০৮:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
‘গানের মাহাত্ম্য গায়কের চেয়েও বড়’: নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে উষা উত্থুপ মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা ফেডপ্রধান ওয়ারশের মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা হবে ফেডপ্রধান ওয়ারশের নেতৃত্ব গালফের ভারতীয় প্রবাসীরা এখন শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না, গড়ছেন বৈশ্বিক সম্পদ পর্দাহীন গারমিন সিরকা: তথ্য দেবে, কিন্তু মনোযোগ কেড়ে নেবে না ড্রোন হামলা বন্ধ না হলে জাওয়িয়া তেল শোধনাগার বন্ধের হুঁশিয়ারি লিবিয়ার তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর: অন্তত তিস্তা চুক্তি তো আশা করতে পারে বাংলাদেশ নিখোঁজ রুশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদকে নিয়ে নীরব ইসরায়েল, মস্কোর জবাব চাওয়া লাওসে চীনের বিরল মাটির খনি প্রকল্পে ধাক্কা, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মুনাফার জোয়ার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে শীর্ষে দেশটি

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে শীর্ষে দেশটি

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ অবকাঠামো, গ্রিড ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতেও চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম জোরদার হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের বিদেশি বিনিয়োগে চীন এখন সবচেয়ে বড় অংশীদার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ডলার। এটি খাতটির মোট ৩৪৬ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগের প্রায় ৩৪ শতাংশ। গত বছরই চীন বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের শীর্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যায়। মার্চ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের অংশ ছিল ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের বড় অংশীদারত্ব

চীনের বিদ্যুৎ খাতের বিনিয়োগের বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত। তবে সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তাদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে, গত বছর বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মোট বিনিয়োগের অর্ধেকের বেশি এসেছে চীন থেকে।

এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিড ও ব্যাটারি প্রযুক্তির সরঞ্জাম আমদানিতেও চীনের ভূমিকা বেড়েছে। যদিও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগের বছরগুলোর তুলনায় এসব পণ্যের রপ্তানি এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য শুধু সৌর প্যানেল বা বায়ু টারবাইন বিক্রির বাজার নয়। প্রযুক্তি, অর্থায়ন, প্রকৌশল দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগও তৈরি করছে এই বাজার। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসে।

বিদ্যুৎ সংকটে নতুন সুযোগ

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য, আমদানিনির্ভরতা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি টার্মিনালে সাম্প্রতিক অচলাবস্থাও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ বাড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় চীনের বড় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বাজারে সম্ভাবনা দেখছে। পাওয়ারচায়না, চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন এবং হারবিন ইলেকট্রিকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আগ্রহী।

অন্যদিকে বাংলাদেশও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর অবকাশ ও আমদানি করা যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে এবং বিকল্প জ্বালানি এখন স্পষ্ট অগ্রাধিকার। বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সৌরশক্তি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সক্ষমতা থাকায় বাংলাদেশের বাজার তাদের জন্য বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময়।

কয়লা থেকে সৌর ও বায়ুশক্তিতে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের বড় পরিসরের বিনিয়োগ শুরু হয় ২০১৬ সালের দিকে। ওই সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ গ্রিড ও সঞ্চালন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ে।

এর মধ্যে পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যতম বড় প্রকল্প। এটি বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও বিনিয়োগ বিস্তৃত হয়েছে। নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি ও চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ-চায়না রিনিউএবল এনার্জি কোম্পানি গড়ে উঠেছে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতে সিরাজগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ পার্ক, পাবনা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ও ময়মনসিংহ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালী, জামালপুরের মাদারগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প উন্নয়নের কাজ চলছে।

বায়ুবিদ্যুতেও চীনা অংশীদারত্ব রয়েছে। পায়রা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রও এই উদ্যোগের অংশ। কক্সবাজারের প্রকল্পটি ইতোমধ্যে উৎপাদনে গেছে।

অর্থায়ন ও প্রযুক্তিতে চীনের ওপর নির্ভরতা

বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, বড় আকারের সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। স্থানীয় উৎস থেকে সেই অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হওয়ায় চীনা অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তাও বড় কারণ। বাংলাদেশে এখনো সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ সরঞ্জাম বড় পরিসরে উৎপাদিত হয় না। ফলে এসব সরঞ্জামের জন্য চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়।

অর্থায়নের পাশাপাশি চীনা প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা, প্রকৌশল জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের রেকর্ড বিনিয়োগ, ইরান যুদ্ধের ফল | প্রথম আলো

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন নীতিসুবিধা

জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বেশ কিছু আর্থিক ও নীতিগত সুবিধা অনুমোদন করেছে। যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের কর অব্যাহতি, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের কর রেয়াত, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিতে কম শুল্ক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতির মতো সুবিধা এতে রয়েছে।

নির্দিষ্ট কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

তবে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির সংকট এখনো অন্যতম বড় বাধা। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ জমি কৃষি, বসতি ও শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ কারণে সরকার অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত সরকারি জমি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

২০৩০ সালের লক্ষ্যে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানি ব্যবহারের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবছর বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রতিবছর প্রায় ৯৮ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নের অর্থ ধরা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে ২০৩১ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর প্রায় ১৪৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, সাময়িকভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কিছুটা কমলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সমাধান সম্ভব নয় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের রূপান্তর ছাড়া।

তার মতে, বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে হবে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে চীনের নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দ্রুত জ্বালানি রূপান্তরের পথে এগোতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের অবস্থান এখন শুধু বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আরও দৃঢ় হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

‘গানের মাহাত্ম্য গায়কের চেয়েও বড়’: নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে উষা উত্থুপ

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে শীর্ষে দেশটি

০৭:০৬:২৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ অবকাঠামো, গ্রিড ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতেও চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম জোরদার হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতের বিদেশি বিনিয়োগে চীন এখন সবচেয়ে বড় অংশীদার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৮ কোটি ডলার। এটি খাতটির মোট ৩৪৬ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগের প্রায় ৩৪ শতাংশ। গত বছরই চীন বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের শীর্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যায়। মার্চ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের অংশ ছিল ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের বড় অংশীদারত্ব

চীনের বিদ্যুৎ খাতের বিনিয়োগের বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত। তবে সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তাদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাবে, গত বছর বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মোট বিনিয়োগের অর্ধেকের বেশি এসেছে চীন থেকে।

এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিড ও ব্যাটারি প্রযুক্তির সরঞ্জাম আমদানিতেও চীনের ভূমিকা বেড়েছে। যদিও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগের বছরগুলোর তুলনায় এসব পণ্যের রপ্তানি এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য শুধু সৌর প্যানেল বা বায়ু টারবাইন বিক্রির বাজার নয়। প্রযুক্তি, অর্থায়ন, প্রকৌশল দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগও তৈরি করছে এই বাজার। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসে।

বিদ্যুৎ সংকটে নতুন সুযোগ

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য, আমদানিনির্ভরতা এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি টার্মিনালে সাম্প্রতিক অচলাবস্থাও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ বাড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় চীনের বড় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বাজারে সম্ভাবনা দেখছে। পাওয়ারচায়না, চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন, চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন এবং হারবিন ইলেকট্রিকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আগ্রহী।

অন্যদিকে বাংলাদেশও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর অবকাশ ও আমদানি করা যন্ত্রপাতিতে শুল্ক ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে এবং বিকল্প জ্বালানি এখন স্পষ্ট অগ্রাধিকার। বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সৌরশক্তি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সক্ষমতা থাকায় বাংলাদেশের বাজার তাদের জন্য বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময়।

কয়লা থেকে সৌর ও বায়ুশক্তিতে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের বড় পরিসরের বিনিয়োগ শুরু হয় ২০১৬ সালের দিকে। ওই সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের পর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ গ্রিড ও সঞ্চালন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ে।

এর মধ্যে পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যতম বড় প্রকল্প। এটি বাংলাদেশ-চীন যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও বিনিয়োগ বিস্তৃত হয়েছে। নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি ও চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ-চায়না রিনিউএবল এনার্জি কোম্পানি গড়ে উঠেছে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতে সিরাজগঞ্জ সৌরবিদ্যুৎ পার্ক, পাবনা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ও ময়মনসিংহ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালী, জামালপুরের মাদারগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প উন্নয়নের কাজ চলছে।

বায়ুবিদ্যুতেও চীনা অংশীদারত্ব রয়েছে। পায়রা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশাপাশি কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রও এই উদ্যোগের অংশ। কক্সবাজারের প্রকল্পটি ইতোমধ্যে উৎপাদনে গেছে।

অর্থায়ন ও প্রযুক্তিতে চীনের ওপর নির্ভরতা

বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, বড় আকারের সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। স্থানীয় উৎস থেকে সেই অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হওয়ায় চীনা অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহায়তাও বড় কারণ। বাংলাদেশে এখনো সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ সরঞ্জাম বড় পরিসরে উৎপাদিত হয় না। ফলে এসব সরঞ্জামের জন্য চীনের ওপর নির্ভর করতে হয়।

অর্থায়নের পাশাপাশি চীনা প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা, প্রকৌশল জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের রেকর্ড বিনিয়োগ, ইরান যুদ্ধের ফল | প্রথম আলো

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন নীতিসুবিধা

জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বেশ কিছু আর্থিক ও নীতিগত সুবিধা অনুমোদন করেছে। যোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের কর অব্যাহতি, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের কর রেয়াত, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিতে কম শুল্ক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতির মতো সুবিধা এতে রয়েছে।

নির্দিষ্ট কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

তবে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির সংকট এখনো অন্যতম বড় বাধা। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ জমি কৃষি, বসতি ও শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ কারণে সরকার অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত সরকারি জমি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

২০৩০ সালের লক্ষ্যে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানি ব্যবহারের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবছর বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রতিবছর প্রায় ৯৮ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নের অর্থ ধরা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে ২০৩১ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর প্রায় ১৪৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, সাময়িকভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কিছুটা কমলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সমাধান সম্ভব নয় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের রূপান্তর ছাড়া।

তার মতে, বাংলাদেশকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে হবে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে চীনের নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দ্রুত জ্বালানি রূপান্তরের পথে এগোতে পারে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে চীনের অবস্থান এখন শুধু বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আরও দৃঢ় হচ্ছে।