ভারতের ঝাড়খণ্ডে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে আন্দোলনরত হাজারো শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী সোমবার রাজ্য বিধানসভা অভিমুখে মিছিল করেছেন। রাঁচিতে আয়োজিত এ মিছিল একপর্যায়ে ব্যারিকেড ভেঙে বিধানসভার গেট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে।
সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি সোমবার ১৭তম দিনে গড়ায়। রাজধানী রাঁচির জয়পাল সিং মুন্ডা স্টেডিয়ামে এখনও অবস্থান চালিয়ে যাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।
বাতিলের দাবি জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি, ঝাড়খণ্ড কর্মী নির্বাচন কমিশনের সম্মিলিত স্নাতক স্তরের পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
এই মিছিল এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন এর মাত্র এক দিন আগে ঝাড়খণ্ড সরকার তিনটি নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছিল। বাতিলের তালিকায় ঝাড়খণ্ড লোকসেবা কমিশনের ১৪তম প্রাথমিক পরীক্ষাও রয়েছে।
ব্যারিকেড ভেঙে বিধানসভা অভিমুখে মিছিল
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ধুরওয়ার পুরোনো বিধানসভা ভবনের কাছে আন্দোলন শুরু হয়। শুরুতে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণই ছিল। জাতীয় পতাকা, বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড এবং ভগৎ সিং, বি আর আম্বেদকর, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শিবু সোরেন ও সমাজকর্মী নির্মল মাহাতোর ছবি হাতে নিয়ে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা মিছিল করেন।
মিছিলকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে নতুন বিধানসভা ভবনের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে তখন বর্ষাকালীন অধিবেশন চলছিল। একপর্যায়ে তাঁরা পুলিশের দেওয়া কাঁটাতারের ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং লাঠিচার্জ করে বলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ। এতে কয়েকজন আহত হন। তবে পুলিশ বলেছে, তারা বলপ্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া
পুলিশি পদক্ষেপের জবাবে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বোতল, চটি ও জুতা ছুড়ে দেন। তীব্র গরমের মধ্যেও কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে মাটিতে পড়ে যান।
আন্দোলনকারীদের মধ্যে ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার নেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোও রয়েছেন। কয়েক দিন ধরে অনশনরত এই নেতাকে মিছিলের স্থানে স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসা হয়। পরে তিনি কিছু সময় অ্যাম্বুলেন্সে থেকে আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি অনুসরণ করেন।
সাবেক লোকসেবা কমিশন চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
এদিকে নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের তদন্তের মধ্যেই ঝাড়খণ্ড লোকসেবা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এল খিয়াংতেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজ্য অপরাধ তদন্ত বিভাগ তদন্তের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২২ জুলাই তিনি চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
অন্যদিকে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে অর্থপাচারবিরোধী কেন্দ্রীয় সংস্থাও। রাজ্য অপরাধ তদন্ত বিভাগের দায়ের করা মামলা ও অন্যান্য অভিযোগের ভিত্তিতে অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলন চলবে, ঘোষণা নেতাদের
পুলিশি পদক্ষেপের পরও আন্দোলন প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেননি জেএসএসসি-জেপিএসসি সংস্কার মঞ্চ এবং ঝাড়খণ্ড লোকতান্ত্রিক ক্রান্তিকারী মোর্চার নেতারা। তাঁরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সন্ধ্যার পরও বিধানসভা এলাকার কাছে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান বিক্ষোভকারীরা। স্থানীয় এক স্বেচ্ছাসেবকের দাবি, রাতে পুলিশ আবারও লাঠিচার্জ করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং পরে তাঁদের এলাকা থেকে তাড়া করে বের করে দেয়।
রাহুল গান্ধীর নিন্দা, কংগ্রেসকে চ্যালেঞ্জ বিজেপির
ঝাড়খণ্ডে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। দিল্লিতে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সহিংসতার নিন্দা করা উচিত।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে বিজেপি কংগ্রেসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে কংগ্রেস যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তাহলে হেমন্ত সোরেন সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করা উচিত।
ঝাড়খণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সোমবারের সংঘর্ষের পর তা আরও তীব্র হয়েছে। সরকার কয়েকটি পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে সম্মতি জানালেও আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর বিষয়ে সমাধান না হওয়ায় রাজ্যের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি।












