প্রকৃতির শিকারি প্রাণীকে অনেক সময় মানুষের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের অলিম্পিক উপদ্বীপে নতুন এক গবেষণা দেখিয়েছে, পাহাড়ি সিংহ বা কুগারের উপস্থিতি উল্টো মানুষের জীবন ও অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় পাহাড়ি সিংহের বিচরণ বেশি, সেখানে হরিণের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষ ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জীববিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজিতে। গবেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ পাহাড়ি সিংহের শিকার করে হরিণের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং সিংহের ভয় হরিণের আচরণ বদলে দেয়। শিকারির উপস্থিতি টের পেয়ে হরিণ রাস্তা, জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও মানুষের চলাচল বেশি এমন জায়গা এড়িয়ে চলে। একই সঙ্গে রাতে তাদের চলাচলও কমে যায়।
শিকারির ভয় বদলে দেয় হরিণের জীবনযাপন
গবেষণাটির প্রধান লেখক জাস্টিন সুরাসি বলেন, বড় শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি একটি এলাকার প্রাণীদের আচরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। পাহাড়ি সিংহের ভয় হরিণকে রাস্তা ও উন্নত জনবসতি থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করে। এর ফলে মানুষের সঙ্গে হরিণের সংঘর্ষের সম্ভাবনাও কমে যায়।
গবেষকরা ৫০৩টি ক্যামেরা ফাঁদ এবং গলায় পর্যবেক্ষণ যন্ত্র লাগানো ৫৯টি পাহাড়ি সিংহের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে বন্য বিড়াল সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা প্যানথেরার উদ্যোগে, স্থানীয় কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও জাতির অংশীদারত্বে।
গবেষণার তথ্য বলছে, পাহাড়ি সিংহের বিচরণ রয়েছে এমন এলাকায় হরিণ দিনের বেলায় তুলনামূলক বেশি সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে তারা বেশি সড়কঘন এলাকা এড়িয়ে চলে এবং জনবসতি থেকে দূরের দুর্গম এলাকায় থাকার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়।
পাঁচ বছরে ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে সংঘর্ষ
গবেষকরা অলিম্পিক উপদ্বীপকে পাঁচ কিলোমিটার বাই পাঁচ কিলোমিটার আয়তনের বিভিন্ন অংশে ভাগ করে সেসব এলাকার প্রাণীর চলাচলের তথ্যের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষের তথ্য মিলিয়ে দেখেন।
২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাহাড়ি সিংহের উপস্থিতি বেশি এমন এলাকায় হরিণের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষ সর্বোচ্চ ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিল।
অলিম্পিক উপদ্বীপে যানবাহনের চাপ তুলনামূলক কম হলেও হরিণ, এল্কসহ বড় খুরওয়ালা প্রাণীর সঙ্গে গাড়ির সংঘর্ষের কারণে মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কম নয়। ওই পাঁচ বছরে এসব সংঘর্ষে দুইজন মানুষের মৃত্যু, ৮০ জনের বেশি আহত হওয়ার ঘটনা এবং চিকিৎসা ব্যয় ও যানবাহন মেরামত মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
তবে পাহাড়ি সিংহ না থাকলে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা বাড়ত, তা এখনো নির্দিষ্ট করে হিসাব করতে পারেননি গবেষকরা। গবেষকদের ধারণা, পাহাড়ি সিংহ সম্পূর্ণভাবে না থাকলে মানুষের মৃত্যু, আহত হওয়ার ঘটনা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারত।
শুধু শিকারি নয়, প্রকৃতির এক ধরনের নিরাপত্তাবলয়
গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক এবং প্যানথেরার পুমা কর্মসূচির পরিচালক মার্ক এলব্রক মনে করেন, এই গবেষণা পাহাড়ি সিংহ সংরক্ষণের গুরুত্ব নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর এক হাজারেরও বেশি পাহাড়ি সিংহ গবাদিপশুর ওপর হামলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি বন্যপ্রাণী কর্মকর্তাদের হাতে মারা যায়। ফলে মানুষের সঙ্গে কুগারের সহাবস্থান কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণের মূল্য শুধু প্রাণী রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি বড় শিকারি প্রাণী একটি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করার পাশাপাশি মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপরও পরোক্ষ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রকৃতির অর্থনৈতিক মূল্যও আছে
গবেষণাটির প্রধান লেখক জাস্টিন সুরাসির মতে, কোনো প্রাণী গবাদিপশু হত্যা করলে তার আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়। কিন্তু সেই প্রাণী মানুষের জন্য যে পরোক্ষ সুবিধা তৈরি করে, তার অর্থনৈতিক মূল্য অনেক সময় হিসাবের মধ্যে আসে না।
তিনি মনে করেন, প্রকৃতির এসব সুবিধার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পক্ষে মানুষের সমর্থন আরও বাড়তে পারে।
তবে গবেষকরা একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, পাহাড়ি সিংহের গুরুত্ব কেবল মানুষের জন্য তারা কী সুবিধা তৈরি করে তার ওপর নির্ভর করে না। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব অস্তিত্বগত মূল্য রয়েছে। অর্থনৈতিক সুবিধা তুলে ধরা সেই সংরক্ষণমূল্যকে প্রতিস্থাপন করে না; বরং সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে আরও একটি শক্তিশালী যুক্তি যোগ করে।
প্রকৃতির এই গবেষণা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—সব বড় শিকারি প্রাণী মানুষের শত্রু নয়। অনেক সময় তাদের উপস্থিতিই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে এবং একই সঙ্গে মানুষকে সড়ক দুর্ঘটনা, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও প্রাণহানির মতো ঝুঁকি থেকেও পরোক্ষভাবে রক্ষা করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















