দিল্লিতে দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ ভর্তুকির চাল কেনা ও বিক্রি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আম আদমি পার্টি অভিযোগ করেছে, দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ বিপুল পরিমাণ চাল একটি কথিত চক্রের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি অভিযোগ তুলেছে, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আমলে দিল্লিতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছিল।
রোববার দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে দিল্লির রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আম আদমি পার্টির দিল্লি শাখার সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ দাবি করেন, কথিত চালের এই কারবারে তিন বছরে প্রায় ২২ হাজার কোটি রুপির চাল জড়িত থাকতে পারে। তবে দিল্লি সরকারের খাদ্য সরবরাহমন্ত্রী মঞ্জিন্দর সিং সিরসা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
৩১ হাজার টন চাল নিয়ে অভিযোগ
সৌরভ ভরদ্বাজের দাবি, খাদ্য সরবরাহ দপ্তরের সুপারিশের ভিত্তিতে ভারতের খাদ্য করপোরেশন প্রতি সপ্তাহে ৩১ হাজার টন উচ্চমাত্রায় ভর্তুকি দেওয়া চাল আসামের একটি কৃষিপণ্য বিপণন সংস্থাকে সরবরাহে সম্মত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দিল্লির দরিদ্র মানুষের মধ্যে সেই চাল বিতরণ করা।
কিন্তু আম আদমি পার্টির অভিযোগ, ওই সংস্থা চালগুলো দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ না করে হরিয়ানার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেছে। ভরদ্বাজের হিসাব অনুযায়ী, এর মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৭০ থেকে ৭১ কোটি রুপি কমিশন তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
তার দাবি, একইভাবে তিন বছর চাল বিক্রি হলে মোট চালের মূল্য প্রায় ২২ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছাতে পারে এবং কমিশনের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ১১ হাজার কোটি রুপি।
কেন্দ্রীয় নজরদারি সংস্থার তদন্তের দাবি
ভরদ্বাজ আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নজরদারি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে কথিত এই চক্রের সন্ধান পেয়েছেন এবং একজন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তও করা হয়েছে। কিন্তু দিল্লি সরকার বিষয়টি নিয়ে নীরব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এই ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার কাছে খাদ্য সরবরাহমন্ত্রী মঞ্জিন্দর সিং সিরসার পদত্যাগ দাবি করেন আম আদমি পার্টির দিল্লি প্রধান। একই সঙ্গে কথিত অনিয়মের জন্য দায় নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় সামনে আসেনি। ফলে আম আদমি পার্টির উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
‘অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে আদালতে যাব’
আম আদমি পার্টির অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন মঞ্জিন্দর সিং সিরসা। তিনি অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা’, ‘মনগড়া’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন।
সিরসা আম আদমি পার্টির নেতাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগ প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার সময়সীমা দিয়েছেন। তা না হলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তার বক্তব্য, তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করা এবং তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, অভিযোগকারীদের সঙ্গে প্রয়োজনে আদালতেই দেখা হবে।
কেজরিওয়াল সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির পাল্টা আক্রমণ

চালের অভিযোগের জবাবে বিজেপিও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এনেছে।
দিল্লি সরকার জানিয়েছে, গত ১৮ মাসে নিয়ন্ত্রক ও মহাহিসাব নিরীক্ষকের ২৪টি প্রতিবেদন পেয়েছে তারা। সরকারের দাবি, এসব প্রতিবেদনে আম আদমি পার্টির দীর্ঘ ১১ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার কোটি রুপির আর্থিক অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে।
দিল্লির গণপূর্তমন্ত্রী পারভেশ সাহিব সিং একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরে অভিযোগ করেন, কেজরিওয়াল সরকার বিভিন্ন নিয়ম উপেক্ষা করে ১ হাজার ১৮৫টি দরপত্র হাতে-কলমে প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করেছিল। বিভিন্ন দরপত্রে সালিশি-সংক্রান্ত ধারা যুক্ত করার কারণেও বড় ধরনের অনিয়ম এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
৭০ হাজার কোটি রুপির বেশি কর বকেয়ার দাবি
বিজেপির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, কয়েকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৭০ হাজার ৪১০ কোটি রুপি কর রাজস্ব বকেয়া ছিল। অভিযোগ করা হয়েছে, কর বিভাগের কিছু কর্মকর্তা এবং কয়েকজন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীর যোগসাজশে এই বিপুল বকেয়া দীর্ঘদিন আদায় না করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিজেপি আরও দাবি করেছে, প্রায় ৬৮ হাজার ৬৮০ কোটি রুপির কথিত ভুয়া পণ্য পরিবহন চালান তৈরি করা হয়েছিল।

ফলে দিল্লিতে এখন মূল বিতর্ক শুধু কথিত চাল কেলেঙ্কারিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। পুরনো সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের জবাবদিহি—সবকিছুই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
অভিযোগের পাল্টা অভিযোগে উত্তপ্ত দিল্লি
একদিকে আম আদমি পার্টি দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ ভর্তুকির চালের কথিত অপব্যবহারের তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি করছে। অন্যদিকে বিজেপি সাবেক সরকারের আমলের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে পাল্টা দুর্নীতির অভিযোগ করছে।
দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সরকারি নথি ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করছে। তবে চাল সরবরাহ নিয়ে আম আদমি পার্টির উত্থাপিত অভিযোগ এবং বিজেপির পাল্টা অভিযোগ—দুটিরই চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে বিস্তারিত তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথির যাচাই প্রয়োজন।
দিল্লির রাজনীতিতে এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে ২২ হাজার কোটি রুপির কথিত চাল বেচাকেনা এবং হাজার হাজার কোটি রুপির আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে তদন্ত এগোলে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দিল্লির মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্যশস্যের ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















