রাশিয়া থেকে ইরান হয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত যে আন্তর্জাতিক উত্তর–দক্ষিণ পরিবহন করিডর বা আইএনএসটিসি গড়ে তোলার উদ্যোগ দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলছে, ২০২৬ সালে এসে সেটি নতুন ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সমুদ্রপথের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে মস্কো এখন ইউরোপকেন্দ্রিক পুরোনো বাণিজ্যপথের বিকল্প হিসেবে দক্ষিণমুখী স্থল, রেল ও সমুদ্র সংযোগকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত নতুন দিক হলো পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দরকে এই করিডরের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। গওয়াদর বন্দর বর্তমানে আইএনএসটিসির মূল বা আনুষ্ঠানিক রুটের অংশ নয়। পাকিস্তান ২০২৪ সালেই রাশিয়ার আমন্ত্রণে করিডরে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নীতিগতভাবে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানিয়েছিল। ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বিশেষ সহকারী তালহা বুরকি আরও স্পষ্টভাবে জানান, ইসলামাবাদ রাশিয়ার উত্তর–দক্ষিণ করিডরের সঙ্গে গওয়াদর বন্দরকে যুক্ত করতে আগ্রহী। পাকিস্তানের সরকারি নথিতে রুশ উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই ওভেরচুকের গওয়াদরকে করিডরের সঙ্গে যুক্ত করার সমর্থনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, গওয়াদরকে আইএনএসটিসির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি এখনো একটি প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ—এটি এমন কোনো বাস্তবায়িত রেলপথ নয়, যেখানে রাশিয়া থেকে সরাসরি গওয়াদরে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়ে গেছে।
আসলে কী এই উত্তর–দক্ষিণ করিডর?
আন্তর্জাতিক উত্তর–দক্ষিণ পরিবহন করিডর মূলত একটি বহুমাত্রিক বাণিজ্য নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে রেল, সড়ক ও সমুদ্রপথ একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। ২০০০ সালে রাশিয়া, ইরান ও ভারত এই উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করে এবং ২০০২ সালে চুক্তিটি কার্যকর হয়। পরবর্তী সময়ে আজারবাইজানসহ আরও কয়েকটি দেশ এতে যুক্ত হয়।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের নথিতে করিডরটির মূল সংজ্ঞায় ভারত ও ওমান থেকে সমুদ্রপথে ইরান, কাস্পিয়ান সাগর, রাশিয়া এবং তার পরবর্তী গন্তব্যের কথা বলা হয়েছে।
এর বহুল আলোচিত মূল সংযোগটি প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে পণ্য সমুদ্রপথে ইরানে যাবে; এরপর ইরানের সড়ক ও রেলপথ পেরিয়ে কাস্পিয়ান সাগর অতিক্রম করে রাশিয়ায় পৌঁছাবে। সেখান থেকে রুশ রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পণ্য উত্তর ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে যেতে পারবে।
ভারত সরকারের বন্দর মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় চাবাহার–বান্দার আব্বাস–আনজালি–আস্ত্রাখান হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সংযোগ তৈরির সম্ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চাবাহারকে ভারত মধ্য এশিয়া ও ইউরেশিয়ার বাজারে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে।
এ কারণেই আইএনএসটিসিকে শুধু একটি রেলপথ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বিভিন্ন দেশের রেললাইন, মহাসড়ক, বন্দর, ফেরি, কাস্টমস ব্যবস্থা ও লজিস্টিক কেন্দ্রকে একটি একক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা।
কেন রাশিয়ার কাছে এই করিডর এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ইউরোপমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা মস্কোকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে আরও জোরালোভাবে তাকাতে বাধ্য করেছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আইএনএসটিসির প্রতি রাশিয়ার আগ্রহ ২০২২ সালের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কারণ করিডরটি রাশিয়ার জন্য পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সরবরাহব্যবস্থার বাইরে নতুন বাণিজ্যপথ তৈরির সুযোগ তৈরি করে। গবেষণাটিতে করিডরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য এখনও বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং এর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
রাশিয়ার জন্য বিষয়টি শুধু পণ্য পরিবহনের খরচ কমানোর নয়। এটি বাণিজ্যপথের ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প তৈরি করার বিষয়।
ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে রাশিয়ার সামনে প্রশ্ন থাকে—তার পণ্য কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে এবং কোন বন্দর ও কোন রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে হবে?
উত্তর–দক্ষিণ করিডর সেই প্রশ্নের একটি সম্ভাব্য উত্তর।
সুয়েজ খালের বিকল্প কতটা কার্যকর?

এই করিডরের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো সময় ও দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনা।
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ভারত থেকে রাশিয়া বা উত্তর ইউরোপে পণ্য পাঠাতে প্রচলিত সুয়েজ খালনির্ভর সমুদ্রপথের তুলনায় আইএনএসটিসি ব্যবহার করলে দূরত্ব ও পরিবহন সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। ভারতীয় মালবাহী পরিবহন সংগঠনের পুরোনো পরীক্ষামূলক হিসাবের ভিত্তিতে ভারতীয় কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স বলেছে, ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে সময় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং পরিবহন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমতে পারে।
আরেকটি গবেষণায় সেন্ট পিটার্সবার্গ–মুম্বাই রুটের দূরত্ব প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার থেকে প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটারে নামার সম্ভাবনা এবং পরিবহন সময় ৩০–৪৫ দিন থেকে প্রায় ১৫–২৪ দিনে নামার হিসাব দেওয়া হয়েছে।
তবে এগুলো সম্ভাব্য বা পরীক্ষামূলক হিসাব। বাস্তবে সীমান্তে কাস্টমস, রেলপথের সক্ষমতা, বিভিন্ন দেশের রেলগেজ, কাস্পিয়ান সাগরের জাহাজ চলাচল, বন্দর সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছুই চূড়ান্ত সময় ও ব্যয়কে প্রভাবিত করবে।
অর্থাৎ, মানচিত্রে পথ ছোট হলেই বাস্তবে পণ্য দ্রুত পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে বড় বাধা রাশিয়া–ইরান সীমান্তে
আইএনএসটিসির পশ্চিম রুটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অসম্পূর্ণ অংশ হলো ইরানের রাশত–আস্তারা রেলপথ।
ইরানের রাশত থেকে আজারবাইজানের আস্তারা পর্যন্ত প্রায় ১৬৪ কিলোমিটার রেল সংযোগ সম্পূর্ণ হলে কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিম তীর ধরে রাশিয়া–আজারবাইজান–ইরান সংযোগ আরও কার্যকর হবে।
রাশিয়ার সরকার জানিয়েছে, রাশত–আস্তারা রেলপথ নির্মাণের প্রস্তুতি এগোচ্ছে এবং করিডরের মাধ্যমে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ টন পণ্য পরিবহনের লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া, ইরান ও আজারবাইজান পরিবহন ও কাস্টমস সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য সমন্বয় কাঠামো গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রাশিয়া এই প্রকল্পে অর্থায়নেও বড় ভূমিকা নিচ্ছে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য রুশ অর্থায়ন ছাড়া করিডরের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন কঠিন। গবেষণাটি বিশেষভাবে সতর্ক করেছে যে, রেলপথ, বন্দর, গুদাম ও অন্যান্য অবকাঠামোতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ না হলে করিডরটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করা কঠিন হবে।
এখানেই প্রকল্পটির বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিকভাবে করিডরটি যতটা আকর্ষণীয়, অবকাঠামোগতভাবে সেটি এখনো ততটা সম্পূর্ণ নয়।
তাহলে গওয়াদর কোথায়?
গওয়াদর পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে আরব সাগরের তীরে অবস্থিত একটি গভীর সমুদ্রবন্দর। এটি চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত।
চাবাহার ও গওয়াদরের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে দুই বন্দরকে ঘিরে বহু বছর ধরে ভারত–চীন প্রতিযোগিতার একটি ভূরাজনৈতিক মাত্রা তৈরি হয়েছে। চাবাহারে ভারতীয় বিনিয়োগ রয়েছে; অন্যদিকে গওয়াদর চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অন্যতম প্রতীকী অবকাঠামো। ২০২৬ সালের একটি সিএসআইএস বিশ্লেষণেও চাবাহার ও গওয়াদরকে একই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
এখন পাকিস্তান চাইছে, গওয়াদরকে শুধু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডের বন্দর হিসেবে না রেখে রাশিয়া–ইরানভিত্তিক উত্তর–দক্ষিণ করিডরের সঙ্গেও যুক্ত করতে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গওয়াদরের চরিত্র বদলে যেতে পারে।
বন্দরটি তখন কেবল পাকিস্তান বা চীনের জন্য একটি অবকাঠামো নয়; বরং মধ্য এশিয়া, রাশিয়া, ইরান, চীন, আরব সাগর এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী একটি বহুমুখী ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে।
কিন্তু গওয়াদর কি এখনই আইএনএসটিসির অংশ?
না।
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
২০২৪ সালের জুনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, রাশিয়া পাকিস্তানকে আইএনএসটিসিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং ইসলামাবাদ বিষয়টি মূল্যায়ন করছে। পাকিস্তান তখন নীতিগতভাবে এতে আপত্তি নেই বলেও জানিয়েছিল।
২০২৬ সালের মে মাসে তালহা বুরকি বলেন, পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর–দক্ষিণ করিডর-সংক্রান্ত পরিকল্পনার অংশ হতে আগ্রহী এবং গওয়াদরকে আইএনএসটিসির সঙ্গে যুক্ত করতে চায়।
অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতিকে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায়—“আইএনএসটিসির সঙ্গে গওয়াদরকে যুক্ত করার উদ্যোগ”।
এটি এখনো “রাশিয়া–ইরান–গওয়াদর সরাসরি চালু বাণিজ্যপথ” নয়।

গওয়াদর যুক্ত হলে পাকিস্তানের কী লাভ?
পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো ট্রানজিট অর্থনীতি।
দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, মধ্য এশিয়া ও চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে আরব সাগরের দিকে এবং রাশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে পণ্য পরিবহনে পাকিস্তান একটি সম্ভাব্য সংযোগস্থল হতে পারে।
পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারাও এই সম্ভাবনার ওপর জোর দিচ্ছেন। দেশটির বিদ্যুৎমন্ত্রী আওয়াইস লেঘারি বলেছেন, মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক স্থলপথ পুনরুজ্জীবন এবং উত্তর–দক্ষিণ করিডর পাকিস্তান–রাশিয়া বাণিজ্য বাড়াতে পারে।
চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ২০২৬ সালের মে মাসের যৌথ ঘোষণাতেও গওয়াদরকে আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
সফল হলে পাকিস্তান তিনটি সুবিধা পেতে পারে।
প্রথমত, বন্দর আয় ও ট্রানজিট ফি বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, গওয়াদরকে কেন্দ্র করে গুদাম, পরিবহন, বীমা, ব্যাংকিং, কাস্টমস ও লজিস্টিক ব্যবসার বিস্তার হতে পারে।
তৃতীয়ত, পাকিস্তান নিজেকে শুধু একটি বাজার হিসেবে নয়, ইউরেশিয়ার বাণিজ্যপথের একটি মধ্যবর্তী কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাবে।
তবে এর জন্য শুধু বন্দর নির্মাণ যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কাস্টমসের দক্ষতা, বন্দর পরিচালনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—সবকিছুর উন্নতি প্রয়োজন।
চীনের জন্য এটি সুযোগ, নাকি নতুন প্রতিযোগিতা?
গওয়াদরকে আইএনএসটিসির সঙ্গে যুক্ত করার সবচেয়ে কৌশলগত দিকটি এখানেই।
গওয়াদর চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের অংশ। অন্যদিকে আইএনএসটিসি রাশিয়া–ইরান–ভারতকেন্দ্রিক একটি উদ্যোগ। ফলে গওয়াদরকে আইএনএসটিসির সঙ্গে যুক্ত করা হলে একই বন্দর একাধিক বৃহৎ ইউরেশীয় সংযোগব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তারা এটিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই দেখছেন। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইএনএসটিসি–গওয়াদর সংযোগ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপস্থিত সংযোগ পূরণ করতে পারে।
এখানে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে—চীনের বন্দর অবকাঠামো এবং রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন বাণিজ্যপথ একই নেটওয়ার্কে এসে মিলবে।
এতে চীন রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের একটি নতুন দক্ষিণমুখী পথ পেতে পারে। আবার পাকিস্তানও একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের মধ্যে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
ভারতের অবস্থান সবচেয়ে জটিল।
আইএনএসটিসির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ভারত। চাবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারত বহু বছর ধরে পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও ইউরেশিয়ায় প্রবেশের পথ তৈরি করতে চেয়েছে।
ভারতীয় সরকারের নিজস্ব ব্যাখ্যায় চাবাহারকে আইএনএসটিসির সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে ভারত রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার বাজারে দ্রুততর প্রবেশাধিকার পেতে পারে।
কিন্তু গওয়াদর একই করিডরের সঙ্গে যুক্ত হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে।
ভারতের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা চাবাহারের পাশে গওয়াদরও একটি উত্তর–দক্ষিণ সংযোগকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
তবে এটিকে সরলভাবে “ভারতের পরাজয়” বলা যাবে না। কারণ ভারতের জন্য আইএনএসটিসির মূল গুরুত্ব রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য সংযোগ। গওয়াদর যুক্ত হলেও ভারত তার নিজস্ব চাবাহার–কেন্দ্রিক রুট বজায় রাখতে পারবে।
বরং সম্ভাব্য ফল হবে—একটি করিডরের মধ্যে একাধিক বন্দর ও রুট তৈরি হবে।
এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে পুরো অঞ্চলের বাণিজ্য নেটওয়ার্কও আরও বহুমুখী হতে পারে।
ইরানের অবস্থান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
গওয়াদর যুক্ত করার পরিকল্পনার মাঝেও ইরানকে বাদ দেওয়া যাবে না।
আইএনএসটিসির মূল কাঠামোর কেন্দ্রে ইরান রয়েছে। কাস্পিয়ান সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত সংযোগ তৈরির ক্ষেত্রে ইরানই মূল সেতু।
এই কারণে ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অবকাঠামো এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
২০২৬ সালের কার্নেগি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা অস্থিতিশীলতা হলে উত্তর–দক্ষিণ করিডরের কার্যকারিতা ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সিএসআইএসও বলেছে, আইএনএসটিসির পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও বড় বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল।
অর্থাৎ, গওয়াদর যতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক, করিডরের কেন্দ্রীয় ইরানি অংশ দুর্বল থাকলে পুরো নেটওয়ার্ক তার কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতায় পৌঁছাবে না।

রাশিয়ার জন্য গওয়াদর কী বদল আনতে পারে?
রাশিয়া যদি গওয়াদরের সঙ্গে কার্যকর স্থল ও সমুদ্র সংযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে ভারত মহাসাগরে তার প্রবেশের বিকল্প আরও বাড়বে।
বর্তমানে আইএনএসটিসির মূল পরিকল্পনায় রাশিয়া ইরান হয়ে পারস্য উপসাগর ও ভারতের দিকে যেতে পারে। গওয়াদর যুক্ত হলে দক্ষিণমুখী নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত হবে।
এতে রাশিয়ার পণ্য—বিশেষ করে জ্বালানি, ধাতু, সার, শস্য, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিল্পপণ্য—দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পৌঁছানোর নতুন সুযোগ পেতে পারে।
একইভাবে পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়া থেকে রাশিয়ার বাজারে কৃষিপণ্য, খনিজ ও অন্যান্য পণ্য পাঠানো সহজ হতে পারে।
কিন্তু এখানে আবারও অর্থনীতির প্রশ্নটি সামনে আসে।
রুট তৈরি করা আর রুটকে লাভজনক করা এক বিষয় নয়।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: ভূরাজনীতি
এই করিডরের সবচেয়ে বড় শক্তিই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—এটি এমন একটি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে যেখানে একাধিক বড় শক্তির স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে নতুন বাজার খুঁজছে।
ইরান পশ্চিমা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে বিকল্প বাণিজ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাইছে।
ভারত রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে পশ্চিমা অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
চীন বেল্ট অ্যান্ড রোডের মাধ্যমে ইউরেশিয়ার অবকাঠামোতে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে।
পাকিস্তান চায় গওয়াদরকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করতে।
এই স্বার্থগুলো এক জায়গায় মিললেও সবসময় একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নিরাপত্তা কি গওয়াদরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
অবশ্যই।
গওয়াদর বেলুচিস্তানে অবস্থিত। সেখানে নিরাপত্তা সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বড় উদ্বেগের বিষয়। বন্দর, সড়ক, রেল ও শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করতে হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ইরান ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলও নিরাপত্তার দিক থেকে সংবেদনশীল।
ফলে রাশিয়া থেকে গওয়াদর পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যপথ তৈরি করতে শুধু রেললাইন ও সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না; পুরো রুটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে।
আরেকটি প্রশ্ন—করিডর কি সত্যিই লাভজনক হবে?
এখানেই গবেষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা।
সিএসআইএসের ২০২৬ সালের গবেষণায় বলা হয়েছে, আইএনএসটিসির কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট হলেও এর পূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এখনো নিশ্চিত নয়।
কার্নেগি এনডাওমেন্টও বলেছে, রাশিয়ার জন্য করিডরটির কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক লাভজনকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতীয় ও আঞ্চলিক গবেষণায় সময় ও পরিবহন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালে আইএনএসটিসির পূর্ব ও পশ্চিম রুটে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ টন পণ্য পরিবহনের তথ্যও ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন উল্লেখ করেছে। তবে একই গবেষণায় বলা হয়েছে, কনটেইনার পরিবহনের অংশ এখনো অন্যান্য ইউরেশীয় করিডরের তুলনায় কম।
অর্থাৎ, করিডরটি অকার্যকর নয়; কিন্তু এখনো তার পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছায়নি।

তাহলে গওয়াদর যুক্ত হলে কী হতে পারে?
সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল হবে একটি “করিডর থেকে নেটওয়ার্কে” রূপান্তর।
এখন পর্যন্ত আইএনএসটিসিকে অনেকটা নির্দিষ্ট উত্তর–দক্ষিণ অক্ষ হিসেবে দেখা হয়েছে—রাশিয়া, ইরান, ভারত এবং সংশ্লিষ্ট মধ্যবর্তী দেশগুলোর মধ্যে।
গওয়াদর যুক্ত হলে একই ব্যবস্থায় আরব সাগরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর যুক্ত হবে। তখন চাবাহার ও গওয়াদর পাশাপাশি বিকল্প দক্ষিণী প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে।
এর ফলে—
রাশিয়া পাবে ভারত মহাসাগরে আরও একটি সম্ভাব্য প্রবেশপথ;
পাকিস্তান পেতে পারে ট্রানজিট ও লজিস্টিক ব্যবসার নতুন সুযোগ;
চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড অবকাঠামোর সঙ্গে রাশিয়া–ইরানভিত্তিক করিডরের সমন্বয়ের সুযোগ পাবে;
ইরান পাবে নতুন বাণিজ্যপথের সঙ্গে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ;
ভারতকে চাবাহার ও নিজস্ব আইএনএসটিসি রুটের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে হবে;
আর মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর জন্য আরও বেশি বিকল্প পেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?
বাংলাদেশ সরাসরি আইএনএসটিসির অংশ নয়। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য কাঠামো বদলালে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে।
একদিকে, ভারত মহাসাগরকেন্দ্রিক নতুন বাণিজ্য নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হলে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারের জন্য পরোক্ষ সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, চাবাহার ও গওয়াদরের মতো বন্দর যদি ইউরেশীয় ট্রানজিট বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তাহলে ভারত মহাসাগরে বন্দরগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরকেও তখন শুধু জাতীয় আমদানি–রপ্তানির অবকাঠামো হিসেবে নয়, আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবহন করিডরগুলোকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাব্য হাতিয়ার হিসেবে দেখিয়ে আসছে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো—নতুন ইউরেশীয় বাণিজ্যপথ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেই নেটওয়ার্কে জায়গা পেতে হলে শুধু ভৌগোলিক অবস্থান যথেষ্ট নয়। দক্ষ বন্দর, দ্রুত কাস্টমস, রেল সংযোগ, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নির্ভরযোগ্য নীতিগত পরিবেশও প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত কার জয়?
উত্তরটি কোনো একটি দেশের নাম দিয়ে দেওয়া কঠিন।
রাশিয়া চাইছে পশ্চিমা নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষিণ ও পূর্বমুখী বাণিজ্যপথ শক্তিশালী করতে।
ইরান চাইছে নিজেকে ইউরেশিয়ার অপরিহার্য ট্রানজিট রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।
ভারত চাইছে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার বাজারে দ্রুত প্রবেশ করতে।
চীন চাইছে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত করতে।
পাকিস্তান চাইছে গওয়াদরকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র বানাতে।
এই সব লক্ষ্য যদি একই নেটওয়ার্কে সমন্বিত করা যায়, তাহলে উত্তর–দক্ষিণ করিডর শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প থাকবে না; এটি ইউরেশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ এখনো নিশ্চিত নয়।
রাশত–আস্তারা রেলপথ, ইরানের অবকাঠামো, কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা, অর্থায়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—প্রতিটি স্তরেই বড় প্রশ্ন রয়েছে।
আর গওয়াদর সংযোগের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও বড়: পাকিস্তান কি বাস্তবে এমন একটি রেল–সড়ক–বন্দর নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবে, যা রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার পণ্যকে ধারাবাহিকভাবে আরব সাগরে পৌঁছে দেবে?
যদি পারে, তাহলে গওয়াদর শুধু চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের একটি বন্দর থাকবে না। এটি রাশিয়ার উত্তর–দক্ষিণ বাণিজ্য নেটওয়ার্ক, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড এবং ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের সংযোগস্থলে পরিণত হতে পারে।
আর যদি অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন না করে, তাহলে গওয়াদর–আইএনএসটিসি সংযোগ আরেকটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু অপূর্ণ ইউরেশীয় করিডর পরিকল্পনা হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাই ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন।
রাশিয়ার উত্তর–দক্ষিণ করিডরের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে মানচিত্রে আঁকা রেখায় নয়—কত কিলোমিটার রেললাইন তৈরি হলো, কত টন পণ্য নিয়মিত চলল, সীমান্তে কত সময় লাগল, বন্দর কত দ্রুত কার্গো সামলাতে পারল এবং ব্যবসায়ীরা সত্যিই এই পথকে লাভজনক মনে করলেন কি না—তার ওপর।
সেই পরীক্ষায় গওয়াদর যুক্ত হতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি যেমন বদলাবে, তেমনি বদলাতে পারে ইউরেশিয়ার বাণিজ্যের দিকনির্দেশও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















