চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার পারমাণবিক অস্ত্রের ভূমিকা বাড়ানোর কথা ভাবছে। এ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তিন দশকের বেশি সময় আগে প্রত্যাহার করা মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র কি আবারও কোরীয় উপদ্বীপে ফিরতে পারে?
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতিতে এই পরিবর্তনের অর্থ সরাসরি দক্ষিণ কোরিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র ফিরিয়ে আনা নয়। বরং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত সামরিক শক্তির মধ্যে সমন্বয় আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে।
নতুন পারমাণবিক কৌশল নিয়ে আলোচনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর নতুন একটি পারমাণবিক কৌশল নিয়ে কাজ করছে। এতে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক উপমন্ত্রী এলব্রিজ কলবি। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—বিশ্বাসযোগ্য পারমাণবিক বিকল্প থাকা প্রয়োজন।
এই নীতিগত পরিবর্তন দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কারণে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র পুনরায় মোতায়েন অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যাটোর আদলে পারমাণবিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার দাবি উঠছে।
১৯৯১ সালে অস্ত্র প্রত্যাহার

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯১ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সব কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র সরিয়ে নেয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বিশ্বজুড়ে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেন।
এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রো তে উ কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ধারাবাহিকতায় সিউল ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাও হয়েছিল।
কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ক্রমাগত শক্তিশালী হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি আবারও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় অস্ত্র রাখার ঝুঁকি
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির আইনপ্রণেতা ইউ ইয়ং-ওন মনে করেন, দেশটিতে মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্র পুনরায় মোতায়েন হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তার যুক্তি, দক্ষিণ কোরিয়ার ভৌগোলিক আয়তন তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় সেখানে রাখা পারমাণবিক অস্ত্র উত্তর কোরিয়ার হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, এমন অস্ত্র মোতায়েন করা হলে সেগুলো বাস্তবে বিমানঘাঁটিতে সংরক্ষণ করতে হবে। উত্তর কোরিয়া এসব অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারলে সম্ভাব্য সংঘাতের সময় ওই ঘাঁটিগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।
তবে সামরিক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের মতে, সামনে থেকে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করলে ঝুঁকি থাকলেও এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এতে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে—এই বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে এবং তা প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পারে।
জাপান বা গুয়াম থেকেও ব্যবহার সম্ভব
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলকে সরাসরি দক্ষিণ কোরিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্র ফেরানোর সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রকে সম্প্রসারিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার আরও বিশ্বাসযোগ্য অংশে পরিণত করতে পারে, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে এসব অস্ত্র রাখার প্রয়োজনীয়তার যুক্তিই বরং দুর্বল হতে পারে।
তিনি বলেন, কৌশলগতভাবে বড় পারমাণবিক অস্ত্রের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হয়। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এগুলোর সরাসরি সমন্বয়ের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র কোরীয় উপদ্বীপের কাছাকাছি অঞ্চল, যেমন জাপান বা গুয়াম থেকে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সক্ষমতার সমন্বয় কীভাবে করা হবে, সেই প্রশ্ন আরও বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিরোধ বাড়লেও বাড়তে পারে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। সামরিক সংশ্লিষ্ট এক সূত্র কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভর করাকে ‘দুই ধারী তলোয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তার মতে, একদিকে এটি শত্রুপক্ষকে নিবৃত্ত করার ক্ষমতা স্পষ্টভাবে বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত সহজে ব্যবহারযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি পারমাণবিক যুদ্ধ শুরুর সীমারেখা নিচে নামিয়ে দিতে পারে।
ভুল হিসাব, ভুল বোঝাবুঝি বা সংকটের সময় কোনো পক্ষের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সীমিত আকারের পারমাণবিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কাও তখন বাড়তে পারে।
হং মিন সতর্ক করে বলেন, উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষাকৃত সহজে ব্যবহারযোগ্য পারমাণবিক সক্ষমতাকে শুধু মার্কিন কৌশলগত শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখবে না। পিয়ংইয়ং এটিকে তাদের শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে।
এর ফলে উত্তর কোরিয়া আরও বেশি পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে হামলার শিকার হওয়ার আগেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে—এমন ধারণাও তাদের মধ্যে আরও শক্তিশালী হতে পারে।
উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় বাড়তে পারে নিরাপত্তা সংকট
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় উত্তর কোরিয়া ও চীনও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পথে যেতে পারে। এতে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি হয় সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা, সেই উদ্যোগই উল্টো প্রতিপক্ষের মধ্যে আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে। সংকটের মুহূর্তে ভুল হিসাব বা ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তখন আরও বেড়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পারমাণবিক কৌশল দক্ষিণ কোরিয়ায় সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি করছে—এমনটা এখনই বলার সুযোগ নেই। বরং পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তি ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়। তবে সেই সমন্বয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কোরীয় উপদ্বীপে নতুন ধরনের পারমাণবিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















