ভারতের মহাকাশ গবেষণা ও বেসরকারি মহাকাশশিল্পে বড় ধরনের অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। বেঙ্গালুরুভিত্তিক মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রোবেস স্পেস টেকনোলজিস দেশটির প্রথম বেসরকারিভাবে তৈরি উচ্চক্ষমতার পূর্ণ-প্রবাহ ধাপভিত্তিক দহন প্রযুক্তির রকেট ইঞ্জিন উন্মোচন করেছে। ‘এভারেস্ট’ নামের এই ইঞ্জিনের ক্ষমতা ৮০০ কিলোনিউটন।
গত ৭ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি ইঞ্জিনটি প্রকাশ্যে আনে। এর মধ্য দিয়ে ভারত বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে এই অত্যন্ত জটিল ও উন্নত রকেট ইঞ্জিন প্রযুক্তি আয়ত্ত করার পথে এগিয়ে গেল। এর আগে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছে।
অত্যন্ত জটিল রকেট প্রযুক্তিতে ভারতের প্রবেশ
পূর্ণ-প্রবাহ ধাপভিত্তিক দহন বা এফএফএসসি প্রযুক্তিকে আধুনিক তরল জ্বালানি রকেট ইঞ্জিনের অন্যতম উন্নত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত অনেক রকেট ইঞ্জিনে জ্বালানির একটি অংশ টার্বোপাম্প চালাতে ব্যবহৃত হলেও এফএফএসসি প্রযুক্তিতে জ্বালানি ও জারক—দুই উপাদানই আলাদাভাবে প্রি-বার্নারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এর ফলে ইঞ্জিনের টার্বোপাম্প আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও জারকের প্রায় পুরো অংশই শেষ পর্যন্ত রকেটের ধাক্কা বা উত্থানশক্তি তৈরিতে কাজে লাগে। ফলে জ্বালানির অপচয় কমে এবং ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা বাড়ে।
এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, ইঞ্জিনের শক্তি তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভবিষ্যতে বারবার ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণযান তৈরির ক্ষেত্রেও এটি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।
মিথেনভিত্তিক জ্বালানিতে বাড়তি সুবিধা
অ্যাস্ট্রোবেসের তৈরি এভারেস্ট ইঞ্জিনে তরল অক্সিজেন ও মিথেন ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সমন্বয়কে পরবর্তী প্রজন্মের রকেট প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
মিথেন তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্নভাবে দহন হওয়ায় ইঞ্জিনে কার্বনজাতীয় জমাট কম তৈরি হতে পারে। এর ফলে উৎক্ষেপণের পর ইঞ্জিন সংস্কার ও পুনরায় ব্যবহারের প্রস্তুতিতে সময় কম লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।
অ্যাস্ট্রোবেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নীরজ খান্ডেলওয়ালের মতে, এফএফএসসি প্রযুক্তি উচ্চ দক্ষতা, নির্ভুল শক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণযান তৈরির জন্য উপযোগী। মিথেনের সঙ্গে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতের উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
বিশ্বে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি
এফএফএসসি প্রযুক্তির উচ্চক্ষমতার ইঞ্জিন তৈরি করা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিশ্বে এখনো খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স ও স্টোক স্পেস এবং চীনের ল্যান্ডস্পেস এ ধরনের উচ্চক্ষমতার ইঞ্জিন তৈরিতে সফল হয়েছে।
তবে বর্তমানে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত এফএফএসসি ইঞ্জিন হিসেবে স্পেসএক্সের র্যাপ্টরই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সেই তালিকায় ভারতীয় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হওয়া দেশের মহাকাশ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এভারেস্ট শুধু ভারতের প্রথম বেসরকারি এফএফএসসি ইঞ্জিন নয়, দেশটির প্রথম বেসরকারি উচ্চক্ষমতার তরল অক্সিজেন-মিথেন ইঞ্জিনও। ফলে ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি তৈরির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৩০ টন পর্যন্ত মালামাল কক্ষপথে পাঠানোর সম্ভাবনা
এভারেস্ট ইঞ্জিনের উন্নয়ন সফলভাবে এগোলে নিম্ন-পৃথিবী কক্ষপথে প্রায় ৩০ টন পর্যন্ত মালামাল বহনের সক্ষমতা থাকা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণযান তৈরির পথ খুলতে পারে।
এর মাধ্যমে মাঝারি ক্ষমতার উৎক্ষেপণযান তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হবে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পাশাপাশি ভারতের কৌশলগত ও সরকারি মহাকাশ মিশনেও এ ধরনের উৎক্ষেপণযান ব্যবহার করা যেতে পারে। বিদেশি গ্রাহকদের জন্য বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণসেবার সুযোগও বাড়তে পারে।
ইঞ্জিনটি তৈরিতে উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বড় শিল্পকারখানাভিত্তিক ত্রিমাত্রিক মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহারও রয়েছে।

২০২৮ সালের ডিসেম্বরে প্রথম উড্ডয়নের লক্ষ্য
এভারেস্ট ইঞ্জিনের উন্নয়ন শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালে। প্রায় দুই বছরের কাজের পর চলতি বছরের আগস্টে বেঙ্গালুরুর উপকণ্ঠে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ৮০০ কিলোনিউটন ক্ষমতার ইঞ্জিনটি উন্মোচন করা হয়।
ইতোমধ্যে ইঞ্জিনটির বিভিন্ন উপব্যবস্থার পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুরে প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাকেন্দ্রে সম্পূর্ণ সমন্বিত পরীক্ষা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ইঞ্জিনের প্রকৃত জ্বলন পরীক্ষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এভারেস্ট ইঞ্জিনের প্রথম উড্ডয়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
উৎপাদন বাড়ানোর বড় পরিকল্পনা
প্রথম কক্ষপথে উৎক্ষেপণের আগে প্রায় ২০টি ইঞ্জিন তৈরি ও পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে অ্যাস্ট্রোবেসের। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বছরে ছয় থেকে আটটি ইঞ্জিন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে।
ভবিষ্যতে এই উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ৬০টি ইঞ্জিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু একটি পরীক্ষামূলক ইঞ্জিন তৈরির মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং ভবিষ্যতের উৎক্ষেপণ বাজারের জন্য বড় পরিসরে ইঞ্জিন উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সরকারি সহায়তায় বেসরকারি মহাকাশশিল্পের অগ্রযাত্রা
এফএফএসসি ইঞ্জিন উন্নয়নের জন্য অ্যাস্ট্রোবেস স্পেস টেকনোলজিস ভারতের জাতীয় মহাকাশ উন্নয়ন ও অনুমোদন কেন্দ্রের প্রযুক্তি গ্রহণ তহবিলের আওতায় নির্বাচিত হয়েছে।
মহাকাশ বিভাগের অধীন এই স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ভারতে বেসরকারি মহাকাশ খাতকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারি সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দেশীয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে ভারতের মহাকাশশিল্প যে দ্রুত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, অ্যাস্ট্রোবেসের এ উদ্যোগ তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এভারেস্টের উন্নয়ন সফল হলে ভারতের নিজস্ব উৎক্ষেপণ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহাকাশ বাজারেও দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট, কম খরচে উৎক্ষেপণ এবং বাণিজ্যিক মহাকাশসেবার ক্ষেত্রে এটি ভারতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
Sarakhon Report 



















