালয়ের সংবাদপত্র এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে এমন অনুসন্ধান করতে পেরেছে।
কিন্তু মুলারের কাছে বিষয়টি ছিল অনেক বেশি সাধারণ। তার ভাষায়, এটি কোনো যুগান্তকারী সাংবাদিকতা ছিল না; বরং দিনের একটি বাড়ির কাজ, যা ভালোভাবে শেষ করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে তিনি জানতেন, ইন্টারনেটে প্রকাশিত হওয়ায় বহু মানুষ সেটি দেখবে।
এক সপ্তাহ পরেই আইনি হুমকি
প্রতিবেদন প্রকাশের প্রায় দেড় সপ্তাহ পর মুলার অসুস্থ হয়ে বাড়িতে ছিলেন। তখন তার সাংবাদিকতা শিক্ষিকা এরিন স্নাইডারের ফোন আসে।
তিনি জানান, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা এক ব্যক্তি স্কুল জেলার বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছেন।
মডেলিং এজেন্ট ওই ব্যক্তি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ই-মেইল করে মুলারের প্রতিবেদনকে মানহানিকর বলে দাবি করেন। তিনি দ্রুত প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন।
স্কুল জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও শিক্ষার্থীদের সংবাদপত্রকে চাপ দেন—হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম বাদ দিতে হবে, নয়তো পুরো পাতাটি সরিয়ে ফেলতে হবে।
তখনও শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যায়নি
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে কারণ স্কুলের প্রধান শিক্ষক তখন দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে শিক্ষার্থী সম্পাদকদের নিজেদের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছিল।
দুপুরের খাবারের বিরতিতে তারা শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি আইন সহায়তা প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেন। পাশাপাশি মুলারের বাবা-মা, যারা দুজনই আইনজীবী, এবং আরও একজন আইনজীবীর পরামর্শ নেন।
সবাই নথিগুলো দেখে মনে করেন, প্রতিবেদনটি প্রকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অন্যায় করেনি।
এরপর সংবাদপত্রের সদস্যরা চার ঘণ্টা ধরে নিজেদের প্রতিবেদনের প্রতিটি শব্দ যাচাই করেন। সরকারি নথির সঙ্গে প্রতিটি তথ্য মিলিয়ে দেখেন। শেষ পর্যন্ত তারা বিতর্কিত পাতাটি সাময়িকভাবে আড়াল করার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে তারা স্পষ্ট করে দেন, এটি প্রশাসনের নির্দেশে নয়; নিজেদের সম্পাদকীয় ও নৈতিক বিবেচনা থেকেই তারা সাময়িকভাবে সেটি সরিয়েছেন।
প্রশাসনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক
কয়েক দিন পর মুলার ও তার সহকর্মী ম্যাডিসন বিশপ স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসেন।
প্রশাসনের মূল উদ্বেগ ছিল—প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা সত্য কি না।
মুলার তখন নিজের মুঠোফোন বের করে সেই নির্দিষ্ট সরকারি নথিটি দেখান। তিনি জানান, তথ্যটি কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব বা সাধারণ ইন্টারনেট অনুসন্ধান থেকে নেওয়া নয়; এটি সরাসরি সরকারি নথিতে রয়েছে।
এরপর শিক্ষার্থীরা ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত আইনের কথাও তুলে ধরে। তাদের বক্তব্য ছিল, কোনো লেখা অশ্লীল, সহিংসতা বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে উসকানিমূলক, মিথ্যা কিংবা মানহানিকর না হলে শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
প্রশাসনও পরে স্বীকার করে যে তথ্যটি সত্য এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নথিতে ছিল। পরদিন শিক্ষার্থীরা বিতর্কিত পাতাটি আবার প্রকাশ করে।

একটি প্রতিবেদন, আরেকটি বড় প্রশ্ন
ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়নি। সাংবাদিকতা শিক্ষিকা স্নাইডার কিছুদিন পর শিক্ষার্থী সাংবাদিকতা কর্মসূচি থেকে ছুটিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন। প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা মতবিরোধের মধ্যে এই ঘটনাকে তিনি চূড়ান্ত চাপগুলোর একটি হিসেবে দেখেছিলেন।
এর আগেও সংবাদপত্রটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ, শিক্ষার্থী আন্দোলন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির ছবি প্রকাশের পরও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করে।
স্নাইডারের বিদায় শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল আকস্মিক ও আবেগপূর্ণ ঘটনা। তবে তার বক্তব্য ছিল, বাস্তব বিষয় নিয়ে দায়িত্বশীলভাবে সাংবাদিকতা করা এবং তরুণ সাংবাদিকদের মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ—যদিও সেই কাজে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়।
‘আমরা ভুক্তভোগী নই’
ঘটনাটি পরে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে। কেউ এটিকে শিক্ষার্থী সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ হিসেবে দেখেছেন, কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর সংকটের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু মুলার ও তার সহপাঠীদের অবস্থান ছিল কিছুটা ভিন্ন।
তারা নিজেদের নিপীড়িত বা ভীত শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাননি। বরং তাদের মতে, ঘটনাটি অনেকাংশে একটি ভুল বোঝাবুঝি ছিল। তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেরাই ঠিক করেছেন যে বিতর্কিত পাতাটি পুনরায় প্রকাশ করা হবে।
মুলারের কাছে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত উত্তেজনাও কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল। তার মতে, স্কুলের কাজ, সাংবাদিকতার দায়িত্ব ও স্নাতক হওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে এই পুরোনো ঘটনা বারবার সামনে আসা ক্লান্তিকর ছিল।
কৈশোর পেরিয়ে সাংবাদিকতার ভবিষ্যতের পথে
জুনে মুলার ও বিশপ দুজনই উচ্চবিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন। বিশপ সাংবাদিকতা পড়তে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। মুলারও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্রে কাজ করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন।
একটি সাধারণ শ্রেণিকক্ষের বাড়ির কাজ থেকে শুরু হওয়া এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য বাস্তব সাংবাদিকতার এক কঠিন পাঠ হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো ইপস্টেইন নথির কোনো একটি তথ্য নয়। বরং এটি দেখিয়েছে, ডিজিটাল যুগে তরুণ সাংবাদিকরা শুধু সংবাদ পড়ে না—তারা নিজেরাও তথ্য খুঁজে বের করে, সরকারি নথি যাচাই করে, প্রকাশ করে এবং সেই প্রকাশনার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারে।
আর যখন সেই সাংবাদিকতা ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অস্বস্তিতে ফেলে, তখন একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষও হয়ে উঠতে পারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বড় পরীক্ষার মঞ্চ।
ইপস্টেইন নথি ঘেঁটে এক কিশোরের করা বাড়ির কাজ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু একটি স্কুলের প্রতিবেদন থাকেনি; এটি তরুণ সাংবাদিকতার সাহস, দায়িত্ব এবং স্বাধীনতার এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
যে তথ্যটি পাঠককে মনে রাখতে হবে: কোনো নথিতে কারও নাম বা কোনো দাবি থাকার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এই ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রতিবেদনের মূল বিতর্ক ছিল নথিতে তথ্যটি সত্যিই আছে কি না এবং সেটি প্রকাশ করা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার আওতায় পড়ে কি না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















