দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তীব্র গ্যাস সংকট সামাল দিতে আপাতত লোডশেডিং কমানোর কোনো সুযোগ সরকারের হাতে নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত নতুন করে গ্যাস উত্তোলন সম্ভব নয়। একইভাবে এফএসআরইউ সচল না হওয়া পর্যন্ত আমদানি করা এলএনজিও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘ন্যাভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে অনলাইনে যুক্ত হয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এফএসআরইউ মেরামতই এখন মূল ভরসা

মন্ত্রী জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর থেকেই বর্তমান গ্যাস সংকটের সূত্রপাত। ব্রিটেন ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা টার্মিনালটি মেরামতের কাজ করছেন। মেরামত শেষ হওয়ার পর নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। এ সময় কারিগরি সমন্বয়ের জন্য পুরো ব্যবস্থা টানা ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হতে পারে। ফলে মেরামত শেষে সাময়িকভাবে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই সময়ে সরকারের প্রধান উদ্যোগ হচ্ছে লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পকারখানায় যতটা সম্ভব গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। মন্ত্রী বলেন, প্রকৌশলীদের কাজ শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া তাঁর হাতে এখন বড় কোনো বিকল্প নেই।
২০২৯ লক্ষ্য করে বাড়ছে এলএনজি অবকাঠামো
দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের চাহিদা সামাল দিতে ২০২৯ সালকে সামনে রেখে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। ইতোমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর জন্য ক্রয়াদেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পে বিকল্পভাবে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ হিসেবে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস কারখানায় পৌঁছে দিতে একটি কোম্পানিকে ৩০টি ট্রাক পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরাসরি কনটেইনারের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরির বিষয়েও মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
শিল্পে উৎপাদন কমেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের ব্যাপক প্রভাব শিল্প খাতে পড়েছে বলে সংলাপে জানান বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তাঁর মতে, সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতে বিদেশি অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

উচ্চ বিল পরিশোধের পরও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। তাই শিল্পে গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় জরুরি ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দাবি করা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
সিপিডির গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির বলেন, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে জ্বালানি সংকট এখন গুরুতর রূপ নিয়েছে। দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে এলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
সিপিডি জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে আমদানিকৃত জ্বালানির দামের ওঠানামা মোকাবিলায় এবং নিম্নআয়ের মানুষকে সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতির আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংলাপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংরক্ষণের সুবিধা বাড়ানো, সেচপাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর এবং শিল্পে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের ওপর জোর দেন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন সাময়িক পদক্ষেপের বদলে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত জ্বালানি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















