ভারতের লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে তামিলনাড়ুতে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। প্রস্তাবিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিলের বিরুদ্ধে সরব হয়ে তামিলনাড়ু কংগ্রেসের সভাপতি বি. মানিক্কম ঠাকোর বলেছেন, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অর্থে কোনো ‘ন্যায্য পুনর্নির্ধারণ’ সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, পুরো উদ্যোগটিই একটি প্রতারণা এবং এর মাধ্যমে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ও আর্থিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রোববার চেন্নাইয়ের মেদাভাক্কামে বিলের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক প্রতিবাদ মিছিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে ঠাকোর রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পরিবর্তনেরও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, কয়েক মাসের ব্যবধানেই কিছু রাজনৈতিক দল সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিরোধিতা থেকে সরে এসে এখন ‘ন্যায্য পুনর্নির্ধারণের’ কথা বলছে। তাঁর প্রশ্ন, যে প্রক্রিয়াকেই তাঁরা আগে অন্যায্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, সেটি হঠাৎ কীভাবে ন্যায্য হয়ে গেল?
আসন বাড়লেও বাড়বে বৈষম্য
ঠাকোরের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে তামিলনাড়ু ও উত্তরপ্রদেশের লোকসভা আসনের সম্ভাব্য পরিবর্তন। তিনি বলেন, তামিলনাড়ুর আসন ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৯ থেকে ৬০ করা হলেও একই হারে উত্তরপ্রদেশের আসন ৮০ থেকে ১২০ করা হলে দুই রাজ্যের মধ্যে আসনের ব্যবধান আরও বড় হবে।
তাঁর ভাষায়, সংখ্যার হিসাবে তামিলনাড়ুর আসন বাড়লেও সেটি প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য রক্ষা করবে না। বরং জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করা হলে যেসব রাজ্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে, তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

ঠাকোর অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার তামিলনাড়ুকে তার প্রাপ্য আর্থিক অংশ ও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প থেকে বঞ্চিত করছে। তাঁর দাবি, তামিলনাড়ুর ৩৯ জন সংসদ সদস্য ইতিমধ্যে এ বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নিয়েছেন এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
‘তামিলনাড়ুর কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে যাবে’
কংগ্রেসের রাজ্যসভা সদস্য প্রবীণ চক্রবর্তীও বিলটির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সীমানা পুনর্নির্ধারণ হলে তামিলনাড়ুর অধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। সংসদে রাজ্যটির কণ্ঠস্বরও দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
চক্রবর্তীর দাবি, তামিলনাড়ু ও উত্তরপ্রদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের বর্তমান অনুপাত অক্ষুণ্ন রাখা উচিত। কিন্তু বিজেপি উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তাঁর যুক্তি, তামিলনাড়ুর আসন যদি ২০টি বাড়ানো হয়, অথচ উত্তরপ্রদেশের আসন ৪০টি বাড়ানো হয়, তাহলে কাগজে-কলমে উভয় রাজ্যের আসনই বাড়বে, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য আরও উত্তর ভারতের দিকে চলে যাবে।
সর্বদলীয় বিরোধিতার আহ্বান
চক্রবর্তী তামিলনাড়ুর সব রাজনৈতিক দলকে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর সতর্কবার্তা, কোনো দল যদি এই বিলের বিরোধিতা না করে, তাহলে সেটি তামিলনাড়ুর মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।
এই বিতর্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়েছে শনিবারের এক বৈঠককে ঘিরে। মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয়ের সভাপতিত্বে তামিলনাড়ুর সংসদ সদস্যদের নিয়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও দ্রাবিড় মুনেত্র কড়গম, এআইএডিএমকে এবং তাদের মিত্ররা ওই বৈঠক থেকে দূরে ছিল বলে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
দক্ষিণ ভারতের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন
সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিতর্ক এখন শুধু একটি বিলের বিরোধিতা বা সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্যের রাজনৈতিক মূল্য এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন।
তামিলনাড়ু কংগ্রেসের নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, তারা এমন কোনো পুনর্বিন্যাস মেনে নিতে প্রস্তুত নন, যার ফলে দক্ষিণ ভারতের তুলনামূলকভাবে কম জনসংখ্যা বৃদ্ধির রাজ্যগুলো সংসদে তাদের বর্তমান প্রভাব হারায়। অন্যদিকে, আসন পুনর্বিন্যাসের পক্ষে থাকা পক্ষগুলোর যুক্তি হলো, জনসংখ্যার পরিবর্তনের সঙ্গে সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের সামঞ্জস্য তৈরি করাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ফলে সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক প্রতিবাদ আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ‘ন্যায্য পুনর্নির্ধারণ’ আসলে কী এবং তার মানদণ্ড কী হবে—এই প্রশ্নই এখন দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে কেন্দ্রীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
সীমানা পুনর্নির্ধারণের এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত ভারতের সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের কাঠামো, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্যে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সীমানা পুনর্নির্ধারণে তামিলনাড়ুর আপত্তির মূল প্রশ্ন তাই একটাই—আসন বাড়লেই কি প্রতিনিধিত্বের ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়, নাকি সংখ্যার আড়ালে বদলে যেতে পারে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















