মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট চলতি মাসের শেষেই দায়িত্ব ছাড়ছেন। তবে প্রেস সেক্রেটারির পদ থেকে সরে গেলেও তিনি ট্রাম্পের অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন। বুধবার ট্রাম্প নিজেই এ ঘোষণা দিয়েছেন।
২৮ বছর বয়সী লেভিট যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে প্রেসিডেন্টের প্রধান মুখপাত্রের দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি। দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে তীব্র বাক্যবিনিময়, কড়া মন্তব্য এবং ট্রাম্পের প্রতি দৃঢ় আনুগত্যের জন্য তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রায়ই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান তুলে ধরেছেন।
পরিবারকে বেশি সময় দিতে পদত্যাগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন লেভিট মাসের শেষে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি লেভিটের দুই ছোট সন্তান ও পরিবারের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর ইচ্ছার কথা উল্লেখ করেন।

ট্রাম্প আরও জানান, দায়িত্ব ছাড়ার পরও লেভিট তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাইরের উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন এবং রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে প্রভাবশালী কণ্ঠ হিসেবে ভূমিকা রাখবেন।
লেভিটও ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, হোয়াইট হাউসের মঞ্চে প্রেসিডেন্টের পক্ষে কথা বলার সুযোগ তাঁর জন্য বিশেষ সম্মানের ছিল। সাংবাদিকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাফল্য সম্পর্কে জনগণকে জানানোর কাজ তিনি উপভোগ করেছেন বলেও জানান।
তবে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর দায়িত্ব সামলানোর বাস্তবতা তাঁকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে। মে মাসে তিনি তাঁর দ্বিতীয় সন্তান কন্যা ভিভিয়ানার জন্মের কথা জানান। এরপর মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে হোয়াইট হাউসে ফিরে এসে তিনি উপলব্ধি করেন, দুই ছোট সন্তানের প্রতি যে সময় ও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্বের সঙ্গে তা যথাযথভাবে পালন করা কঠিন।
ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক
লেভিটের সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সম্পর্ক নতুন নয়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর প্রেস দপ্তরে কাজ করেন। এরপর ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
টেলিভিশন বিতর্ক ও প্রচারণায় ট্রাম্পের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণে তিনি দ্রুত প্রেসিডেন্টের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও ছিল স্পষ্টভাবে ট্রাম্পপন্থী।

২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হওয়ার পর ২০২২ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে কংগ্রেসের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন লেভিট। তবে সেই নির্বাচনে তিনি জয় পাননি। প্রচারণায় তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান এবং অস্ত্র রাখার অধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বদলে যায় হোয়াইট হাউসের সম্পর্ক
প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে লেভিটের সময় নিয়মিত হোয়াইট হাউস সংবাদ সম্মেলন আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে একই সঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সম্পর্কেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেভিট ঘোষণা করেন, ওভাল অফিস ও প্রেসিডেন্টের বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের কাছাকাছি থেকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য কোন সাংবাদিকরা সুযোগ পাবেন, সেই সিদ্ধান্ত স্বাধীন সংবাদদাতা সংগঠনের বদলে হোয়াইট হাউস নিজেই নেবে।
এর পাশাপাশি ট্রাম্পপন্থী ও ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমের জন্য সংবাদ সম্মেলনে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো হয়। এতে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে আসে। লেভিটের এই নীতিকে ঘিরে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
নিউ হ্যাম্পশায়ারে বেড়ে ওঠা লেভিটের রাজনৈতিক সক্রিয়তার শুরু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই। ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পত্রিকায় চিঠি লিখে তিনি প্রতিবাদ করেছিলেন, কারণ এক অধ্যাপক শ্রেণিকক্ষে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম দৃশ্যমান তরুণ মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। সম্প্রতি তিনি এমন বক্তব্যও দিয়েছেন, যেখানে ডেমোক্রেটিক পার্টিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়লেও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান পার্টির জন্য তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
লেভিটের পদত্যাগ এমন এক সময়ে হলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসন জনসমর্থনের চাপের মুখে রয়েছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে।
ট্রাম্পের অন্যতম বিশ্বস্ত মুখ হিসেবে পরিচিত লেভিটের এই বিদায় তাই শুধু একজন প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পরিবর্তন নয়; বরং হোয়াইট হাউসের রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
ট্রাম্পের মুখপাত্রের পদ ছাড়লেও রাজনীতির মঞ্চ থেকে লেভিট যে সরে যাচ্ছেন না, তাঁর নতুন উপদেষ্টা ভূমিকার ঘোষণা সেটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের নতুন সমীকরণে লেভিটের প্রভাব কতটা থাকবে, তা এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















