ব্রিটেনের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি দীর্ঘ খরা ও তীব্র গরমে পুড়ে যাচ্ছে। ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে নানা সংকট। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষক ও কলামিস্ট জর্জ মনবিওট।
ব্রিটেনে সাধারণত কোনো এক মৌসুমে দেশীয় ফসলের উৎপাদন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্য আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়। কিন্তু চলতি পরিস্থিতি আগের মতো স্বাভাবিক নয়। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলেও অতিরিক্ত তাপ ও খরার প্রভাব পড়েছে। ফলে একসঙ্গে বহু উৎপাদনকারী দেশ ক্ষতির মুখে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদনে চাপ
ব্রিটেনের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কৃষকেরাও তীব্র খরা ও মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ার সমস্যায় পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে গম উৎপাদনও কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কানাডায় ভালো উৎপাদনের পূর্বাভাস থাকলেও সাম্প্রতিক তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় বসন্তকালীন গমের ক্ষেতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইউক্রেনে কৃষি উৎপাদনের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও রুশ হামলায় দেশটির বন্দর ও রপ্তানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শস্য রপ্তানির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থাও ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় খাদ্য ও কৃষি উপকরণের বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে পানামা খালের ওপর চাপ বাড়লেও সেখানেও খরার কারণে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ দেখা দিয়েছে।
ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা
খাদ্য সরবরাহের এই সংকট শুধু তাৎক্ষণিক ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি করছে না। এর বড় সমস্যা হলো, বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থাই দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহন, কৃষি উপকরণ, সার, জ্বালানি ও উৎপাদনব্যবস্থা—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিলে তার প্রভাব দ্রুত অন্য দেশ ও অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের একটি প্রতিবেদনে দেশটির খাদ্য সরবরাহকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কৌশলগত ঝুঁকিতে থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

খাদ্য মজুত কেন গুরুত্বপূর্ণ
জর্জ মনবিওটের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হওয়া উচিত কৌশলগত খাদ্য মজুত গড়ে তোলা। কোনো সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে সরকারি মজুত জনগণের জন্য একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে পারে। আর বড় ধরনের বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই মজুত নতুন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারে।
ব্রিটেনে একসময় সীমিত পরিমাণে কৌশলগত খাদ্য মজুত ছিল। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে সরকারগুলো মনে করতে শুরু করে যে বেসরকারি খুচরা বিক্রেতারাই প্রয়োজনীয় খাদ্য মজুত ধরে রাখবে।
পরবর্তীতে বড় বড় খুচরা প্রতিষ্ঠানও নিজেদের গুদামে দীর্ঘমেয়াদি মজুত রাখা কমিয়ে দিয়ে দ্রুত সরবরাহভিত্তিক ব্যবস্থায় চলে যায়। ফলে প্রয়োজনের সময় হাতে থাকা খাদ্যের পরিমাণ কমে যায় এবং সরবরাহব্যবস্থা আরও বেশি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
মনবিওটের দাবি, ব্রিটিশ সরকারের জরুরি খাদ্য সংরক্ষণের বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ খুবই সীমিত। নাগরিকদের নিজেদের বাড়িতে রান্নার প্রয়োজন নেই এমন দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও দরিদ্র পরিবার বা ছোট বাসায় বসবাসকারী মানুষের পক্ষে বড় ধরনের খাদ্য মজুত করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, সরকার নিজেই কৌশলগত খাদ্য মজুত রাখছে কি না।
মনবিওট জানান, তিনি কয়েক বছর ধরে ব্রিটিশ পরিবেশ বিভাগের কাছে এ বিষয়ে সরাসরি জানতে চেয়েছেন। আগের সরকার এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে না বললেও বর্তমান সরকার সরাসরি উত্তর না দিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে নানা তথ্য দিয়েছে। তার মতে, এই নীরবতাই সরকারের নীতিগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

তীব্র গরম ও খরার মধ্যেও আশ্বস্ত সরকার
ব্রিটিশ সরকারের বক্তব্য হলো, দেশটির খাদ্যব্যবস্থা যথেষ্ট স্থিতিশীল। দেশীয় উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সমন্বয়ে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং সাম্প্রতিক শুষ্ক আবহাওয়া জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও সরকার মনে করছে।
তবে এই আশ্বাসের সঙ্গে কৃষি খাত, বাজার বিশ্লেষক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তার পার্থক্যই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরম তাপ, দীর্ঘ খরা, দাবানল ও কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সরকার জরুরি বৈঠক করলেও জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে এই সংকটকে আরও তীব্র করছে এবং ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমাতে কী করা হবে—সে বিষয়ে সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংকটের আগেই প্রস্তুতি জরুরি
ভালো সময়ে খাদ্য মজুতকে সরকারের কাছে অতিরিক্ত ব্যয় বা অপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সংকট শুরু হয়ে গেলে তখন নতুন করে খাদ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
খাদ্য উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক সংঘাত, নৌপথে বাধা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ব্রিটেনের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি খরার মৌসুমের সমস্যা নয়; এটি দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, সেই মৌলিক প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সংকটের আগেই পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত ও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
খরায় পুড়ছে ব্রিটেনের কৃষিজমি, বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে চাপ বাড়ছে। এমন সময়ে কৌশলগত খাদ্য মজুত না থাকলে বড় সংকটে দেশটির সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















