দিল্লির অভিজাত মহলে বিলাসবহুল বাড়ি ও সম্পত্তি কেনার স্বপ্নকে পুঁজি করে বড় ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দাবি, মোহিত গোগিয়া নামের এক ব্যবসায়ী ভুয়া নথি, জাল ব্যাংক কাগজপত্র এবং কথিত ব্যাংক নিলামের গল্প সাজিয়ে দিল্লি ও গুরুগ্রামের অত্যন্ত দামি সম্পত্তি বিক্রির নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তদন্তকারীদের হিসাবে, এই প্রতারণার পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি রুপি হতে পারে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতারিত ব্যক্তিরা সাধারণ ক্রেতা নন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অভিজ্ঞ আবাসন ব্যবসায়ী, ধনী পরিবার ও সম্পত্তি বিনিয়োগে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা। বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প, অভিজাত বাংলো এবং ব্যাংকের জব্দ করা সম্পত্তি কম দামে পাওয়ার সুযোগ দেখিয়েই তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
লুটিয়েন্স দিল্লির ৯ নম্বর বাংলো ঘিরে বড় প্রতারণা
দিল্লির আমৃতা শেরগিল মার্গের ৯ নম্বর বাংলো রাজধানীর অন্যতম অভিজাত ঠিকানা। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, বিভিন্ন দূতাবাস ও সংসদ ভবনের কাছাকাছি এই এলাকার কোনো বাড়ি সাধারণত বিক্রির জন্য বাজারে আসে না। সেই দুর্লভতার সুযোগই নিয়েছিলেন গোগিয়া বলে পুলিশের অভিযোগ।
পুলিশের কাছে দেওয়া অভিযোগে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী সোনাক্ষী বনসাল দাবি করেন, গোগিয়া তাঁকে জানান, বাংলোটি ভারতীয় স্টেট ব্যাংক ঋণখেলাপির সম্পত্তি হিসেবে জব্দ করেছে এবং ব্যাংকের নিলামের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ কোটি রুপিতে সেটি কেনা সম্ভব।
বনসালের পরিবার সরেজমিনে সম্পত্তিটি দেখতেও যায়। সেখানে ৯ ও ৯এ—দুটি পাশাপাশি বাংলো দেখতে পেয়ে গোগিয়া দাবি করেন, দুটিই একসঙ্গে পাওয়া যাবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, সাধারণ বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে ব্যাংকের নিলাম থেকে সম্পত্তি দুটি কেনার ব্যবস্থা তিনি করতে পারবেন।
কিন্তু তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ভারতীয় স্টেট ব্যাংক কখনোই ওই বাংলো নিলামে তোলেনি। পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, ব্যাংক জানিয়েছে, সম্পত্তিটি তৃতীয় পক্ষের একটি ঋণের জামানত হিসেবে বন্ধক রাখা হয়েছিল, কিন্তু নিলামের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়নি।
৭৫ কোটির সম্পত্তির জন্য ৪৩ কোটি পরিশোধ
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে বনসাল ৭৫ কোটি রুপির মধ্যে প্রায় ৪৩ কোটি রুপি গোগিয়াকে দিয়ে ফেলেছিলেন। বাকি অর্থের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্থাও করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এর পাশাপাশি বনসালের আত্মীয় ও ব্যবসায়িক অংশীদার মৃণাল মিত্তালের কাছে গুরুগ্রামের সেক্টর ৬৩-এর একটি জমি ৬০ কোটি রুপিতে বিক্রির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
পুলিশের মতে, দুটি লেনদেন মিলিয়ে প্রায় ১৩৫ কোটি রুপির অর্থের বিষয়টি সামনে এসেছে। তদন্তাধীন মামলাগুলোর মধ্যে এটিই অন্যতম বড় লেনদেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একের পর এক অজুহাত, শেষ পর্যন্ত ভুয়া কাগজ ও চেক
টাকা নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। প্রথমে আয়কর বিভাগের অভিযানকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়। পরে মার্চ ২০২৫-এর মধ্যে সম্পত্তির দখল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিন্তু সেই সময়ও পার হয়ে গেলে নতুন অজুহাত সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পত্তির ওপর আরও ১ কোটি ৩০ লাখ রুপির বন্ধক রয়েছে বলে জানিয়ে সেটি ছাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়।
এরপর গোগিয়া সম্পত্তির কাগজপত্র ও বাড়ির চাবি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। কিন্তু বাস্তবে সম্পত্তির দখল মেলেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হলে তিনি আগের দেওয়া অর্থ ফেরতের জন্য পরবর্তী তারিখের চেক দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই চেকও বাউন্স করে।
এরপর ২০২৫ সালের জুনে পরিবারটি দিল্লি পুলিশের দ্বারস্থ হয়। পরে মামলাটি অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দামি গাড়ি, বিলাসী জীবন আর বিশ্বাসযোগ্যতার অভিনয়
পুলিশের দাবি, গোগিয়া শুধু কাগজপত্রের ওপর নির্ভর করেননি। তিনি এমন একটি বিলাসী জীবনযাপন করতেন, যা সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে তাঁর আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক পরিচয়কে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলত।
তদন্তে উঠে এসেছে, দিল্লির অভিজাত এলাকায় তাঁর বিলাসবহুল বাসস্থান ছিল এবং তাঁর সংগ্রহে ছিল দামি গাড়ি। তিনি দিল্লিতে বিলাসবহুল সৌন্দর্যসেবা প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে তিনি সোনাক্ষী বনসালের প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজেকে আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন। তাঁর স্ত্রী শ্বেতা গোগিয়ার সঙ্গে তিনি একটি অর্থায়ন ও ইজারা ব্যবসা পরিচালনা করেন বলেও জানান।
এমনকি ব্যাংকের জব্দ করা সম্পত্তি বিক্রির জন্য তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিশেষ অনুমোদন রয়েছে—এমন দাবিও করেছিলেন বলে অভিযোগ।
গুরুগ্রামের বিলাসবহুল আবাসনও ছিল প্রতারণার ফাঁদ
গোগিয়ার বিরুদ্ধে শুধু লুটিয়েন্স দিল্লির বাংলো বিক্রির অভিযোগ নেই। গুরুগ্রামের অত্যন্ত দামি আবাসন প্রকল্পগুলোর নাম ব্যবহার করেও তিনি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ব্রাহ্ম সিং তানওয়ার ২০২৪ সালের মে মাসে গোগিয়ার সঙ্গে পরিচিত হন। প্রথমে দামি গাড়ি কেনাবেচার সূত্রে পরিচয় হলেও পরে গোগিয়া তাঁকে গুরুগ্রামের একটি জমি এবং ডিএলএফ ম্যাগনোলিয়াসের একটি ফ্ল্যাট বিক্রির প্রস্তাব দেন।
ফ্ল্যাটটির দাম ৩১ কোটি রুপি বলা হয়েছিল। অথচ ওই এলাকার একটি ফ্ল্যাটের প্রকৃত বাজারমূল্য ৪২ থেকে ৮৫ কোটি রুপি পর্যন্ত হতে পারে। ফলে তুলনামূলক কম দামটি ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
তানওয়ারের দাবি, গোগিয়ার দেওয়া কাগজপত্র অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। ব্যাংকের প্যাড, কথিত ব্যাংক অনুমোদন এবং এমনকি বারকোডও ছিল, যা স্ক্যান করলে ব্যাংকের আসল ওয়েবসাইটের মতো একটি পেজ দেখা যেত বলে তিনি জানান।
আরেক নারী অভিযোগ করেন, গুরুগ্রামের অতি বিলাসবহুল ডিএলএফ ক্যামেলিয়াসে একটি অ্যাপার্টমেন্ট দেওয়ার কথা বলে গোগিয়া তাঁর কাছ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ রুপি নিয়েছিলেন।
এমনকি ১৮০ কোটি রুপিতে অ্যাম্বিয়েন্স মল বিক্রির চেষ্টাও
তদন্তে আরও বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, গোগিয়া একসময় গুরুগ্রামের অ্যাম্বিয়েন্স মলও প্রায় ১৮০ কোটি রুপিতে বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ী অভিনব পাঠককেও তিনি মলটি কেনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কথিতভাবে গোগিয়া দাবি করেছিলেন, তিনি মলটি ৫০০ কোটি রুপিতে কিনছেন এবং পাঠক এতে অংশীদার হতে পারবেন।
পুলিশের এক কর্মকর্তার ভাষায়, দিল্লির সবচেয়ে ধনী পরিবার এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীদেরও একজন কলেজছুট ব্যক্তির কথায় প্রতারিত হওয়ার ঘটনা তদন্তকারীদের কাছে অত্যন্ত অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
তদন্তে সামনে এসেছে অন্তত ১২টি মামলা
দিল্লি পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা গোগিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা তদন্ত করছে। পুলিশ জানিয়েছে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১২টি অভিযোগ বা মামলা সামনে এসেছে।
গত কয়েক মাসে গোগিয়াসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী শ্বেতা এবং ব্যবসায়ী অভিনব পাঠকের নামও রয়েছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
তবে তদন্ত এখানেই থেমে নেই। পশ্চিম দিল্লির অর্থায়ন ব্যবসায়ী রাম সিংয়ের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে। পুলিশ তাঁকে এই চক্রের সম্ভাব্য মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সন্দেহ করছে।
কীভাবে চলত প্রতারণার কথিত কৌশল
তদন্তে পুলিশের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, গোগিয়া ব্যাংকের প্রকাশ্য নথি থেকে জব্দ বা বন্ধক রাখা সম্পত্তির তথ্য সংগ্রহ করতেন। এরপর সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজে তাঁদের কাছে সম্পত্তি কম দামে পাওয়ার সুযোগ তুলে ধরতেন।
ভুয়া নথি তৈরি, ব্যাংকের নামে বিশ্বাসযোগ্য কাগজপত্র প্রস্তুত এবং কথিত ব্যাংক নিলামের গল্প সাজানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অর্থ গ্রহণের জন্য অন্য ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের ব্যবস্থাও করা হতো বলে তদন্তকারীদের দাবি।
গোগিয়ার কথিত জবানবন্দি অনুযায়ী, কোনো ভুক্তভোগী পুলিশে অভিযোগ করলে অন্য একজন নতুন ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে আগের ব্যক্তিকে টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে আসা টাকা দিয়ে পুরোনো অভিযোগ সাময়িকভাবে সামলানোর একটি চক্র তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
আয়কর অভিযানেই কি ভেঙে পড়ে পুরো ব্যবস্থা?
পুলিশের দাবি, ২০২৪ সালের আয়কর বিভাগের অভিযানের পর এই কথিত প্রতারণা চক্রে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। গোগিয়াকে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি রুপি বকেয়া পরিশোধ করতে হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এরপর একের পর এক বিনিয়োগকারী টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। অভিযোগ ও ফৌজদারি মামলা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে গোগিয়ার তৈরি করা বিলাসবহুল ব্যবসায়িক ভাবমূর্তির আড়ালের বাস্তবতা সামনে আসতে শুরু করে বলে পুলিশ মনে করছে।
গোগিয়াকে এর আগেও পাঞ্জাবের জিরাকপুরে ১৮১ একর জমি নিয়ে কথিত প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে আবার গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তিনি আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।
পুরোনো ঠিকানায় এখন শুধু নীরবতা
গোগিয়ার শেষ জানা ঠিকানা ছিল দিল্লির রাজেন্দ্র নগরের ৬-বি নম্বর বাড়ি। আমৃতা শেরগিল মার্গের বিতর্কিত বাংলো থেকে এটি প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে।
একসময় দামি গাড়ির আনাগোনা, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে ওঠাবসায় পরিচিত সেই বাড়িতে এখন তাঁর নাম শুনে অনেকেই যেন ভুলে গেছেন তাঁকে।
একজন প্রতিবেশী প্রথমে গোগিয়ার নাম শুনে চিনতে পারেননি। পরে নিরাপত্তাকর্মীর কাছে জানতে চেয়েছেন, আদৌ এই নামে কেউ সেখানে থাকতেন কি না।
অভিযোগের তদন্ত এগিয়ে চললেও ঘটনাটি একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—শুধু বিলাসবহুল জীবনযাপন, দামি গাড়ি কিংবা ব্যাংকের মতো দেখতে কাগজপত্র দেখলেই কি একজন সম্পত্তি ব্যবসায়ীকে বিশ্বাস করা যায়?
দিল্লির এই কথিত প্রতারণা দেখিয়ে দিয়েছে, সম্পত্তির দাম যত বেশি হয়, প্রতারণার ঝুঁকিও কখনো কখনো তত বেশি হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকের নিলাম, বন্ধক রাখা সম্পত্তি কিংবা বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামের প্রস্তাব সামনে এলে স্বাধীনভাবে নথি যাচাই না করে বিপুল অর্থ পরিশোধ করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এই ঘটনাই তার বড় উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















