কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ও আকার বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসব অবকাঠামোর বীমার চাহিদাও। চলতি বছর বিশ্বে ডেটা সেন্টার-সংশ্লিষ্ট বীমার বাজার ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন ধরনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগেও রয়েছেন বীমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।
ডেটা সেন্টারের বিশাল আকার, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিপুল বিদ্যুৎনির্ভরতা প্রচলিত বীমা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একটি স্থাপনায় ছোট কোনো সমস্যা দেখা দিলেও তা বিদ্যুৎ সরবরাহ, কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি, তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা—এমনকি একাধিক বীমা পলিসির ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের ক্ষতির প্রভাব ফেলতে পারে।
এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ
এআই সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা ও স্পেসএক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের ডেটা সেন্টারসহ অবকাঠামো খাতে মূলধনী ব্যয় ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই বিপুল বিনিয়োগ ডেটা সেন্টারের বীমা ব্যবসার জন্য বড় নতুন বাজার তৈরি করছে। বীমা খাতের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টার-সংশ্লিষ্ট বীমা প্রিমিয়ামের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত থেকে মোট প্রিমিয়াম আয় ৯০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
ফলে অ-জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ডেটা সেন্টার এখন দ্রুত সম্প্রসারণশীল একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
একটি দুর্ঘটনাতেই বহুস্তরীয় ক্ষতি
ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো এর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। এসব স্থাপনা সার্বক্ষণিক বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে শুধু বিদ্যুৎ অবকাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; একই সঙ্গে ডেটা সেন্টারের গ্রাফিকস প্রসেসর, অন্যান্য কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি এবং সংরক্ষিত তথ্যও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এর ফলে একটি ঘটনা একই সময়ে একাধিক বীমা পলিসির আওতায় ক্ষয়ক্ষতি তৈরি করতে পারে। এতে বীমা কোম্পানির দাবির পরিমাণ হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেটা সেন্টার বীমার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—একটি ঝুঁকি একই সঙ্গে বহু ধরনের বীমা দাবির জন্ম দিতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগও বড় হুমকি
ডেটা সেন্টারের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পরিকল্পনাধীন ৬৭০টির বেশি ডেটা সেন্টারের প্রায় অর্ধেক এমন অঞ্চলে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে টর্নেডোর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বড় আকারের জমি এবং পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধা পাওয়ার জন্য নির্মাতারা অনেক সময় এমন অঞ্চল বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এসব সুবিধার বিপরীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
একটি বড় ঝড়, টর্নেডো, অগ্নিকাণ্ড বা বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বিপর্যয় একই এলাকার একাধিক ডেটা সেন্টারে ক্ষতি করলে বীমা কোম্পানিকে একসঙ্গে বিপুল অঙ্কের দাবি পরিশোধ করতে হতে পারে।

অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার বিপদ
ডেটা সেন্টার বীমার বাজার দ্রুত বাড়ছে বলে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শুধু প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দিয়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে।
ইতিমধ্যে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে নেওয়া বীমা ব্যবস্থার আওতা সম্ভাব্য ক্ষতির প্রকৃত মাত্রার তুলনায় যথেষ্ট ছিল না। ফলে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ক্ষতির সম্ভাব্য পরিমাণ নির্ধারণ এখন বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঝুঁকি কমাতে নতুন কৌশল
অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টারের জন্য নিজেদের পলিসির পরিধি সীমিত করছে। তবে কেউ কেউ উল্টোভাবে বিস্তৃত পরিসরের বীমা পণ্য নিয়ে বাজারে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে একই সঙ্গে একাধিক স্থাপনায় সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা হিসাব করার চেষ্টা করছে।
কিছু প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টার নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষায়িত বিভাগও গড়ে তুলেছে। এসব বিভাগ শুধু বীমা দেওয়ার কাজই করছে না, বরং ডেটা সেন্টার কোথায় নির্মাণ করা হবে, কী ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ও অগ্নি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থাকবে এবং সাইবার নিরাপত্তা কীভাবে জোরদার করা যায়—এসব বিষয়েও পরামর্শ দিচ্ছে।
বড় বীমা দালাল প্রতিষ্ঠানগুলোও ডেটা সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের বীমা কাভারেজের সক্ষমতা তৈরি করছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্ষতি কোন ভৌগোলিক এলাকায় কতটা কেন্দ্রীভূত হতে পারে, তা মানচিত্রের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে একই দুর্যোগে একাধিক দাবির ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পর জাপানেও বাড়ছে সতর্কতা
ডেটা সেন্টারের বীমা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নেই। জাপানের বীমা খাতও এই পরিবর্তনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটির ডেটা সেন্টারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ছোট হলেও কিছু স্থাপনার সম্পদের মূল্য ১০ হাজার কোটি ইয়েনের বেশি।
জাপানের একটি বড় অ-জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রে যে ধরনের প্রবণতা দেখা যায়, কয়েক বছর পর তার প্রভাব জাপানেও এসে পড়ে।
ডেটা সেন্টারে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়। একটি ছোট ঘটনা দ্রুত বড় আগুনে পরিণত হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।
বীমা খাতে নতুন সম্ভাবনা, সঙ্গে বড় পরীক্ষা
এআই অর্থনীতির বিস্তারের ফলে ডেটা সেন্টার এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এই খাতের সম্প্রসারণ অ-জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন ও বিশাল রাজস্বের সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রচলিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
কারণ ডেটা সেন্টারে আগুন বা যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার মতো সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিপর্যয়, প্রযুক্তিগত সমস্যা, সাইবার হামলা, তথ্য হারানো এবং একই দুর্যোগে একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো পরস্পর-সংযুক্ত ঝুঁকিও রয়েছে।
১০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তাই বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য যতটা আকর্ষণীয়, ভুল ঝুঁকি মূল্যায়নের কারণে বড় ক্ষতির আশঙ্কাও ততটাই বাস্তব। এআই অবকাঠামোর বিস্তার যত দ্রুত হবে, ডেটা সেন্টার বীমার ক্ষেত্রে সঠিক ঝুঁকি নির্ধারণ, ক্ষতির সীমা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত সুরক্ষা ব্যবস্থা তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















