যুক্তরাষ্ট্র বললেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ইয়েলোস্টোনের উষ্ণ প্রস্রবণ, ইয়োসেমিটির বিশাল গ্রানাইট পাহাড় কিংবা দেশটির বিখ্যাত জাতীয় উদ্যানগুলোর ছবি। প্রতিবছর কোটি কোটি পর্যটক এসব জায়গায় ভিড় করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃতির বিস্ময় শুধু জাতীয় উদ্যানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
দেশটির বন বিভাগ, ভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার অধীনে থাকা ৫৪ কোটি একরেরও বেশি সরকারি জমিতে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য। এসব জায়গার অনেকগুলো এখনো পর্যটকদের ভিড় থেকে অনেকটাই মুক্ত। কোথাও নেই উন্নত শৌচাগার, কোথাও নেই নির্দিষ্ট শিবির বা পর্যাপ্ত কর্মী। ফলে এসব স্থানে যেতে হলে পর্যটকদের নিজেদের প্রস্তুতি, পানি, মানচিত্র ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করতে হয়।
তবে সেই নির্জনতাই এসব জায়গাকে করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে এমন ছয়টি অসাধারণ প্রাকৃতিক স্থান রয়েছে, যেগুলো প্রকৃতিপ্রেমী ও দুঃসাহসী ভ্রমণকারীদের জন্য হতে পারে অনন্য অভিজ্ঞতা।
নিউ মেক্সিকোর পাথরের অদ্ভুত রাজ্য
নিউ মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৪৫ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত বিস্টি-দে-না-জিন প্রান্তর। ভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পরিচালনায় থাকা এই এলাকায় ক্ষয়প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে হাজার হাজার বিচিত্র পাথুরে কাঠামো।

স্থানীয়ভাবে এসব পাথরের স্তম্ভকে হুডু বলা হয়। কোনোটি দেখতে অদ্ভুত ডিমের মতো, কোনোটি আবার শহরের ধ্বংসাবশেষের মতো। পাথরের এসব গঠনকে ঘিরে রয়েছে বিচিত্র নামও। সন্ধ্যা ও ভোরের আলোয় এগুলোর সৌন্দর্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এখানে পাওয়া যায় প্রস্তরীভূত কাঠ ও প্রাচীন জীবাশ্মও। তবে পর্যটকদের মনে রাখতে হবে, এই এলাকা বেশ দুর্গম। হাঁটা বা ঘোড়ায় চড়ে চলাচল করতে হয় এবং বেশির ভাগ পথ চিহ্নিত নয়। মুঠোফোনের সংযোগও দুর্বল। তাই পর্যাপ্ত পানি ও আগে থেকে সংগ্রহ করা মানচিত্র সঙ্গে রাখা জরুরি।
ওয়াশিংটনের ভূগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরির সুড়ঙ্গ
ওয়াশিংটনের গিফোর্ড পিনশট জাতীয় বনের অ্যাপ গুহা যেন মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা অন্য এক পৃথিবী। প্রায় দুই হাজার বছর আগে আগ্নেয় লাভা প্রবাহের ফলে তৈরি এই সুড়ঙ্গটি প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ।
গুহার ভেতরের তাপমাত্রা সারা বছর প্রায় সাড়ে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। তাই গরমের সময়ও এখানে ঢুকলে প্রয়োজন হয় উষ্ণ পোশাকের। অন্ধকারের কারণে প্রত্যেক পর্যটকের সঙ্গে অন্তত দুটি নির্ভরযোগ্য আলোর উৎস থাকা জরুরি।
গুহার তুলনামূলক সহজ অংশে প্রায় আড়াই কিলোমিটার যাওয়া-আসার পথ রয়েছে। আরও কঠিন অংশে বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে এগোতে হয় এবং দুই মিটারের বেশি উঁচু একটি পাথরের দেয়ালও পেরোতে হয়। তাই শারীরিকভাবে প্রস্তুত না থাকলে এই অভিযানে যাওয়া কঠিন।
উটাহর পাথুরে গিরিখাতের নীরব সৌন্দর্য

দক্ষিণ উটাহর প্যারিয়া ক্যানিয়ন-ভারমিলিয়ন ক্লিফস প্রান্তরের ওয়্যার পাস এমন এক গিরিখাত, যেখানে প্রকৃতির বিশালত্ব অনুভব করা যায় খুব কাছ থেকে।
উঁচু পাথুরে দেয়াল আর গির্জার মতো প্রশস্ত অভ্যন্তরীণ কাঠামোর জন্য এই ধরনের সরু গিরিখাত ভ্রমণকারীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। কাছাকাছি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর তুলনায় ওয়্যার পাসে মানুষের ভিড়ও কম।
প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের যাওয়া-আসার পথ পেরিয়ে পর্যটকেরা পৌঁছাতে পারেন ঢেউখেলানো ও স্তরযুক্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ গিরিখাতে। শেষে এটি বাকস্কিন গাল্চের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পথে দেখা যায় বহু পুরোনো পাথরের খোদাই, যা এই ভূখণ্ডের প্রাচীন মানব ইতিহাসেরও সাক্ষ্য বহন করে।
উত্তর ক্যারোলিনার ‘গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন’
উত্তর ক্যারোলিনার পিসগাহ জাতীয় বনের লিনভিল গর্জ প্রান্তর প্রায় ১২ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত। খাড়া পাহাড়, গভীর গিরিখাত ও দুর্গম চূড়ার কারণে অঞ্চলটিকে অনেকটা ব্লু রিজ পর্বতমালার নিজস্ব গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো মনে হয়।
হকসবিল মাউন্টেনের পথটি তুলনামূলক মাঝারি মানের। প্রায় তিন কিলোমিটারের যাওয়া-আসার এই পথে উঠে গিরিখাতের ওপর থেকে বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার দূরের শার্লট শহরের আভাসও মিলতে পারে।
আরও সহজে দৃশ্য উপভোগ করতে চাইলে উইজম্যানস ভিউ দর্শনীয় স্থানটি বিশেষ আকর্ষণীয়। সূর্যাস্তের পরও যারা থেকে যান, তারা কখনো কখনো রহস্যময় ‘ব্রাউন মাউন্টেন আলো’ দেখার দাবি করেন। স্থানীয়দের কাছে বহুদিনের এই রহস্য এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যাত নয়।

আলাস্কার বরফের গুহায় অন্যরকম অভিযান
আলাস্কার কাস্টনার হিমবাহের বরফগুহা যেন বরফে তৈরি কোনো কল্পরাজ্য। ফেয়ারব্যাংকস শহর থেকে প্রায় ২৩২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ভূমি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জমিতে অবস্থিত এই গুহা শীতের সাহসী অভিযাত্রীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।
গ্রীষ্মকালে তুষার গলে উষ্ণ বাতাস ও পানির প্রবাহে গুহার ভেতরের কাঠামো বদলে যায়। তাই সে সময় গুহায় প্রবেশ নিরাপদ নয়। শীতকালে বরফে জমে যাওয়া কাস্টনার খালের পাশে প্রায় দেড় কিলোমিটার সমতল পথ পেরিয়ে গুহায় পৌঁছানো যায়।
গুহার ভেতরে দেখা যায় ঢেউখেলানো নীল-সবুজ বরফের দেয়াল। তবে এখানে কোনো মুঠোফোনের সংযোগ নেই এবং তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে নেমে যেতে পারে। ফলে যথাযথ শীতকালীন পোশাক ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া এই অভিযানে যাওয়া বিপজ্জনক।
জর্জিয়ার জলাভূমিতে বন্যপ্রাণীর রাজ্য
জর্জিয়ার ওকেফেনোকি জাতীয় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দেয়। প্রায় চার লাখ একরজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন জলাভূমি অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল।

এখানে অন্তত ২০০ ধরনের পাখি, ৩৬ ধরনের সাপ, বনবিড়াল, শিয়াল, জলউদবিড়াল এবং আনুমানিক ১৫ হাজার কুমির রয়েছে। জলাভূমিতে রয়েছে পোকাভুক উদ্ভিদও। এই অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের কারণেই চলতি গ্রীষ্মে অঞ্চলটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়েছে।
এখানে হাঁটার চেয়ে নৌকায় বা বৈঠাচালিত জলযানে ঘোরার অভিজ্ঞতা বেশি আকর্ষণীয়। তবে যারা পায়ে হেঁটে প্রকৃতি দেখতে চান, তাদের জন্য চেসার দ্বীপের কাঠের পথটি জনপ্রিয়। প্রায় আড়াই কিলোমিটারের এই পথে সাইপ্রেস বন ও জলাভূমির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায়। পথের শেষে রয়েছে প্রায় ১২ মিটার উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।
ভিড়ের বাইরে প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যানগুলো নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক গন্তব্য। কিন্তু দেশটির বিশাল সরকারি জমির অনেক অংশ এখনো পর্যটকদের মূল স্রোতের বাইরে। সেখানে প্রকৃতি অনেক বেশি কাঁচা, নীরব এবং অনাবিল।
তবে এসব জায়গার সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, আলো, মানচিত্র, আবহাওয়া সম্পর্কে ধারণা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া দুর্গম এলাকায় যাওয়া উচিত নয়। প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো প্রকৃতির নিয়মকে সম্মান করা।
এই ছয়টি স্থান তাই শুধু ভ্রমণের গন্তব্য নয়; এগুলো দেখিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্যগুলোর অনেকটাই এখনো মানুষের ভিড় থেকে দূরে, নীরবে নিজের সৌন্দর্য ধরে রেখেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















