দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং তরুণদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচিত সরকারি নীতিগুলো দ্রুত পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশেষ করে ২০ ও ৩০ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি অসন্তোষ অন্য বয়সী জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি হওয়ায় সরকার বিভিন্ন নীতির কার্যকারিতা নতুন করে পর্যালোচনা করছে।
বিতর্কিত নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাবসংক্রান্ত করব্যবস্থার পরিবর্তনের পরিকল্পনা এবং বিয়ে ও নবদম্পতিদের জন্য প্রযোজ্য ২২টি নীতি। এসব নীতির কিছু অংশ তরুণদের জন্য আর্থিক সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে বলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
তরুণদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ হিসেবে দেখছেন লি
বৃহস্পতিবার সিউলের চেওং ওয়াদেতে জ্যেষ্ঠ সচিবদের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট লি ২০ ও ৩০ বছর বয়সীদের ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তরুণদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নীতিগুলো নতুন করে সাজানোর নির্দেশ দেন।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আয়, সম্পদ গঠন, আবাসন এবং বৈবাহিক অবস্থার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তরুণদের জন্য সরকারি নীতিগুলো পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এর আগে প্রকাশিত কয়েকটি জনমত জরিপেও তরুণদের মধ্যে প্রেসিডেন্টের প্রতি অসন্তোষের চিত্র উঠে আসে। একটি জরিপে দেখা যায়, ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ এবং ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ লি সরকারের কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট। যেখানে সব বয়সী মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টির হার ছিল ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
আরেকটি জরিপে ২০ ও ৩০ বছর বয়সী উত্তরদাতাদের ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতি সমর্থন না থাকার কথা জানান। সব বয়সী মানুষের মধ্যে এই হার ছিল ৫০ শতাংশ।
সঞ্চয় হিসাবের সুবিধা কমানোর পরিকল্পনায় ক্ষোভ
তরুণদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাবের প্রস্তাবিত সংস্কার। এই হিসাবের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা একটি হিসাব ব্যবহার করে দেশীয় শেয়ার ও বিদেশি বিনিময়ভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগ করতে পারেন। পাশাপাশি সুদ ও লভ্যাংশ থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর-সুবিধাও পাওয়া যায়।
সম্পদ গড়ে তুলতে আগ্রহী তরুণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এই হিসাব বেশ জনপ্রিয়।
সরকারের প্রস্তাবিত পরিবর্তনে দেশীয় বিনিয়োগের জন্য আলাদা একটি নতুন সঞ্চয় হিসাব চালুর কথা বলা হয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান হিসাবের কিছু সুবিধা কমানোর পরিকল্পনাও সামনে আসে। এর মধ্যে অব্যবহৃত বার্ষিক বিনিয়োগসীমা পরবর্তী বছরে নেওয়ার সুযোগ এবং হিসাবের মেয়াদ বাড়ানোর সুবিধা সীমিত করার বিষয় ছিল।
এই পরিকল্পনা প্রকাশের পর তরুণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
বিষয়টি প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপনের পর লি প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যমান সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে না জানিয়ে কর্মকর্তারা কেন এই প্রস্তাব এগিয়ে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, নীতিটির সুবিধাভোগীদের সংবেদনশীলতা সরকার যথাযথভাবে বুঝতে পারেনি।
এরপর তিনি ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাবের প্রস্তাবিত পরিবর্তন পুরোপুরি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেন।
বিয়েকে ‘বোঝা’ বানাতে চান না লি
শনিবার তরুণদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিয়ে ও পরিবার গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত সরকারি নীতির দিকে নজর দেন প্রেসিডেন্ট লি।
বাড়ির ঋণ, অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দের আবেদন এবং কর ব্যবস্থায় বিবাহিত দম্পতিরা কখনো কখনো অবিবাহিতদের তুলনায় অসুবিধায় পড়ছেন বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এসব নীতিকে অনেকে ‘বিয়ের শাস্তি’ বলেও অভিহিত করছেন।
লি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, সরকারি নীতির কারণে সৃষ্ট কোনো অসুবিধার জন্য তরুণদের কখনোই বিয়ে করতে দ্বিধা করা উচিত নয়।
বিবাহিত দম্পতি ও নতুন বাবা-মায়েদের সুবিধা বাড়াতে ২২টি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত আবাসন ঋণের জন্য আয়সীমা শিথিল করা, নবজাতক সন্তান থাকা দ্বৈত-আয়কারী দম্পতিদের জন্য আয়সীমা বাড়ানো এবং নবদম্পতিদের অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দের নিয়ম সহজ করার মতো বিষয় রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট লি বলেন, বিয়ে হওয়া উচিত আশাবাদী এক নতুন শুরুর নাম, কোনো বোঝা নয়।
দ্রুত নীতি বদল নিয়ে দুই ধরনের মত
তরুণদের ক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্টের দ্রুত হস্তক্ষেপ কিছুটা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে সমালোচকদের একটি অংশ বলছে, ঘটনাটি লি প্রশাসনের নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার কিছু দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে।
তাদের মতে, কোনো নীতি কার্যকর করার আগে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং সুবিধাভোগীদের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে, কেউ কেউ বলছেন, ভুল বা সমস্যাযুক্ত নীতি চিহ্নিত হওয়ার পর দ্রুত তা স্বীকার করে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াই ভালো। কারণ ত্রুটিপূর্ণ নীতি জেনেও অপরিবর্তিত রেখে দেওয়ার চেয়ে দ্রুত সংশোধন করা জনগণের আস্থা ফেরাতে বেশি কার্যকর হতে পারে।
তরুণদের শিক্ষা, চাকরি, আয়, সম্পদ, আবাসন ও পরিবার গঠনের বাস্তব সংকটকে সামনে রেখে এখন নীতিগুলো কতটা পরিবর্তন করা হয়, তার ওপরই লি সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে।
তরুণদের নীতি পুনর্বিবেচনা, ব্যক্তিগত সঞ্চয় হিসাবের করসুবিধা এবং বিয়েবান্ধব সরকারি নীতি—এই তিনটি বিষয়ই এখন দক্ষিণ কোরিয়ার নীতিনির্ধারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















