০১:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
তালেবান শাসনে ২৪ লাখ আফগান কিশোরীর মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ, অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান ইউনেস্কোর বাইডেনের স্বাস্থ্য সংকট ডেমোক্র্যাটদের গভীর রাজনৈতিক সংকটও উন্মোচন করছে লোডশেডিং ঘিরে আতঙ্ক, বিদ্যুৎ অফিসে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় আবেদন মশাখালীতে যমুনা এক্সপ্রেস থামিয়ে আন্দোলন, ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ খুলনায় ইটভাটায় যুবককে গুলি করে হত্যা, মাথায় গুলি করে পালাল দুর্বৃত্তরা নারীদের ট্যুর দ্য ফ্রান্সে রুদ্ধশ্বাস লড়াই, ৮ সেকেন্ডের নাটক পেরিয়ে ভোলেরিংয়ের জয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি গান এবার আলাদা করে চিহ্নিত করবে স্পটিফাই ভারতের জেন-জি বদলে দিচ্ছে বিলাসপণ্যের বাজার, কেনাকাটায় গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থ ও ব্যক্তিত্ব কোপেনহেগেনের রাস্তায় নতুন ফ্যাশন ঝড়, জোড়ায় জোড়ায় সাজ থেকে প্রেইরি-রোমান্স জলরঙে নতুন শখের শুরু, মন ভালো রাখার সহজ উপায়

ভারতের জেন-জি বদলে দিচ্ছে বিলাসপণ্যের বাজার, কেনাকাটায় গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থ ও ব্যক্তিত্ব

ভারতে জেন-জি এখন আর শুধু ভবিষ্যতের ক্রেতা নয়, বর্তমানের শক্তিশালী ভোক্তা গোষ্ঠী। ফ্যাশন, বিলাসপণ্য, বিয়ে কিংবা ব্যক্তিগত পোশাক—সব ক্ষেত্রেই এই প্রজন্মের কেনাকাটার ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে বাজারের প্রচলিত হিসাব। তারা শুধু নামী ব্র্যান্ডের পরিচিতি দেখে পণ্য কিনতে আগ্রহী নয়; বরং পণ্যের পেছনের গল্প, কারিগরি, সাংস্কৃতিক গুরুত্ব, স্থায়িত্ব এবং সেটি তাদের নিজস্ব পরিচয়কে কতটা প্রকাশ করে—এসব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভারতে প্রায় ৩৭ কোটি ৭০ লাখ জেন-জি ভোক্তা রয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এই প্রজন্ম ইতিমধ্যে ভারতের মোট ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশকে প্রভাবিত করছে। এর আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৮৬ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই প্রভাব প্রায় ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিলাসপণ্যের অর্থ বদলে দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম

ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সম্প্রতি দেখা দেওয়া সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলনও তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, জেন-জি শুধু ভোক্তা হিসেবে নয়, সমাজ ও সংস্কৃতির গতিপথ নির্ধারণেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

Image may contain Ananya Panday Clothing Pants Sleeve Adult Person Jeans Accessories Glasses and Coat

ফ্যাশন জগতের তরুণ সৃজনশীল ব্যক্তিরা বলছেন, আগে জেন-জিকে অনেক সময় অলস বা অতিরিক্ত স্বাচ্ছন্দ্যপ্রিয় হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বাস্তবে তাদের আত্মসচেতনতা ও আত্মবিশ্বাসই এখন তাদের অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।

আগের প্রজন্ম যখন ভারতে আন্তর্জাতিক বিলাসব্র্যান্ডগুলোর প্রবেশ ও বিস্তার প্রত্যক্ষ করেছে, জেন-জি তখন এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড তাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতিরই অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাশন সপ্তাহ দেখা, নতুন নকশাকারদের কাজ সম্পর্কে জানা এবং দোকানে যাওয়ার আগেই পণ্যের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা তাদের জন্য স্বাভাবিক বিষয়।

তবে ভারতীয় জেন-জির বিশেষত্ব হলো, আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের পাশাপাশি তারা নিজেদের দেশের নকশাকার ও ব্র্যান্ডকেও সমান গুরুত্ব দেয়। ফলে স্থানীয় ফ্যাশন এখন আর আন্তর্জাতিক বিলাসবাজারের তুলনায় পিছিয়ে থাকা কোনো বিষয় নয়।

দোকানেও বদল আসছে কেনাকাটার ধরনে

বিলাসবাজারের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই পরিবর্তন বুঝতে শুরু করেছে। মুম্বাইয়ে ২০২৪ সালে গ্যালেরি লাফায়েতের প্রথম ভারতীয় শাখা চালুর পর আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় ব্র্যান্ডকে পাশাপাশি রাখার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তরুণ ক্রেতারা শুধু প্রতিষ্ঠিত নাম খুঁজছে না। একটি ব্র্যান্ডের সৃজনশীল পরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা, সহযোগিতামূলক কাজ এবং পণ্যের পেছনের গল্প তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই একই বিক্রয়কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ধ্রুব কাপুর, ভেরান্দাহ, আরকাইভ সিটি ও কার্তিক রিসার্চের মতো ভারতীয় ব্র্যান্ডও জায়গা করে নিচ্ছে।

অনলাইন কেনাকাটা জেন-জির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিলাসপণ্য কেনার ক্ষেত্রে বাস্তব দোকানের গুরুত্ব কমেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যম নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, আর দোকানে গিয়ে ক্রেতা পণ্যের মান, কাপড়, কারিগরি, মাপ ও ব্যবহারিক দিক যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়।

India's Gen Z Is Rewriting the Luxury Playbook | Vogue

ভারতের বিলাসবাজারের অন্যতম বড় অনলাইন বিক্রেতার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে তাদের মোট ক্রেতার ২০ শতাংশ ছিল জেন-জি। তারা মোট আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ এনে দিয়েছে। আনুষঙ্গিক পণ্য, জুতা ও সৌন্দর্যপণ্য তরুণদের জন্য বিলাসবাজারে প্রবেশের প্রধান দরজা হয়ে উঠছে। পোশাকের ক্ষেত্রে টি-শার্ট, সাধারণ শার্ট ও টপের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য পণ্যের চাহিদা বেশি।

নতুনত্বের চেয়ে মূল্য ও দীর্ঘস্থায়িত্ব

জেন-জির বিলাসপণ্য কেনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। তারা শুধু নতুন কিছু কেনার আনন্দে আগ্রহী নয়। বরং কেনার আগে ভাবছে—পণ্যটি কতবার ব্যবহার করা যাবে, দীর্ঘদিন রাখা যাবে কি না এবং এর জন্য খরচ করা অর্থের যথার্থ মূল্য পাওয়া যাবে কি না।

তরুণদের কাছে একই পোশাক বারবার পরা এখন আর অস্বস্তিকর বিষয় নয়। বরং একটি পোশাককে ভিন্নভাবে সাজিয়ে বারবার ব্যবহার করা তার মূল্য বাড়িয়ে দেয়। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেটি তুলে দেওয়ার সম্ভাবনাও পোশাকের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।

অর্থাৎ, পরিবেশবান্ধবতার ধারণার পাশাপাশি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্যতা। শুধু নতুন কিছু কেনা নয়, একটি পণ্যের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করাই হয়ে উঠছে নতুন বিলাসবোধ।

পুরোনো বিলাসপণ্যের নতুন জনপ্রিয়তা

এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে ব্যবহৃত বা আগের মালিকানাধীন বিলাসপণ্যের বাজারেও। ভারতে একসময় পুরোনো বিলাসপণ্য কেনার সঙ্গে সামাজিক সংকোচ জড়িয়ে থাকলেও সেই ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।

তরুণরা এখন পুরোনো হাতব্যাগ, ঘড়ি, বেল্ট কিংবা ঐতিহাসিক নকশার পোশাককে শুধু ব্যবহৃত পণ্য হিসেবে দেখছে না। এগুলোর মধ্যে তারা স্বাতন্ত্র্য, কারিগরি এবং ইতিহাস খুঁজে পাচ্ছে।

ভারতের একটি বিলাসপণ্য পুনর্বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তার মতে, সাশ্রয়ীভাবে কেনাকাটা করাও এখন তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। পুরোনো কিন্তু মানসম্পন্ন কোনো পণ্য পাওয়া গেলে সেটিকে কম মর্যাদার বিষয় হিসেবে না দেখে বরং বিশেষ ও আকর্ষণীয় পছন্দ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ভারতের পুনর্বিক্রয় বাজার এখনো পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি। একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান দেশটির বাজারে প্রবেশ করেও কয়েক বছরের মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে আস্থার সংকটকে দেখা হচ্ছে। অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনাবেচার বদলে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মজুত করা পণ্য কেনাকাটায় ক্রেতারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

How India's new-age affluence is reshaping the luxury playbook - ET Edge  Insights

বদলে যাচ্ছে ভারতীয় বিয়ের পোশাকের ধারণাও

জেন-জির পরিবর্তিত মানসিকতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিয়ের পোশাকে। ভারতীয় বিলাসবাজারে বিয়ের পোশাক একটি বড় চালিকাশক্তি হলেও তরুণ প্রজন্ম প্রশ্ন তুলছে—বিয়ের প্রতিটি পোশাকই কি নতুন করে কিনতে হবে?

পরিবারের পুরোনো শাড়ি, গয়না বা ঐতিহ্যবাহী পোশাককে নতুনভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে। তবে শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নয়, সেই পোশাকের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেই তরুণরা তা বেছে নিচ্ছে।

পুনর্ব্যবহৃত কাপড় ও দায়িত্বশীল উপকরণ নিয়ে কাজ করা একটি ভারতীয় পোশাক প্রতিষ্ঠানের মতে, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্রেতা জেন-জি। তাদের বড় একটি অংশ এমন দম্পতি, যারা বিয়ের পোশাকে পারিবারিক ঐতিহ্যকে নতুন নকশার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চান।

বিয়েতে এখন স্বাধীনতার পোশাক

ভারতের অন্যতম পরিচিত পোশাকনির্মাতা তরুণ প্রজন্মের বিয়ের পোশাকের পরিবর্তনকে আরও সরাসরি ব্যাখ্যা করেছেন। নতুন প্রজন্মের কনেরা বেশি স্বচ্ছন্দ পোশাক, খোলা গলার নকশা এবং নাচ-গান ও আনন্দের উপযোগী পোশাক চাইছে।

আগের মতো ভারী কাজ, অতিরিক্ত অলংকরণ ও জাঁকজমকই এখন বিয়ের পোশাকের একমাত্র পরিচয় নয়। নতুন প্রজন্মের কাছে নকশার ধারণা, শরীরের সঙ্গে পোশাকের স্বাভাবিক মানিয়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

A generation that has found its voice is now reshaping India's luxury  market.

এই পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক পোশাকও ভারতীয় বিয়ের অনুষ্ঠানে নতুন জায়গা তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বিলাসব্র্যান্ডগুলো ভারতীয় বিয়ের ঐতিহ্যকে সরিয়ে দেওয়ার বদলে তার পাশাপাশি নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

জেন-জি শুধু বেশি কিনছে না, ভেবেচিন্তে কিনছে

ভারতের বিলাসবাজারে জেন-জির সবচেয়ে বড় প্রভাব সম্ভবত তাদের কেনাকাটার পরিমাণে নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিতে। তারা ব্র্যান্ডের নামের চেয়ে অর্থ খুঁজছে, নতুনত্বের চেয়ে ব্যবহারযোগ্যতা দেখছে এবং প্রদর্শনের চেয়ে ব্যক্তিত্ব প্রকাশকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই প্রজন্মের কাছে বিলাসপণ্য মানে শুধু দামি কিছু মালিকানায় নেওয়া নয়। সেটি কতটা অর্থবহ, কতদিন ব্যবহার করা যাবে, কারিগরি কতটা ভালো এবং তাদের নিজস্ব গল্পের সঙ্গে কতটা মেলে—এসব প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে ভারতের বিলাসবাজারে ব্র্যান্ডগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তরুণ ক্রেতারা কী চায়, সেটি নিজেদের ধারণা দিয়ে নির্ধারণ করার বদলে তাদের কথা শুনতে হবে। কারণ জেন-জি হয়তো বেশি কিনছে না—তারা আরও সচেতনভাবে কিনছে।

ভারতের জেন-জি ও বিলাসবাজারের পরিবর্তন—সংক্ষেপে: নতুন প্রজন্মের ক্রেতারা ব্র্যান্ডের পরিচিতির চেয়ে পণ্যের গল্প, মান, দীর্ঘস্থায়িত্ব, ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

তালেবান শাসনে ২৪ লাখ আফগান কিশোরীর মাধ্যমিক শিক্ষা বন্ধ, অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান ইউনেস্কোর

ভারতের জেন-জি বদলে দিচ্ছে বিলাসপণ্যের বাজার, কেনাকাটায় গুরুত্ব পাচ্ছে অর্থ ও ব্যক্তিত্ব

১২:১৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

ভারতে জেন-জি এখন আর শুধু ভবিষ্যতের ক্রেতা নয়, বর্তমানের শক্তিশালী ভোক্তা গোষ্ঠী। ফ্যাশন, বিলাসপণ্য, বিয়ে কিংবা ব্যক্তিগত পোশাক—সব ক্ষেত্রেই এই প্রজন্মের কেনাকাটার ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে বাজারের প্রচলিত হিসাব। তারা শুধু নামী ব্র্যান্ডের পরিচিতি দেখে পণ্য কিনতে আগ্রহী নয়; বরং পণ্যের পেছনের গল্প, কারিগরি, সাংস্কৃতিক গুরুত্ব, স্থায়িত্ব এবং সেটি তাদের নিজস্ব পরিচয়কে কতটা প্রকাশ করে—এসব বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভারতে প্রায় ৩৭ কোটি ৭০ লাখ জেন-জি ভোক্তা রয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এই প্রজন্ম ইতিমধ্যে ভারতের মোট ভোক্তা ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশকে প্রভাবিত করছে। এর আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৮৬ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই প্রভাব প্রায় ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিলাসপণ্যের অর্থ বদলে দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম

ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সম্প্রতি দেখা দেওয়া সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলনও তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, জেন-জি শুধু ভোক্তা হিসেবে নয়, সমাজ ও সংস্কৃতির গতিপথ নির্ধারণেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

Image may contain Ananya Panday Clothing Pants Sleeve Adult Person Jeans Accessories Glasses and Coat

ফ্যাশন জগতের তরুণ সৃজনশীল ব্যক্তিরা বলছেন, আগে জেন-জিকে অনেক সময় অলস বা অতিরিক্ত স্বাচ্ছন্দ্যপ্রিয় হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বাস্তবে তাদের আত্মসচেতনতা ও আত্মবিশ্বাসই এখন তাদের অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।

আগের প্রজন্ম যখন ভারতে আন্তর্জাতিক বিলাসব্র্যান্ডগুলোর প্রবেশ ও বিস্তার প্রত্যক্ষ করেছে, জেন-জি তখন এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছে যেখানে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড তাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতিরই অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্যাশন সপ্তাহ দেখা, নতুন নকশাকারদের কাজ সম্পর্কে জানা এবং দোকানে যাওয়ার আগেই পণ্যের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা তাদের জন্য স্বাভাবিক বিষয়।

তবে ভারতীয় জেন-জির বিশেষত্ব হলো, আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের পাশাপাশি তারা নিজেদের দেশের নকশাকার ও ব্র্যান্ডকেও সমান গুরুত্ব দেয়। ফলে স্থানীয় ফ্যাশন এখন আর আন্তর্জাতিক বিলাসবাজারের তুলনায় পিছিয়ে থাকা কোনো বিষয় নয়।

দোকানেও বদল আসছে কেনাকাটার ধরনে

বিলাসবাজারের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এই পরিবর্তন বুঝতে শুরু করেছে। মুম্বাইয়ে ২০২৪ সালে গ্যালেরি লাফায়েতের প্রথম ভারতীয় শাখা চালুর পর আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় ব্র্যান্ডকে পাশাপাশি রাখার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তরুণ ক্রেতারা শুধু প্রতিষ্ঠিত নাম খুঁজছে না। একটি ব্র্যান্ডের সৃজনশীল পরিচয়, সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা, সহযোগিতামূলক কাজ এবং পণ্যের পেছনের গল্প তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই একই বিক্রয়কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ধ্রুব কাপুর, ভেরান্দাহ, আরকাইভ সিটি ও কার্তিক রিসার্চের মতো ভারতীয় ব্র্যান্ডও জায়গা করে নিচ্ছে।

অনলাইন কেনাকাটা জেন-জির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিলাসপণ্য কেনার ক্ষেত্রে বাস্তব দোকানের গুরুত্ব কমেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যম নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, আর দোকানে গিয়ে ক্রেতা পণ্যের মান, কাপড়, কারিগরি, মাপ ও ব্যবহারিক দিক যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়।

India's Gen Z Is Rewriting the Luxury Playbook | Vogue

ভারতের বিলাসবাজারের অন্যতম বড় অনলাইন বিক্রেতার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে তাদের মোট ক্রেতার ২০ শতাংশ ছিল জেন-জি। তারা মোট আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ এনে দিয়েছে। আনুষঙ্গিক পণ্য, জুতা ও সৌন্দর্যপণ্য তরুণদের জন্য বিলাসবাজারে প্রবেশের প্রধান দরজা হয়ে উঠছে। পোশাকের ক্ষেত্রে টি-শার্ট, সাধারণ শার্ট ও টপের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য পণ্যের চাহিদা বেশি।

নতুনত্বের চেয়ে মূল্য ও দীর্ঘস্থায়িত্ব

জেন-জির বিলাসপণ্য কেনার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত এখানেই। তারা শুধু নতুন কিছু কেনার আনন্দে আগ্রহী নয়। বরং কেনার আগে ভাবছে—পণ্যটি কতবার ব্যবহার করা যাবে, দীর্ঘদিন রাখা যাবে কি না এবং এর জন্য খরচ করা অর্থের যথার্থ মূল্য পাওয়া যাবে কি না।

তরুণদের কাছে একই পোশাক বারবার পরা এখন আর অস্বস্তিকর বিষয় নয়। বরং একটি পোশাককে ভিন্নভাবে সাজিয়ে বারবার ব্যবহার করা তার মূল্য বাড়িয়ে দেয়। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেটি তুলে দেওয়ার সম্ভাবনাও পোশাকের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।

অর্থাৎ, পরিবেশবান্ধবতার ধারণার পাশাপাশি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্যতা। শুধু নতুন কিছু কেনা নয়, একটি পণ্যের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করাই হয়ে উঠছে নতুন বিলাসবোধ।

পুরোনো বিলাসপণ্যের নতুন জনপ্রিয়তা

এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে ব্যবহৃত বা আগের মালিকানাধীন বিলাসপণ্যের বাজারেও। ভারতে একসময় পুরোনো বিলাসপণ্য কেনার সঙ্গে সামাজিক সংকোচ জড়িয়ে থাকলেও সেই ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।

তরুণরা এখন পুরোনো হাতব্যাগ, ঘড়ি, বেল্ট কিংবা ঐতিহাসিক নকশার পোশাককে শুধু ব্যবহৃত পণ্য হিসেবে দেখছে না। এগুলোর মধ্যে তারা স্বাতন্ত্র্য, কারিগরি এবং ইতিহাস খুঁজে পাচ্ছে।

ভারতের একটি বিলাসপণ্য পুনর্বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তার মতে, সাশ্রয়ীভাবে কেনাকাটা করাও এখন তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। পুরোনো কিন্তু মানসম্পন্ন কোনো পণ্য পাওয়া গেলে সেটিকে কম মর্যাদার বিষয় হিসেবে না দেখে বরং বিশেষ ও আকর্ষণীয় পছন্দ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ভারতের পুনর্বিক্রয় বাজার এখনো পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি। একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান দেশটির বাজারে প্রবেশ করেও কয়েক বছরের মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে আস্থার সংকটকে দেখা হচ্ছে। অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনাবেচার বদলে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মজুত করা পণ্য কেনাকাটায় ক্রেতারা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

How India's new-age affluence is reshaping the luxury playbook - ET Edge  Insights

বদলে যাচ্ছে ভারতীয় বিয়ের পোশাকের ধারণাও

জেন-জির পরিবর্তিত মানসিকতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিয়ের পোশাকে। ভারতীয় বিলাসবাজারে বিয়ের পোশাক একটি বড় চালিকাশক্তি হলেও তরুণ প্রজন্ম প্রশ্ন তুলছে—বিয়ের প্রতিটি পোশাকই কি নতুন করে কিনতে হবে?

পরিবারের পুরোনো শাড়ি, গয়না বা ঐতিহ্যবাহী পোশাককে নতুনভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে। তবে শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নয়, সেই পোশাকের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অর্থপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেই তরুণরা তা বেছে নিচ্ছে।

পুনর্ব্যবহৃত কাপড় ও দায়িত্বশীল উপকরণ নিয়ে কাজ করা একটি ভারতীয় পোশাক প্রতিষ্ঠানের মতে, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্রেতা জেন-জি। তাদের বড় একটি অংশ এমন দম্পতি, যারা বিয়ের পোশাকে পারিবারিক ঐতিহ্যকে নতুন নকশার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চান।

বিয়েতে এখন স্বাধীনতার পোশাক

ভারতের অন্যতম পরিচিত পোশাকনির্মাতা তরুণ প্রজন্মের বিয়ের পোশাকের পরিবর্তনকে আরও সরাসরি ব্যাখ্যা করেছেন। নতুন প্রজন্মের কনেরা বেশি স্বচ্ছন্দ পোশাক, খোলা গলার নকশা এবং নাচ-গান ও আনন্দের উপযোগী পোশাক চাইছে।

আগের মতো ভারী কাজ, অতিরিক্ত অলংকরণ ও জাঁকজমকই এখন বিয়ের পোশাকের একমাত্র পরিচয় নয়। নতুন প্রজন্মের কাছে নকশার ধারণা, শরীরের সঙ্গে পোশাকের স্বাভাবিক মানিয়ে যাওয়া এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

A generation that has found its voice is now reshaping India's luxury  market.

এই পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক পোশাকও ভারতীয় বিয়ের অনুষ্ঠানে নতুন জায়গা তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বিলাসব্র্যান্ডগুলো ভারতীয় বিয়ের ঐতিহ্যকে সরিয়ে দেওয়ার বদলে তার পাশাপাশি নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

জেন-জি শুধু বেশি কিনছে না, ভেবেচিন্তে কিনছে

ভারতের বিলাসবাজারে জেন-জির সবচেয়ে বড় প্রভাব সম্ভবত তাদের কেনাকাটার পরিমাণে নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিতে। তারা ব্র্যান্ডের নামের চেয়ে অর্থ খুঁজছে, নতুনত্বের চেয়ে ব্যবহারযোগ্যতা দেখছে এবং প্রদর্শনের চেয়ে ব্যক্তিত্ব প্রকাশকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই প্রজন্মের কাছে বিলাসপণ্য মানে শুধু দামি কিছু মালিকানায় নেওয়া নয়। সেটি কতটা অর্থবহ, কতদিন ব্যবহার করা যাবে, কারিগরি কতটা ভালো এবং তাদের নিজস্ব গল্পের সঙ্গে কতটা মেলে—এসব প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে ভারতের বিলাসবাজারে ব্র্যান্ডগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তরুণ ক্রেতারা কী চায়, সেটি নিজেদের ধারণা দিয়ে নির্ধারণ করার বদলে তাদের কথা শুনতে হবে। কারণ জেন-জি হয়তো বেশি কিনছে না—তারা আরও সচেতনভাবে কিনছে।

ভারতের জেন-জি ও বিলাসবাজারের পরিবর্তন—সংক্ষেপে: নতুন প্রজন্মের ক্রেতারা ব্র্যান্ডের পরিচিতির চেয়ে পণ্যের গল্প, মান, দীর্ঘস্থায়িত্ব, ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।