দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং সরকারের প্রস্তাবিত ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাবের সংস্কার এবং ইচ্ছাকৃতভাবে শেয়ারের দাম কমিয়ে রাখার বিরুদ্ধে নেওয়া করব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ৩ আগস্ট সরকার কর সংস্কারের পরিকল্পনা প্রকাশ করার মাত্র চার দিন পর, শুক্রবার এই নির্দেশ আসে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল দেশের পুঁজিবাজারে আরও বেশি অর্থ প্রবাহিত করা। কিন্তু প্রস্তাবের কিছু দিক নিয়ে বিনিয়োগকারী ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠার পর প্রেসিডেন্ট পুরো বিষয়টি আবারও খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।
পুরোনো সঞ্চয় হিসাবের সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা
ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাব দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এই হিসাবের মাধ্যমে সুদ ও লভ্যাংশ থেকে পাওয়া আয়ে কর ছাড় পাওয়া যায়। বর্তমানে বিনিয়োগ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ওন পর্যন্ত আয় করমুক্ত। এর বেশি আয় হলে তা আলাদা করে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ হারে করযোগ্য হয়।
দেশীয় পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নতুন ধরনের ‘উৎপাদনশীল অর্থায়নভিত্তিক ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাব’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া পুরো আয় করমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য কোনো সর্বোচ্চ করমুক্ত সীমাও থাকবে না।
![EXPLAINER] Why Lee ordered rethink of ISA and 'stock price suppression' rules - The Korea Times](https://newsimg.koreatimes.co.kr/2026/08/09/6c29b462-3855-44db-ad5b-860449afbd29.jpg)
প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন বিনিয়োগকারী বছরে সর্বোচ্চ ২ কোটি ওন এবং সর্বমোট ২০ কোটি ওন পর্যন্ত অর্থ জমা রাখতে পারবেন। হিসাবটির সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১০ বছর।
তবে নতুন ব্যবস্থার পাশাপাশি বর্তমান সঞ্চয় হিসাবের কিছু সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাই মূল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সরকার বিদ্যমান হিসাবের মেয়াদ কমানোর পাশাপাশি কোনো বছরে অব্যবহৃত বিনিয়োগসীমা পরবর্তী বছরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও বাতিল করতে চায়। বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা কার্যত অনির্দিষ্টকাল হিসাবের মেয়াদ বাড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে পারেন। ফলে বিনিয়োগের মুনাফা দীর্ঘ সময় ধরে জমতে থাকে এবং পরে কর পরিশোধের সুযোগ থাকে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন কার্যকর হলে সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশল আর অনুসরণ করা যাবে না।
বিদেশভিত্তিক তহবিলেও আসছে সীমাবদ্ধতা
নতুন সঞ্চয় হিসাব থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় তালিকাভুক্ত হলেও বিদেশি সূচক অনুসরণকারী বিনিয়োগ তহবিল বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক অনুসরণকারী তহবিলও রয়েছে।
সরকারের এই অবস্থানের সমালোচনা করেছেন প্রধান বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির সংসদ সদস্য আন চোল-সু। তাঁর অভিযোগ, সরকার একদিকে পুঁজিবাজারকে আধুনিক করার কথা বলছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের কার্যত কেবল কোরীয় কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শেয়ারের দাম কমিয়ে রাখার অভিযোগেও বিতর্ক
দক্ষিণ কোরিয়ার বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মালিকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ রয়েছে—উত্তরাধিকার ও উপহার কর কমানোর উদ্দেশ্যে তারা কখনো কখনো কোম্পানির শেয়ারের দাম ইচ্ছাকৃতভাবে নিচে রাখেন। দেশটির শেয়ারবাজারের তুলনামূলক কম মূল্যায়নের অন্যতম কারণ হিসেবে এই প্রবণতাকে দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখ করা হয়।
সরকারের নতুন প্রস্তাবে এমন কোনো কোম্পানি শনাক্ত হলে, যার শেয়ারের দাম ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে রাখা হয়েছে বলে প্রমাণিত হবে, কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজারমূল্যের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি মূল্য ধরা হবে।
কোনো কোম্পানির মূল্য-সম্পদ অনুপাত নির্দিষ্ট সময় ধরে খুব নিচে থাকলে সেটি নজরদারির আওতায় আসতে পারে। কসপির সবচেয়ে নিচের ২৫ শতাংশ এবং কসডাকের সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ কোম্পানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে। সর্বশেষ ১৩টি ছয় মাসের সময়কালের মধ্যে অন্তত ১২টিতে এই অবস্থান থাকলে কোম্পানিটি পর্যালোচনার জন্য বিবেচিত হতে পারে।
এরপর জাতীয় কর কর্তৃপক্ষের একটি পর্যালোচনা কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে, কোম্পানিটি ইচ্ছাকৃতভাবে শেয়ারের দাম কমিয়ে রেখেছে কি না এবং বিশেষ করব্যবস্থা তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না।
সরকারের যুক্তি, শুধু কোনো কোম্পানির মূল্য-সম্পদ অনুপাত কম হলেই ধরে নেওয়া যায় না যে কোম্পানিটি ইচ্ছা করে শেয়ারের দাম কমিয়েছে। তাই অভিযোগ প্রমাণের আগে একটি যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন নিয়মেই তৈরি হতে পারে নতুন কৌশল
সমালোচকদের মতে, সরকারের নির্ধারিত সীমাগুলো এতটাই নির্দিষ্ট যে কিছু কোম্পানি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের মূল্য-সম্পদ অনুপাত সামান্য পরিবর্তন করে নজরদারি এড়িয়ে যেতে পারে। এতে শেয়ারবাজারে নতুন ধরনের বিকৃতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির সংসদ সদস্য লি সো-ইয়ং একটি বিল প্রস্তাব করেছিলেন। সেখানে কোনো কোম্পানির মূল্য-সম্পদ অনুপাত শূন্য দশমিক ৮-এর নিচে থাকলেই, সেই মূল্যায়ন কম হওয়ার কারণ যাই হোক না কেন, নিয়মটি প্রয়োগের কথা বলা হয়েছিল।
কর নির্ধারণের পদ্ধতিও প্রশ্নের মুখে
ইচ্ছাকৃতভাবে শেয়ারের দাম কমিয়ে রাখার প্রমাণ মিললে সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী করযোগ্য মূল্য নির্ধারণে দুটি হিসাবের মধ্যে যেটি বেশি, সেটি গ্রহণ করা হবে।
একটি হলো বর্তমান নির্ধারিত মূল্যের ১৩০ শতাংশ। অন্যটি হলো গত ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ছয় বছর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের হিসাব করে পাওয়া সর্বোচ্চ গড় শেয়ারমূল্য।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এই পদ্ধতিও নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারধারীদের জন্য উল্টো প্রণোদনা তৈরি করতে পারে। তারা যদি দীর্ঘ সময় ধরে শেয়ারের দাম নিচে ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই বিতর্কের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং পুরো প্রস্তাব নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে কর সংস্কার, ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাব এবং শেয়ারবাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ঠেকানোর সরকারি উদ্যোগ—তিনটি ক্ষেত্রেই এখন নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















