দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বসবাসকারী ভারতীয়দের সঙ্গে ভারতের আর্থিক সম্পর্ক বলতে মূলত বোঝানো হতো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠানোকে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী বিত্তবান ভারতীয় প্রবাসীদের একটি বড় অংশ এখন শুধু আয় করে দেশে টাকা পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিভিন্ন দেশ, মুদ্রা ও সম্পদ শ্রেণিতে বিনিয়োগ করে বৈশ্বিক সম্পদ গড়ে তুলছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষতা, আর্থিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে গালফের ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের চরিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তাদের আর্থিক জীবন এখন আর একটি দেশকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত এবং অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশের বাজারও তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে।
বদলে যাচ্ছে প্রবাসী ভারতীয় বিনিয়োগকারীর চেহারা
কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের ভোক্তা ব্যাংকিং বিভাগের বিতরণপ্রধান প্রণব মিশ্র বলেন, আগের প্রজন্মের গালফ-ভিত্তিক ভারতীয়দের প্রধান লক্ষ্য ছিল উপসাগরীয় দেশগুলোতে আয় করা এবং সেই অর্থ পরিবারের জন্য ভারতে পাঠানো। সেই প্রবণতা এখনো রয়েছে। তবে তার পাশাপাশি নতুন একটি শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা বেশি সম্পদশালী, তথ্যসচেতন এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত।
এই নতুন প্রজন্মের বিনিয়োগকারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একই সঙ্গে একাধিক দেশের সঙ্গে যুক্ত। তারা শুধু পরিবারকে সহায়তা করার জন্য অর্থ পাঠাচ্ছেন না; বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন বাজারে বিনিয়োগ করছেন।
ভারত এখনো তাদের সম্পদ তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। তবে বিনিয়োগের ধরন আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়েছে।
শেয়ারবাজারের বাইরে বাড়ছে বিনিয়োগ
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে নতুন কোম্পানির শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রবণতা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে বিত্তবান ভারতীয় পরিবারগুলোর বিনিয়োগ আগ্রহও কিছুটা বেড়েছে। তবে তারা শুধু তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে সীমাবদ্ধ থাকছেন না।
ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, নতুন উদ্যোগে পুঁজি দেওয়া এবং আবাসনভিত্তিক বিনিয়োগ তহবিলের মতো বিকল্প সম্পদেও তাদের আগ্রহ বাড়ছে। অর্থাৎ সম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে তারা একক কোনো বাজার বা সম্পদের ওপর নির্ভর করতে চাইছেন না।
বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় অনেক পরিবার আবার হাতে নগদ অর্থের পরিমাণও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সোনা ও ঋণভিত্তিক বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছে অনেকে। এতে বোঝা যায়, স্বল্পমেয়াদি মুনাফার বদলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ রক্ষার বিষয়টিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুরোনো ব্যবসার মালিকানা বদলেও আসছে নতুন অর্থ
ভারতীয় পরিবারগুলোর ব্যবসায় প্রজন্মগত পরিবর্তনও নতুন বিনিয়োগের অর্থ তৈরি করছে। পুরোনো প্রজন্মের হাতে থাকা অনেক পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা এখন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যাচ্ছে। এই মালিকানা পরিবর্তনের সময় ব্যবসা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ বেরিয়ে আসছে।
এই অর্থ নতুন বিনিয়োগের জায়গা খুঁজছে। ফলে পারিবারিক ব্যবসা থেকে মুক্ত হওয়া মূলধন নতুন ব্যবসা, বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

ভারত ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্পর্ক হচ্ছে দ্বিমুখী
পরিবর্তিত বিনিয়োগ আচরণ ভারত ও উপসাগরীয় অঞ্চলের আর্থিক সম্পর্ককেও নতুন রূপ দিচ্ছে। আগে যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ভারতে অর্থ পাঠানোর বিষয়টিই প্রধান ছিল, এখন অর্থের প্রবাহ ক্রমেই দ্বিমুখী হয়ে উঠছে।
গালফে উপার্জিত অর্থ ভারতের অগ্রাধিকার অনুযায়ী বিনিয়োগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারতীয় পরিবার ও ব্যবসাগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতকে শুধু অর্থ রাখার জায়গা হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বৈশ্বিক সম্প্রসারণের কেন্দ্র হিসেবেও দেখছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে উত্থান এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দুই দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, উন্নত আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অর্থ পরিশোধ অবকাঠামো সীমান্তের দুই পাশে অর্থ স্থানান্তর ও সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আগের তুলনায় সহজ করছে।
সীমান্ত পেরিয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে জটিলতা
তবে একাধিক দেশে সম্পদ পরিচালনা করাও সহজ নয়। বিভিন্ন মুদ্রায় আয় ও বিনিয়োগ থাকলে মুদ্রার ওঠানামার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি রয়েছে ভিন্ন দেশের আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং একাধিক ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক সম্পর্ক পরিচালনার বিষয়।
একজন ব্যক্তির আয়, বিনিয়োগ, ব্যবসা ও পরিবারের সদস্যরা যখন বিভিন্ন দেশ ও মুদ্রার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তখন সাধারণ আর্থিক সিদ্ধান্তও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে বাজারের অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিত্তবান ভারতীয় প্রবাসীদের একটি বড় অংশ এখন দ্রুত লাভের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। কয়েক দশকের সময়সীমা ধরে যারা সম্পদ পরিকল্পনা করছেন, তারা এমন ব্যাংকিং সহযোগী চান, যারা তাদের মতোই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।
ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভারতীয় প্রবাসীদের আর্থিক পরিচয়ও বদলে যাচ্ছে। তারা আর শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো প্রবাসী নন; বরং ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বিশ্বের অন্যান্য বাজারকে যুক্ত করে নতুন ধরনের বৈশ্বিক সম্পদ নির্মাতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















