শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল পেরিয়ে বাস্তব পৃথিবীকে জানার অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের হাইল্যান্ড এলাকার লোন পিক উচ্চবিদ্যালয়ের চীনা ভাষার শিক্ষক অ্যালান হিথ ঠিক সেই বিশ্বাস থেকেই বছরের পর বছর ধরে তাঁর শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছেন। ভাষা শেখার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতি, মানুষের চিন্তাভাবনা এবং জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন তিনি।
হিথের শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেই চোখে পড়ে চীনা সংস্কৃতির নানা ছোঁয়া। দেয়ালে ঝুলছে কাগজ কেটে তৈরি ঐতিহ্যবাহী নকশা এবং তুলি দিয়ে লেখা চীনা ক্যালিগ্রাফি। দরজার পাশে বড় অক্ষরে লেখা, “শতভাগ চীনা ভাষায় কথা বলো।” প্রতিদিন ক্লাস শুরু হয় এক বিশেষ আচার দিয়ে। শিক্ষক সামনে এলে শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে দুই হাত জোড় করে মাথা নত করে অভিবাদন জানায়। শিক্ষকও একইভাবে তাদের অভিবাদনের জবাব দেন। চীনা ঐতিহ্যের এই সম্মানসূচক অভিবাদন তাদের কাছে শুধু একটি নিয়ম নয়, বরং অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করার একটি শিক্ষা।
হিথ মনে করেন, ভাষা শেখার আসল উদ্দেশ্য শুধু শব্দ মুখস্থ করা নয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি জাতির সংস্কৃতি, মানসিকতা এবং চিন্তার ধরনকে বোঝা। তাঁর মতে, মানুষ যখন অন্যের সংস্কৃতি বুঝতে শেখে, তখন ভাষাগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
মাত্র উনিশ বছর বয়সে চীনা ভাষা শেখা শুরু করেছিলেন হিথ। শুরুতে ভাষাটি তাঁর কাছে কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর ভালোবাসা। পরে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও চীনা ভাষা নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বাণিজ্য পরামর্শক এবং বংশতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থায় কাজ করার পর প্রায় পনেরো বছর আগে শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের সামনে একটি বৃহত্তর পৃথিবী উন্মুক্ত করা সম্ভব।
সেই লক্ষ্য থেকেই চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি ৩২ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে দুই সপ্তাহের জন্য চীন সফরে যান। বেইজিং, হেনান প্রদেশের ঝেংঝৌ ও কাইফেং এবং শানসি প্রদেশের সিয়ান শহর ছিল তাদের সফরের গন্তব্য। এই সফর সম্ভব হয়েছে চীনের ‘যুব দূত বৃত্তি’ কর্মসূচির মাধ্যমে, যার উদ্দেশ্য পাঁচ বছরে ৫০ হাজার মার্কিন তরুণকে চীনে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া।

শিক্ষার্থী কেনেডি প্যাক জানান, ছয় বছর বয়স থেকে তিনি চীনা ভাষা শিখছেন। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে পড়া বিষয়গুলো বাস্তবে নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। বেইজিংয়ের ব্যস্ত সড়ক, চীনের মহাপ্রাচীর, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চীনা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ এবং সিয়ানের বিখ্যাত টেরাকোটা যোদ্ধাদের সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
আরেক শিক্ষার্থী ড্যামিয়ান ল্যামবার্টের মতে, শ্রেণিকক্ষে শেখা ভাষাজ্ঞান এই সফরকে সাধারণ ভ্রমণের চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ করে তুলেছিল। ভাষা জানার কারণে তিনি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পেরেছেন, তাদের জীবন সম্পর্কে জানতে পেরেছেন এবং প্রকৃত সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
হিথের শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে কথোপকথন। তিনি মনে করেন, শুধু শব্দ মুখস্থ করলে একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে থাকে। বাক্য শেখা তাকে কিছুটা এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত দক্ষতা আসে তখনই, যখন মানুষ অনর্গল অনুচ্ছেদ আকারে নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে পারে। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং চিন্তা, অনুভূতি এবং ধারণা বিনিময়ের একটি সেতু।
আজকের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বিশ্বে এই ধরনের শিক্ষামূলক বিনিময় কর্মসূচি শুধু ভাষা শিক্ষা নয়, বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহমর্মিতা এবং সাংস্কৃতিক সম্মান গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অ্যালান হিথের মতো শিক্ষকদের উদ্যোগ দেখিয়ে দেয়, কখনও কখনও একটি শ্রেণিকক্ষ থেকেই দুই দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















