লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জাওয়িয়ায় তেল স্থাপনায় একের পর এক ড্রোন হামলার ঘটনায় দেশের সবচেয়ে বড় সচল তেল শোধনাগার বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন। হামলা অব্যাহত থাকলে শোধনাগারের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সর্বোচ্চ জরুরি অবস্থা ঘোষণা
সোমবার জাওয়িয়ায় তেল স্থাপনায় সর্বশেষ ড্রোন হামলার পর ওই এলাকায় সর্বোচ্চ মাত্রার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন। একই সঙ্গে অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, সোমবারের হামলার লক্ষ্য ছিল জাওয়িয়া তেল পরিশোধন কোম্পানির একটি তেল মিশ্রণ ও প্যাকেজিং কারখানা। একটি ড্রোন প্রধান তেল সংরক্ষণ ট্যাংক ও অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহৃত পাইপলাইন নেটওয়ার্কের কাছে পড়ে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি।
ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে তাদের পরিচালনা পর্ষদ বাধ্য হয়ে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করতে পারে। এর ফলে শোধনাগারের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পথ খুলে যাবে।
আগের হামলায় ধ্বংস হয়েছে বিশাল জ্বালানি ট্যাংক
এর আগে একটি ড্রোন হামলায় রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ব্রেগা অয়েল মার্কেটিং কোম্পানির একটি পেট্রোল সংরক্ষণ ট্যাংকে আগুন ধরে যায়। ট্যাংকটিতে প্রায় ৪৫ লাখ লিটার পেট্রোল ছিল বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন।
আগুনের তীব্রতায় ট্যাংকটি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ধসে পড়ে। এর মাত্র কয়েক দিন পর শনিবার অপর একটি হামলায় অপরিশোধিত ন্যাফথা সংরক্ষণকারী একটি ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই হামলায় ট্যাংকটিতে দুটি ছিদ্র তৈরি হয় এবং ভেতরে থাকা জ্বালানির একটি অংশ বাইরে বেরিয়ে যায়।
দেশের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি
ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন বলেছে, তেল স্থাপনায় যেকোনো ধরনের হামলা শুধু জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আঘাত নয়, এটি দেশের নিরাপত্তা এবং জনগণের সম্পদের জন্য সরাসরি হুমকি।
হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো জানা যায়নি। কোনো সংগঠনও এসব হামলার দায় স্বীকার করেনি। হামলার ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থাটি।
প্রতিদিন ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল পরিশোধনের সক্ষমতা
রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত জাওয়িয়া তেল শোধনাগারটি প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। এটি ৩ লাখ ব্যারেল দৈনিক উৎপাদনক্ষম শারারা তেলক্ষেত্রের সঙ্গেও সংযুক্ত।
বর্তমানে এটিই লিবিয়ার সবচেয়ে বড় সচল তেল শোধনাগার। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ এবং তেল খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীলতার মধ্যে তেল খাত
লিবিয়ার তেল অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিরোধ, সশস্ত্র সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও জাওয়িয়া শোধনাগার এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে কয়েকটি তেল সংরক্ষণ ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
সে সময়ও ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চুক্তিগত দায়বদ্ধতা সাময়িকভাবে স্থগিত করার সুযোগ দেয় এই ব্যবস্থা।
২০১১ সালে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ন্যাটোর সমর্থিত সামরিক অভিযানের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই লিবিয়া দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে দেশটি ত্রিপোলিভিত্তিক প্রশাসন এবং পূর্বাঞ্চলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভক্ত। রাজনৈতিক বিরোধ ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে বিভিন্ন সময়ে দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ ফেরানোর উদ্যোগের মধ্যেই নতুন সংকট
২০২৪ সালের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে পূর্বাঞ্চলভিত্তিক কর্তৃপক্ষ তেলক্ষেত্র ও টার্মিনাল বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে সমঝোতা হওয়ার পর ওই বছরের অক্টোবরে ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন ‘ফোর্স মেজর’ প্রত্যাহার করে।
নতুন করে ড্রোন হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন লিবিয়া বিদেশি জ্বালানি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালে দেশটি ১৭ বছর পর প্রথমবারের মতো তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। এতে স্থল ও সমুদ্র মিলিয়ে ২০টি অনুসন্ধান ব্লক প্রস্তাব করা হয়।
তবে গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা অব্যাহত থাকলে লিবিয়ার জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















