ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত কাটেনি। বৃহস্পতিবার অধিবেশন শেষ হওয়ার আগে লোকসভা মুলতবি হয়ে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আলোচনার প্রস্তাবও বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা তৈরি করতে পারেনি।
অধিবেশনের শেষ দিনেও সংসদ চত্বরে বিরোধী সদস্যদের বিক্ষোভ চলে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশি পদক্ষেপ, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং সরকারের জবাবদিহি—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই মূলত বিরোধীদের প্রতিবাদ চলছিল। একই সঙ্গে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের উত্তরাখণ্ডের হালদ্বানি সমাবেশের পর আয়োজিত কথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠান নিয়েও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
অমিত শাহের প্রস্তাব, রাহুলের প্রত্যাখ্যান
অধিবেশনের শেষের আগের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, বিরোধীরা স্পিকারকে লিখিতভাবে জানালে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে এবং তিনি তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত।
কিন্তু লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী সেই প্রস্তাবকে ‘শেষ মুহূর্তের চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর বক্তব্য, বিরোধীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তৃতা শুনতে চান না; তারা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি উত্তর চান।
রাহুলের প্রশ্ন ছিল, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ কে দিয়েছিল এবং সরকার কেন এতদিন সংসদে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেয়নি। অমিত শাহের প্রস্তাবের পরও বিরোধী শিবিরের অবস্থান বদলায়নি। এ নিয়ে সংসদে অচলাবস্থাও কাটেনি।

শেষ দিনেও বিক্ষোভ
বৃহস্পতিবার অধিবেশনের শুরুতেই বিরোধী সংসদ সদস্যরা সংসদ চত্বরে বিক্ষোভ করেন। কংগ্রেস সাংসদ পবন খেরার নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা একটি খেলনা বানর হাতে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সাগরিকা ঘোষ অভিযোগ করেন, পুরো বর্ষাকালীন অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেখাননি। শিক্ষার্থীদের বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার দাবি জানালেও সরকার শেষ মুহূর্তে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সরকারপক্ষ অবশ্য বিরোধীদের বিরুদ্ধে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত করার অভিযোগ তোলে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করে বলেন, তিনি নিট-সংক্রান্ত বিতর্কে আলোচনায় যেতে চান না। তিনি অমিত শাহের আলোচনার প্রস্তাবকে বিরোধীদের সামনে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন।
খাড়গের সমাবেশের পর ‘শুদ্ধিকরণ’ বিতর্ক
অধিবেশনের শেষ দিনে নতুন করে উত্তাপ বাড়ায় উত্তরাখণ্ডের হালদ্বানিতে মল্লিকার্জুন খাড়গের সমাবেশের পর আয়োজিত ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠান। ৮ আগস্ট খাড়গে সেখানে একটি সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার পর রামলীলা ময়দানে ওই অনুষ্ঠান করা হয়।
কংগ্রেসের অভিযোগ, খাড়গে দলিত সম্প্রদায়ের হওয়ায় তাঁর সমাবেশের পর এমন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। উত্তরাখণ্ড কংগ্রেসের সভাপতি গণেশ গোদিয়াল ঘটনাটিকে জাতপাতের বিভাজন উসকে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে বিজেপি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাজ্যসভায় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে নিজেও এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ধর্মের নামে সমাজে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে এবং ঘটনাটি দলিতবিরোধী মানসিকতার প্রকাশ।
বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা অবশ্য খাড়গের প্রতি দলের সম্মানের কথা জানিয়ে ঘটনাটির তদন্তের আশ্বাস দেন। তিনি হালদ্বানির ঘটনার নিন্দাও করেন।
বিদেশি অনুদান আইন নিয়েও বিতর্ক

অধিবেশনের মাঝেই বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনী বিল নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে নতুন বিরোধ তৈরি হয়। লোকসভা বিলটি ৩১ সদস্যের যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটিতে লোকসভা থেকে ২১ জন এবং রাজ্যসভা থেকে ১০ জন সদস্য থাকার কথা।
বিলটির প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে বিরোধী দল, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন এবং কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা আপত্তি জানিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা কে সি ভেনুগোপাল বলেন, কমিটিতেও তারা বিলটির বিরোধিতা চালিয়ে যাবেন। তাঁর অভিযোগ, প্রস্তাবিত কিছু ধারা সংবিধানবিরোধী ও দমনমূলক।
অন্যদিকে সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, বিলটি যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর মাধ্যমে বিস্তারিত পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিরোধীদেরও সেখানে নিজেদের আপত্তি তুলে ধরার সুযোগ থাকবে বলে তিনি জানান।
অচলাবস্থার মধ্যেই শেষ অধিবেশন
শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী বিক্ষোভ নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। বিরোধীরা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের দাবি জানিয়ে যায়, আর সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলে। কিন্তু আলোচনার পদ্ধতি ও সময় নিয়ে মতপার্থক্য থেকেই যায়।
বৃহস্পতিবার লোকসভা কার্যক্রম শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুলতবি হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে বর্ষাকালীন অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে। অমিত শাহ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি লোকসভায় এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি।
সংসদের এই অধিবেশন তাই আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সরকার ও বিরোধীদের তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে জবাবদিহির দাবি এবং জাতপাত ও ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে বিতর্কের জন্যও আলোচনায় থেকে গেল।
ভারতের সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হলেও এসব ইস্যু ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ যে এখানেই শেষ হচ্ছে না, শেষ দিনের ঘটনাপ্রবাহই তার ইঙ্গিত দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















